Bartaman Logo
২৬ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ভারতের রাজনীতি কোন পথে?

ভারতের আঞ্চলিক দলগুলিকে ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছে বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গে  তৃণমূল কংগ্রেস এবং তামিলনাড়ুতে ডিএমকের পরাজয়ের পর ভারতজুড়ে আঞ্চলিক দলগুলির দুর্বল হওয়ার প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেল।

ভারতের রাজনীতি কোন পথে?
  • ৮ মে, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: ভারতের আঞ্চলিক দলগুলিকে ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছে বিজেপি। পশ্চিমবঙ্গে  তৃণমূল কংগ্রেস এবং তামিলনাড়ুতে ডিএমকের পরাজয়ের পর ভারতজুড়ে আঞ্চলিক দলগুলির দুর্বল হওয়ার প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেল। বস্তুত,  ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা,  পাঞ্জাবে আম আদমি পার্টি ছাড়া 

Advertisement

পূর্ণাঙ্গ কোনো রাজ্যেই আর আঞ্চলিক পার্টি সরকারে ক্ষমতাসীন নয়। কাশ্মীর, পুদুচেরি অথবা উত্তর পূর্ব ভারতের কয়েকটি রাজ্যে আঞ্চলিক পার্টি রয়েছে সরকারে। কিন্তু কাশ্মীর ও পুদুচেরি পূর্ণাঙ্গ রাজ্য নয়। কেন্দ্রশাসিত। আর উত্তর পূর্ব ভারতের কয়েকটি 
রাজ্যে আঞ্চলিক দলের সঙ্গে বিজেপি জোট করে সেগুলিকে এনডিএ সরকার হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেছে। ঠিক অন্ধ্রপ্রদেশেও তাই। সেখানেও আসল শক্তি তেলুগু দেশম। বিজেপি সঙ্গী হয়েছে। তেলুগু দেশমের একক সরকার চলছে না সেখানে। আর এভাবেই পশ্চিম ভারত, মধ্য ভারত, উত্তর ভারত, পূর্ব ভারত, উত্তর পূর্ব ভারত বিজেপির দখলে এসে গিয়েছে প্রায় পূর্ণাঙ্গভাবে। একমাত্র ঝাড়খণ্ড, পাঞ্জাব এবং হিমাচল প্রদেশের ভোটে বিজেপি জয়ী হলে ভারতের উত্তরাংশে আর একটিও রাজ্য বাকি থাকবে না গেরুয়া পতাকার অধীনস্থ হতে। 
এই প্রবণতায় এখনও পর্যন্ত বিস্ময়করভাবে ব্যতিক্রম দক্ষিণ ভারত।  সংঘ পরিবারের কাছে আদর্শগতভাবে প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট। এই দুই ভাবধারাকে সমাপ্ত করতেই বিজেপি চা‌য়। কিন্তু দক্ষিণ ভারতে দেখা যাচ্ছে বিপরীত চিত্র। বিজেপির বিস্তার এখনও পর্যন্ত চমকপ্রদ হচ্ছে না। বরং কংগ্রেসের শক্তি বেড়ে যাচ্ছে। কর্ণাটক, তেলেঙ্গানায় কংগ্রেস সরকার ছিলই। এবার যুক্ত হল কেরলম। ডিএমকের সঙ্গে জোট করে এই সেদিন পর্যন্ত কংগ্রেস তামিলনাড়ুতেও সরকারের অঙ্গ ছিল। অন্ধ্রপ্রদেশে তেলুগু দেশমই প্রধান শক্তি। বিজেপি তাদের জোটসঙ্গী। অন্তত এখনও পর্যন্ত। হতেই পারে আগামী দিনে হয়তো বিজেপি ক্রমেই অন্যতম শক্তশালী দল হয়ে যাবে। 
আজকের তারিখ পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরে দক্ষিণ ভারতে কংগ্রেসের পারফরম্যান্স যথেষ্ট শক্তিশালী। যদিও এবারই কেরলম এবং তামিলনাড়ুতেও কয়েকটি আসনে বিজেপি জয়ী হয়েছে। কেরলমের রাজধানী তিরুবনন্তপুরম পুরসভাও বিজেপি দখল করেছে। যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সাফল্য। সুতরাং দক্ষিণ ভারত যে বিজেপি প্রাণপণে চেষ্টা করবে আগামী দিনে দখল করতে সেকথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু আকর্ষণীয় হল, দক্ষিণ ভারতে কংগ্রেস এখনও শক্তিশালী। আবার আঞ্চলিক দলগুলিও ক্ষয়িষ্ণু নয়। বরং তামিলনাড়ুতে নতুন এক আঞ্চলিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটল। টিভিকে। সুপারস্টার বিজয়ের নেতৃত্বে একক বৃহত্তম দল হয়েছে। সুতরাং এখন আবার তামিলনাড়ুতে তিনটি প্রধান আঞ্চলিক দল হল। ডিএমকে, এআইএডিএমকে এবং টিভিকে। 
