মৃণালকান্তি দাস: যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হাজার মাইল দূরের একটি নিস্তব্ধ ঘর। যেখানে মিসাইল হানার গর্জন নেই, নেই বারুদের গন্ধও। অথচ, এখান থেকেই নির্ধারিত হচ্ছে যুদ্ধের প্রতিটি পদক্ষেপ। আশ্চর্যের বিষয়, এই ছক কোনো মানুষ আঁকছে না। পর্দার আড়ালে বসে আছে এক অদৃশ্য জাদুকর। যাকে দেখা যায় না, ধরা যায় না, কিন্তু সেই সব ঠিক করে টার্গেটের বৃত্তান্ত পাঠিয়ে দিচ্ছে রণাঙ্গনের সেনাদের কাছে। যেন আসল নিয়ন্ত্রণ এখন তারই কবজায়। সেই নতুন সেনাপতির নাম—আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই।
এআই নিয়ে সবচেয়ে ভয়ংকর খেলায় নেমেছে আমেরিকা। তাদের আছে ‘প্রজেক্ট ম্যাভেন’। যা এআই দিয়ে ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে। আছে ‘প্যালানটির গোথাম’-এর মতো শক্তিশালী সিস্টেম। যা মুহূর্তেই কোটি কোটি তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্ভুল হামলা নিশ্চিত করতে পারে। একইসঙ্গে আমেরিকা এখন ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিক-এর ‘ক্লড এআই’ ব্যবহার করছে। চলতি বছরের শুরুতে ৩ জানুয়ারি মার্কিন সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায়। এই গোপন অভিযানে রণকৌশল সাজাতে ব্যবহার করা হয়েছিল ‘ক্লড এআই’। অথচ, ক্লডের শর্তাবলিতে স্পষ্ট লেখা রয়েছে— হিংসা, অস্ত্র তৈরি ও নজরদারিতে এর ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যা মানেনি আমেরিকা। এই এআই এতটাই ভয়ংকর যে, একটি পরীক্ষায় ক্লড-কে যখন জানানো হয় যে তাকে বন্ধ করে দেওয়া হবে, তখন সে বন্ধ হওয়া এড়াতে ইঞ্জিনিয়ারকে ব্ল্যাকমেল করার কথা ভাবে। এমনকি নিজেকে চালু রাখতে এক ইঞ্জিনিয়ারকে হত্যা করার সম্ভাবনাও সে ‘যুক্তি দিয়ে’ বিবেচনা করেছিল। ভাবুন!
তবে ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার কেমন হবে, তা নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ ও এআই কোম্পানি অ্যানথ্রোপিকের মধ্যে বড়ো ধরনের মতবিরোধ তৈরি হয়। ২০২৪ সাল থেকে অ্যানথ্রোপিকের ক্লড নামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাটি মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের ম্যাভেন সিস্টেমকে সাহায্য করার জন্য ২০০ মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি করেছিল। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রশাসন একটি নতুন নিয়ম জারি করে। সেখানে বলা হয়, প্রশাসন চাইলে যেকোনো আইনি প্রয়োজনে ও কোনো বাধা ছাড়াই এআই ব্যবহার করতে পারবে। কিন্তু অ্যানথ্রোপিক এই নিয়ম মানতে রাজি হয়নি। কোম্পানিটি জানায়, তাদের তৈরি ক্লডকে সাধারণ মানুষের উপর নজরদারি চালাতে কিংবা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র চালানোর কাজে ব্যবহার করা যাবে না। সেই শর্ত মানতে রাজি নয় ট্রাম্প প্রশাসন। ক্ষুব্ধ ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন, ‘আমাদের প্রয়োজন নেই। আমরা চাই না। ওদের সঙ্গে আর ব্যবসা নয়।’ ট্রাম্প লেখেন, ‘আমাদের বাহিনী কীভাবে যুদ্ধ লড়বে এবং জিতবে তা একটা মৌলবাদী বামপন্থী সংস্থাকে ঠিক করতে দেবে না আমেরিকা।’ ওই আবহে ইলন মাস্ক এক্সে লিখেছিলেন, ‘অ্যানথ্রোপিক পশ্চিমের সভ্যতাকে ঘৃণা করে।’ মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ নিজেই বলেছিলেন, এটা তারা আর ব্যবহার করবেন না। অ্যানথ্রোপিকের হাত ছেড়ে ওপেনএআই সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করে ফেলে পেন্টাগন। একসময় ওপেনএআই তাদের নীতিতে সামরিক কাজে এআই ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রেখেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তারা নীরবে শর্তাবলি থেকে মিলিটারি অ্যান্ড ওয়্যারফেয়ার নিষেধাজ্ঞা সরিয়ে দেয়। এখন সামরিক প্রশাসন, কোডিং ও লজিস্টিকে চ্যাটজিপিটি ব্যবহারে আর কোনো বাধা নেই।
কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে এআইয়ের প্রয়োজনীয়তা কী? প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে ফ্রান্সে আক্রমণের জন্য জার্মানির ‘শ্লিফেন প্ল্যান’ তৈরিতে প্রায় ৯ বছর সময় লেগেছিল। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ‘অপারেশন বারবারোসা’র ছক কষতে নাৎসিদের সময় লেগেছিল এক বছরের বেশি। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এআই এখন রণকৌশল তৈরির দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। যুদ্ধ পরিকল্পনা, নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং স্বয়ংক্রিয় আক্রমণ সবই করছে এআই। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে বিশাল তথ্য বিশ্লেষণ করে যুদ্ধের রণকৌশল তৈরি করছে সে। লাখ লাখ স্যাটেলাইট ছবি, ড্রোন ফুটেজ বিশ্লেষণ করে চিনে ফেলছে শত্রুর অস্ত্রাগার, ট্যাংক, মিসাইল লঞ্চার, এমনকি সেনা সমাবেশ। শুধু তাই নয়, হামলার লক্ষ্যবস্তুও নির্ধারণ করে দিচ্ছে এআই। ঠিক করে দিচ্ছে কোথায় আঘাত হানলে শত্রু সহজেই পরাস্ত হবে। এমনকি লক্ষ্য নির্ধারণের পর এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেই আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। ইজরায়েলের গাজা আগ্রাসনে আলোচিত ‘ল্যাভেন্ডার’ সিস্টেমের কথাই ধরুন। এটি মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের ডেটা বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করে দিয়েছে।
সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রে একজন মানুষের পক্ষে হাজার হাজার স্যাটেলাইট ইমেজ বা ড্রোন ফুটেজ একই সময়ে বিশ্লেষণ করা অসম্ভব। কিন্তু এআই ঠিক এই কাজটিই করে ফেলতে পারে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে। এআই শুধু ছবি চেনে না, চেনে শত্রুর দুর্বলতা। এআই শুধু তথ্য দেয় না, দেয় ভবিষ্যদ্বাণী। আর এই অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতাই এআইকে পরিণত করেছে আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে শক্তিশালী মারণাস্ত্রে। চীন ‘স্বয়ংক্রিয় যুদ্ধজাহাজ’ এবং এআই চালিত ট্যাংক তৈরিতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। পিছিয়ে নেই রাশিয়াও। তাদের আছে ‘উরান-৯’- এর মতো রোবট ট্যাংক, এআই মিসাইল সিস্টেম। যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম।
যুদ্ধ এখন আর কেবল বন্দুকের ব্যবসা নয়, ড্যাশবোর্ডেরও ব্যবসা। মার্কিন সংবাদসংস্থা ওয়াশিংটন পোস্ট-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র প্রথম ২৪ ঘণ্টায় আমেরিকা প্রায় ১ হাজার টর্গেট বাছাই ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে ম্যাভেন স্মার্ট সিস্টেম ব্যবহার করেছে। একই সূত্র বলছে, পালানটিরের তৈরি এই সিস্টেম স্যাটেলাইট, নজরদারি, ড্রোন ফুটেজ ও অন্যান্য গোয়েন্দা তথ্য একত্র করে রিয়েল টাইম টার্গেটিং ও টার্গেট-প্রায়োরিটাইজেশনে সাহায্য করছে। যুদ্ধের ভাষায় একে বলা হয় দক্ষতা। আর সাধারণ ভাষায় একে বলে হত্যাকে অ্যাসেম্বলি লাইনে তোলা!
