Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নেপালে পালাবদলের নেপথ্যে কে?

বছর তিনেক আগে কাঠমাণ্ডু পুরসভা ভোটের আগে নির্দল মেয়র প্রার্থীকে নিয়ে কেউ মাথাই ঘামাননি। বালেন্দ্র শাহ বা বালেনের পরিচিতি তখনও নেপালের গান-বাজনার জগতেই। বালেন মূলত ‘র‌্যাপার’। যাঁরা কেবল গান নয়, গানের সঙ্গে ছন্দে ছন্দে গল্পও শোনান।

নেপালে পালাবদলের নেপথ্যে কে?
  • ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: বছর তিনেক আগে কাঠমাণ্ডু পুরসভা ভোটের আগে নির্দল মেয়র প্রার্থীকে নিয়ে কেউ মাথাই ঘামাননি। বালেন্দ্র শাহ বা বালেনের পরিচিতি তখনও নেপালের গান-বাজনার জগতেই। বালেন মূলত ‘র‌্যাপার’। যাঁরা কেবল গান নয়, গানের সঙ্গে ছন্দে ছন্দে গল্পও শোনান। স্লোগান তোলেন। ‘দেশ রক্ষা করে যারা, তারা বোকা। সব নেতা চোর, দেশ লুটে খাচ্ছে’— এমন তীব্র রাজনৈতিক সমালোচনাই ছিল তাঁর গানের কথা। আর তাতেই বাজিমাত করেছিলেন বালেন শাহ। নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুর পঞ্চদশতম পুরভোটে মেয়র পদে জিতে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, এবার ‘বালেন এফেক্ট’ টের পাবে গোটা নেপালের রাজনীতি। বালেনের সেই উত্থান দেখে পুষ্পকমল দহল, মাধবকুমার নেপাল, কে পি শর্মা ওলি কিংবা দেউবার মতো শীর্ষনেতারা কি সতর্ক হয়েছিলেন? আদৌ নয়!

Advertisement

তখনও কেউ প্রশ্ন তোলেনি, মার্কিন সংবাদমাধ্যম টাইম ম্যাগাজিনের ‘টপ ১০০ এমার্জিং লিডারস’-এ হঠাৎ করে কীভাবে জায়গা করে নিয়েছিলেন পেশায় স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার বালেন শাহ। আর টাইম ম্যাগাজিনে তা প্রকাশিত হওয়ার পরই রাতারাতি নেপালের রাজনীতিতে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন অজ্ঞাত এই ‘র‌্যাপার’। যাঁকে ঘিরে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েছিল কাঠমাণ্ডুর তরুণ সমাজ। আসলে নেপালের মানুষ জাতীয় রাজনীতিবিদদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশের একটা রাস্তা খুঁজছিল। সেই সুযোগ করে দিয়েছিলেন বালেন। রাস্তায় নেমে ভোটও চাইতে হয়নি তাঁকে। দল না থাকায় তাঁর হাতে কোনও দলীয় পতাকাও ছিল না। জাতীয় পতাকা গায়ে জড়িয়ে বুড়োদের সালাম দিয়ে আর তরুণদের সঙ্গে সেলফি তুলেই প্রচার চালিয়ে গিয়েছেন। মাঝে মাঝে বিভিন্নজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে তাঁর পরিকল্পনাগুলি ব্যাখ্যা করেছেন। যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। আর তাতেই ২০২২-এ নেপালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুরসভায় মানুষ বেছে নিয়েছিল নির্দল এক প্রার্থীকে। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর মতো বিখ্যাত মার্কিন সংবাদপত্রের শিরোনাম বুঝিয়ে দিয়েছিল, আমেরিকারও পছন্দ বালেন্দ্র শাহকেই।
সেদিন কাঠমাণ্ডুতে নেপালি কংগ্রেস এবং ইউএমএলের প্রার্থী যথাক্রমে সিরজানা সিং ও কেশব স্থপিতের বিপরীতে বালেনের বিপুল ভোট পাওয়া বিস্ময়ের হলেও নেপালের সমাজে তার উত্তর লুকিয়ে ছিল। সবাই নতুন আইডিয়াসহ নতুন রাজনীতিবিদ দেখতে চেয়েছিল। বিশেষ করে তরুণরা— পুরনো নেতৃত্বের চোখে যারা ‘রাজনীতি বোঝে না’! অথচ, একসময় রাজতন্ত্র পতনে নেপাল দক্ষিণ এশিয়ায় আশাবাদের বড় এক ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই সম্ভাবনা ম্লান হয়েছে সমাজতন্ত্রীদের উপদলীয় কোন্দল ও দ্বিধাবিভক্তির কারণে। ২০১৫ সালে নেপালে নতুন সংবিধান এবং নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর সূচনার পর সরকার ভাঙাগড়া ছাড়া মূলধারার রাজনীতিবিদরা গুরুত্ববহ আর কোনও অবদান রাখতে পারেননি। ২০০৮ সালে গণতন্ত্র কায়েম হওয়ার পর থেকে, ১৭ বছরে ১৪টি সরকার দেখেছে নেপাল। বেশিরভাগই ছিল জোট সরকার। ক্ষমতা ঘোরাফেরা করেছে মূলত তিনজনের মধ্যে— চীনঘনিষ্ঠ কে পি শর্মা ওলি, মাওবাদী সেন্টারের পুষ্পকমল দহল ‘প্রচণ্ড’ এবং পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা। তিনজনের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়েছে নেপালি তরুণরা।