ঠিক এই প্রেক্ষাপটে ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাচ্ছে, মূলত সরকারে আসীন রয়েছে যে দলগুলি, তার মধ্যে প্রথম স্থানে বিজেপি। দ্বিতীয় স্থানে কংগ্রেস। গুটিকয় ব্যতিক্রম ছাড়া আঞ্চলিক দল কিন্তু আর কোথাও আসীন নেই। 
আঞ্চলিক পার্টি  হিসেবে স্বাধীনতার পর ভারতে প্রথম সাফল্য পায় তামিলনাড়ুর দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগাম। ডিএমকে। ১৯৬৭ সালে এই দল প্রথম কোনো রাজ্যের নির্বাচনে সর্বপ্রধান জাতীয় দল কংগ্রেসকে পরাজিত করে সরকার গঠন করে। কংগ্রেসের তামিল রাজনীতি থেকে ক্র঩মেই পশ্চাদপসরণের সেটি ছিল সূত্রপাত। ডিএমকের সূত্রপাত হল কীভাবে? ১৯৪৯ সালে এই দলের 
জন্ম হয়। দ্রাবিড় কাজাগাম নামক একটি সামাজিক সংগঠন থেকেই এই দলের জন্ম। সাতের দশকে আবার এই ডিএমকে ভেঙে এআ‌ইএডিএমকে আত্মপ্রকাশ করে। সেই থেকে তামিল রাজনীতিতে এই দুই দলই যুযুধান দু‌ই ঩গোষ্ঠী।  
আটের দশকে জাতপাতের ভিত্তিতে আইডেন্টিটি রাজনীতির সূত্রপাত হয় উত্তর এবং পূর্ব ভারতে। তৈরি হয় সমাজবাদী পার্টি এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দল, সংযুক্ত জনতা দল। বিজেপি যখন হিন্দুত্ব রাজনীতি করছে, তখন এই দলগুলি জাতপাতের সমীকরণ অর্থাৎ সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংকেই রাজনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করে এবং সাফল্য পায়। আজও এই প্রতিটি আঞ্চলিক পার্টি টিকে আছে সাফল্যের সঙ্গে। এর পরবর্তী ধাপ হল কংগ্রেস ভেঙে নতুন দল। এনসিপি, তৃণমূল কংগ্রেস, ওয়াই এস আর কংগ্রেস তার উদাহরণ। কিন্তু এই তিন দলই সরকারের বাইরে এখন। লক্ষণীয় এই তিন দলের কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও চালিকাশক্তি ছিল। অর্থাৎ জাতপাতের রাজনীতি, ধর্ম অথবা অন্য কোনো একটি ইস্যুকে দলের কোর ফ্যাক্টর করেনি অথবা করতে পারেনি। 
অরবিন্দ কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি অথবা প্রশান্ত কিশোরের জন সুরাজ পার্টি দুই ব্যতিক্রম। এই দুই দল ধর্ম, কাস্ট রাজনীতির মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেনি। আবার পুরানো দল ভেঙে নতুন দল হয়নি। সম্পূর্ণ সামাজিক ইস্যুকে সামনে রেখে অগ্রসর হয়েছে। কিন্তু আপাতভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ভবিষ্যতে কী হবে সেটাই দেখার। 
প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, তাহলে কি আগামী দিনে আঞ্চলিক দলের রাজনীতির অবসান হয়ে যাবে? 
এই দলগুলি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে? ধীরে ধীরে ওয়ান নেশন ওয়ান পার্টি হিসেবেই বিজেপি অন্তত 
উত্তর, পূর্ব, উত্তর-পূর্ব এবং পশ্চিম ভারতে থেকে যাবে? আর থাকবে কংগ্রেস? তারপর ক্রমেই বিজেপি হাত বাড়াবে দক্ষিণে?