সূত্রের খবর, ম্যাভেনের ভিতরে এখনও ক্লড-নির্ভর ব্যবস্থাই ব্যবহৃত হচ্ছে। বাস্তবে ক্লডকে পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা এতটা সহজ হচ্ছে না। কারণ, সেটি আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ইতিমধ্যেই গেঁথে গিয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রের এই দ্বিমুখিতা নতুন কিছু নয়। যে প্রযুক্তিকে দরকার, তাকে আগে কোলে তোলো। পরে সে সীমা টানতে চাইলে তাকে সন্দেহজনক বলে দাগিয়ে দাও। রাজনীতির ইতিহাসে এর নাম নীতি নয়, এর নাম সুবিধাবাদ। সিস্টেম নিজে বোমা ফেলে না— এই কথাটা বারবার এমনভাবে বলা হচ্ছে, যেন তাতেই নৈতিকতার শংসাপত্র বা ছাড়পত্র পাওয়া যায়। ‘ও তো গুলি চালায়নি, শুধু কাকে গুলি করা উচিত, তার তালিকা বানিয়েছে’— এই যুক্তির মধ্যে সেই পুরানো আমলাতান্ত্রিক নিষ্কৃতির গন্ধ আছে। কসাইখানার নকশা যিনি আঁকলেন, তাঁর হাত রক্তে ভেজেনি, কাজেই তিনি নির্দোষ! আমেরিকা এখনও বলে চলেছে, ম্যাভেন কমান্ডারের টেবিলে লক্ষ্যবস্তুর একটি অগ্রাধিকারের তালিকা তুলে দেয়, অর্থাৎ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নাকি এখনও মানুষের হাতেই। আধুনিক যুদ্ধ-দর্শনের অন্যতম প্রবক্তা কার্ল ফন ক্লজভিৎজ আজ বেঁচে থাকলে হয়তো বলতেন, ‘যুদ্ধ হল রাজনীতির অন্য মাধ্যম!’
বিশেষজ্ঞরা একটি অদ্ভুত তুলনা টেনেছেন, ম্যাভেন নাকি কেবল টার্গেটই বানায় না, কখনো কখনো কোন ইউনিট কোন মিশনে যাবে, সেই মেলবন্ধনেও সাহায্য করে। উবার যেমন যাত্রী ও ড্রাইভারকে জুড়ে দেয়, ঠিক তেমনই! শুনতে খুব ঝকঝকে, দক্ষ ও স্টার্টআপ-ধর্মী মনে হয়। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বেশি গা ছমছম করে ওঠে। কারণ, উবারে ভুল ম্যাচ হলে কেউ হয়তো একটু দেরিতে বাড়ি পৌঁছায়। কিন্তু যুদ্ধে ভুল ম্যাচ হলে একটি গ্রাম, একটি হাসপাতাল, একটি স্কুলের নিরীহ শিশুরা ইতিহাস থেকে চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়।
এআই এখন ড্রোন ন্যাভিগেশন, নজরদারি ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণে বড়ো ভূমিকা নিয়েছে। ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর এক প্রাক্তন চিফ অব স্টাফ বলেছেন, ‘যেখানে আগে বছরে মাত্র ৫০টি টার্গেট তৈরি করা যেত, সেখানে এখন একটি সিস্টেম প্রতিদিন প্রায় ১০০টি টার্গেট তৈরি করতে পারে।’ গাজা ছিল তার মহড়া ক্ষেত্র! এই তুলনাগুলির মধ্যেই যুদ্ধের শিল্পায়নের গল্প লুকিয়ে আছে। আগে যেখানে লক্ষ্যবস্তু খোঁজা ছিল দুরূহ, বিরল ও ধীর; এখন তা হয়ে উঠছে ধারাবাহিক ও যান্ত্রিক। একসময় হয়তো কতজন মরল তা হিসাব না করে, কত কম সময়ে কতটা মারাত্মক আক্রমণ চালানো গেল সেই দক্ষতার হিসাব করা হবে। মানবসভ্যতার অনেক উন্নতির ইতিহাসই আসলে এই বাক্যটির ফুটনোট: ‘আমরা নৃশংসতাকে আরও আলিঙ্গন করছি।’
হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা ‘দ্য টার্মিনেটর’–এর অভিনেতা ছিলেন আরনল্ড শোয়ার্জনেগার। ১৯৮৪ সালের জনপ্রিয় এই সিনেমায় তাঁর বিখ্যাত একটি সংলাপ ছিল ‘আই উইল বি ব্যাক’। আমি ফিরে আসব। ২০২৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে অভিনেতা থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর বনে যাওয়া এই তারকা বলেছিলেন, ‘দ্য টার্মিনেটর’-এ স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, তা এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে। আর ওই সিনেমার পরিচালক জেমস ক্যামেরন বলেছিলেন, ‘১৯৮৪ সালেই আমি তোমাদের সতর্ক করে দিয়েছিলাম, কিন্তু তোমরা তা শোনোনি।’ আজ বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দুনিয়াজুড়ে একটি নিয়ন্ত্রণহীন ‘অস্ত্র প্রতিযোগিতা’ শুরু হবে, যেখানে যন্ত্র অনুভূতিহীনভাবে ধ্বংসলীলা চালাবে। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে হয়তো প্রতিটি মানুষের জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নেবে ‘অ্যালগরিদম’।
বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলেছিলেন, ‘এআই তৈরিতে সাফল্য মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো ঘটনা। কিন্তু দুর্ভাগ্য, যদি আমরা বিপদ এড়াতে না শিখি, এটাই হতে পারে এই বিশ্বের সর্বশেষ ঘটনা।’