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না আসায় মজবুত হয়নি অর্থনীতি। স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বেকারত্ব। সোশ্যাল মিডিয়ায় নেপালি যুব সমাজের এই হতাশা ধরা পড়েছিল। নেপালি রাজনীতিবিদদের সন্তানদের বিলাসবহুল জীবনযাত্রা, দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল ‘নেপো কিড’ প্রচার। বালেন শাহ নেপালবাসীর সেই হতাশারই প্রকাশ্য এক ইশতেহার। পরবর্তী পর্বের নায়ক কিংবা প্রতিনায়ক! হয়েছেও তাই। অস্থির সময়ে বিক্ষোভ, অবস্থান, প্রতিবাদের আবহে নেপালি জনগণের মুখ হয়ে উঠছেন বালেন্দ্র শাহ বা বালেন। তাঁকে ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে ভাবতে শুরু করেছেন নেপালের তরুণ-তুর্কিদের একাংশ। এখন তাঁকেই কে পি শর্মা ওলির আসনে চাইছে নেপালের জেন জি (এই প্রজন্মের সদস্যদের বয়স ১২ থেকে ২৭)।
শুধু বালেন শাহ নন, নেপালের ছাত্র আন্দোলনের নেপথ্যে যাঁর নাম উঠে আসছে, তিনি সুদান গুরুং। নিজে জেন জি গ্রুপের না হলেও ৩৬ বছরের এই সমাজকর্মীর ডাকেই পথে নেমেছিলেন নেপালের শয়ে শয়ে অল্পবয়সি ছেলেমেয়ে। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর এনজিও পেজে বিভিন্ন বিপর্যয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ডাক দেন সুদান। আসে আন্তর্জাতিক ফান্ডিংও। ২০১৮–এর ‘মিস ইউনিভার্স নেপাল’ মণিতা দেবকোতা এই এনজিও–র গুডউইল অ্যাম্বাসাডর। সে দেশের অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা কারকি, স্বস্তিমা খাড়কে, গায়ক অভয় সুব্বার মতো সেলিব্রিটিরা এই এনজিও–র পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের ইনস্টাগ্রাম পেজের স্লোগান ‘ফর দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল’। ‘হামি নেপাল’ মূলত জেন জি পরিচালিত এনজিও। অল্পবয়সি ছেলেমেয়েদের বিশ্বাস, তাঁদের সমস্যা ও দাবি–দাওয়া তুলে ধরার প্রধান মুখ সুদান। জেন জি–র হতাশা ও বিরক্তিকেই হাতিয়ার করেছেন সুদান। প্রশ্ন হল, ‘হামি নেপাল’ নামে একটি এনজিও–র প্রেসিডেন্ট হঠাৎ কীভাবে উঠে এলেন আন্দোলনের নেপথ্যে? সুদান গুরুংদের পরিচালনা করছে কারা?
একদিকে যখন দেশের যুবসমাজ বেকারত্ব, হতাশার অন্ধকারে ডুবে, তখন মন্ত্রী–সরকারি আমলাদের দুর্নীতির টাকায় বিলাসবহুল জীবন কাটাচ্ছেন তাঁদের সন্তানরা! সেই সব খবর, ছবি তুলে ধরে #NepoKid, #NepoBabies হ্যাশটাগে শুরু হয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়া বিপ্লব। ঠিক তার মধ্যেই দেশে জনপ্রিয় সব সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন। আর তাতেই বিস্ফোরণ ঘটে। সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ হলেও ভিপিএন কানেকশন ব্যবহার করে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স প্ল্যাটফর্মেই তৈরি হয় প্রতিবাদের প্ল্যানিং। আর তারপর ‘দুর্নীতি বন্ধ করুন, সোশ্যাল মিডিয়া নয়’— এমন স্লোগান নিয়ে পথে নামেন জেন জি–র ছেলেমেয়েরা।
নেপাল সরকার ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ও মেসেজিং অ্যাপ বন্ধ করে দিলে তরুণদের এই প্রতিবাদ নতুন করে গতি পায়। প্রতিবাদ জানাতে এবার অনলাইন ছেড়ে রাজপথে নামেন হাজার হাজার নেপালি তরুণ সমাজ। বিতর্কিত নিষেধাজ্ঞা ঘিরে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত রূপ নেয় হিংসায়। প্রতিবাদকারীরা সংসদ ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছোড়ে। সংঘর্ষে প্রাণ হারান অন্তত ২২ জন, আহত শতাধিক। এরপরই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হয় সরকার। কিন্তু তাতে বিক্ষোভ থামেনি। কাঠমাণ্ডুর পাশাপাশি গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এই বিক্ষোভ। ‘ওলি চোর, দেশ ছোড়’ স্লোগানে ছেয়ে যায় কাঠমাণ্ডুর আকাশ-বাতাস। কয়েক সপ্তাহের লাগাতার অস্থিরতার পর শেষ পর্যন্ত নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগ করেন। সূত্রের খবর, পদত্যাগের পরেই সেনার কপ্টারে দেশও ছেড়েছেন তিনি।
এই প্রবল বিক্ষোভের আঁচে বাংলাদেশের মতোই পুড়েছে নেপালের সরকারি অফিস, আবাস। রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌডেল, প্রধানমন্ত্রী ওলি এবং অন্যান্য মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত বাসভবন ভাঙচুর করে ও আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। অর্থমন্ত্রী বিষ্ণু পৌডেলকে প্রকাশ্য রাস্তায় ধাওয়া করে মারধর করে জনতা। পুড়িয়ে দেওয়া হয় সুপ্রিম কোর্ট, কাঠমাণ্ডুর বিখ্যাত হিলটন হোটেল। এই হোটেল ক্ষমতাসীন জোটের এক নেতারই মালিকানাধীন। আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ঝালানাথ খানালের বাড়িতেও। আগুনে ঝলসে গিয়ে মৃত্যু হয় তাঁর স্ত্রী রাজ্যলক্ষ্মী চিত্রকরের। এই ছবিগুলি বড্ড চেনা। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে এবং ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কাতেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল।
এক বছর আগে বাংলাদেশের পরিস্থিতি যাঁরা দেখেছেন, তাঁদের কাছে তা অদ্ভুতভাবে পরিচিত মনে হবে। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে স্বৈরাচারী শাসন, ভয়াবহ অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রবল দাবির মুখে ঢাকার রাজপথ যেমন বিক্ষোভকারীদের ভিড়ে প্লাবিত ছিল, সরকারি ভবনগুলিতে ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছিল এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল, সেই একই চিত্র পুনরাবৃত্তি হয়েছে নেপালে। বাতাস ভরে উঠেছে বারুদের গন্ধে, শহরের চত্বরগুলি তরুণ বিক্ষোভকারীদের ভিড়ে ঠাসা, আর মাথার উপর হেলিকপ্টারের একটানা আওয়াজ। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন দৃশ্য যেন বারবার ফিরে আসছে।
নেপালি সংবাদমাধ্যমের দাবি, সীমান্ত অঞ্চলের লিপুলেখ এলাকায় ভারত ও চীন যৌথ ‘বর্ডার হাট’ চালু করতে চাওয়ায় সাধারণ নেপালিরা ব্যাপক 
ক্ষুব্ধ। কিন্তু নেপালিরা মনে করে এই অঞ্চল আগে তাদেরই ছিল। ২০১৯ থেকে ভারত এটা তাদের মানচিত্রে দেখাচ্ছে এবং চীন সেটা মেনে নিচ্ছে। সাধারণ নেপালিরা চেয়েছিল, তাদের সরকার ভারত ও চীনের বিরুদ্ধে মুখ খুলুক। কিন্তু ওলি সরকার তাতে পাত্তাই দেয়নি।
অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তাহলে কি হিমালয়ের কোলের দেশটিও শেষ পর্যন্ত আমেরিকা বনাম চীনের ছায়াযুদ্ধের আরও এক ময়দানে পরিণত হল? গত তিন বছরে ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলির রাজনৈতিক মানচিত্রে টেকটোনিক পরিবর্তন দেখা গিয়েছে। শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সঙ্কট, পাকিস্তানে ইমরান খানের ক্ষমতাচ্যুতি থেকে শুরু করে বাংলাদেশে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন— প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে পরিচিত চিত্রনাট্য। ব্যাপক গণবিক্ষোভের জেরে সরকারের পতন। নেপালও এই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। নেপালে হঠাৎ যেভাবে উস্কে উঠল এই আন্দোলন, যেভাবে রক্তাক্ত চেহারা নিল শান্তিপূর্ণ মিছিল, যেভাবে দু’দিনের মধ্যে ঘটে গেল রাজনৈতিক পালাবদল, তাতে প্রশ্ন উঠে গিয়েছে, শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ করাই কি এর মূল কারণ? নাকি নেপালের অস্থিরতার পিছনে রয়েছে বাইরের কোনও হাত? এই অবস্থায় নেপালের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন বর্তমানে চীন-বান্ধব সরকারের পতনের পরে নেপালে খুব তাড়াতাড়ি একটি আমেরিকা-বান্ধব ‘পুতুল সরকার’ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ঠিক বাংলাদেশের কায়দাতেই। সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে নেপালে এই অস্থিরতার সময় নিয়েও। ভারত ও আমেরিকার সম্পর্ক এখন তলানিতে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরের শেষেই ভারত সফরে আসার কথা চলছিল কে পি শর্মা ওলির। ঠিক সেই সময়েই এই রাজনৈতিক পালাবদল। কার ইঙ্গিতে? উত্তর লুকিয়ে হিমালয়ের কোলে!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