এখনও এই ভবিষ্যদ্বাণী করার সময় আসেনি। এবং এই পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনা আপাতত কম। কেন? কারণ, নির্বাচনে জয়ী হতে পারুক না পারুক , তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, ডিএমকে, আম আদমি পার্টি, শিবসেনা, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা, এনসিপি ইত্যাদি আঞ্চলিক পার্টির প্রাপ্ত ভোটের হার এখনও পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক। বিজেপির সঙ্গে রাজ্যে রাজ্যে এদের ভোটপ্রাপ্তির হারের পার্থক্য ২ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে রয়ে যাচ্ছে। এমন এখনও হয়নি যে, বিজেপির সঙ্গে কোনো একটি আঞ্চলিক দলের ভোটশেয়ারের ফারাক ধরাছোঁয়ার বাইরে।  
কিন্তু বিজেপি এবং বাকি তাবৎ দলের সঙ্গে প্রধান পার্থক্য হল হিন্দুত্ব ইস্যু। বিজেপি জন্মলগ্ন থেকেই হিন্দুত্বকেই প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে রাজনীতি করেছে। সেটি ৪৬ বছর পরও ধরে রেখেছে। অন্য তাবৎ দল বিজেপির এই হিন্দুত্ব পলিটিক্সের শক্তিকে অনেক পরে ধরতে পেরেছে। এবং কমবেশি সকলেই সেই রাজনীতিকেই নিজেদের দলের সঙ্গে মিশ্রিত করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক অতীতের নির্বাচন বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে বিজেপির মোকাবিলা করতে গিয়ে যে দলগুলি নরম হিন্দুত্বের রাস্তায় হাঁটতে চেয়েছে, তাদের 
নির্বাচনি মুনাফা হয়নি। হিন্দু হিসেবে যারা ভোট দিয়েছে, তারা বিজেপিকেই বেছে নিয়েছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, সব হিন্দু বিজেপিকে ভোট দেয়। এখনও দেয় না। বাংলার ভোটের পরও নয়। কারণ হিন্দু 
মুসলিম আইডেন্টিটি ছাপিয়েও একটি বড়োসড়ো ভোটব্যাংক এখনও রাজ্যে রাজ্যে থাকছে। সেই ভোটারদের কোনো আদর্শ, ধর্ম, কাস্ট দিয়ে চিহ্নিত করা যাবে না। তারা হিন্দু হয়েও কেন বিজেপিকে ভোট দেয় না? অথবা মুসলিম হয়েও কেন কংগ্রেস, তৃণমূল, সমাজবাদী, আরজেডিকে দেয় না?  এই প্রশ্ন সামাজিক গবেষণার বিষয়। বহু পৃথক ফ্যাক্টর আছে। 
সুতরাং আঞ্চলিক দলগুলি ভারতের কয়েকটি মাত্র রাজ্য ছাড়া আর কোথাও ক্ষমতাসীন নেই বলেই তারা শক্তিহীন একথা সম্ভবত বলা যায় না। তামিলনাড়ুতেই সুপারস্টার বিজয়ের গ্ল্যামারের হাতে ধরে হলেও যে নতুন দলের জন্ম হল, তাদের পরিচয় আঞ্চলিক দলই। প্রশান্ত কিশোর যে দলের জন্ম দিয়েছেন সেটিও আঞ্চলিক দল। তারা কিন্তু বিজেপি ঝড়েও সাড়ে ৩ শতাংশ ভোট পেয়েছে। 
কংগ্রেস অথবা আঞ্চলিক দল, তাদের কাছে সবথেকে বড়ো চ্যালেঞ্জ হল, বিজেপির হিন্দুত্ব যতটা শক্তিশালী এবং নিশ্চিন্ত একটি ইস্যু তথা ভোটব্যাংক, সেরকম পালটা কোনো নিশ্চিত সংখ্যাগুরুদের মধ্যেও আকর্ষণ তৈরি করবে এরকম কিছু নেই তাদের কাছে। তাই তারা সকলেই কমবেশি গ্রহণ করেছে ক্যাশ ট্র্যান্সফার পন্থা। অর্থাৎ বিভিন্ন রকম ভাতার ঘোষণা। যা সব দলই করে থাকে। কিন্তু বিজেপি ভাতা প্লাস হিন্দুত্বকে একজোট করে ফেলছে। ফলে তাদের শক্তি অনেক বেশি হয়ে গিয়েছে। কারণ সব দলের কাছে ভাতার শক্তি আছে। বিজেপির কাছে ভাতাও আছে, হিন্দুত্বও আছে। 
বিজেপির বিরুদ্ধে আগামী দিনে বিরোধীদের পালটা ভোটব্যাংক গঠনের পলিসি কী হবে, সেটাই নির্ধারণ করবে ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে। সম্ভবত কাস্ট পলিটিক্স! ভবিষ্যতে হিন্দুত্ব বনাম কাস্ট হতে চলেছে রাজনৈতিক যুদ্ধ। রাহুল গান্ধী, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদবদের লাগাতার কাস্ট সেন্সাসের দাবি থেকে সাম্প্রতিক অবস্থান ও বিবৃতিতেই সেটি স্পষ্ট 
হচ্ছে। অর্থাৎ হিন্দু আইডেন্টিটির আবেগকে মোকাবিলা করতে বিরোধীরা  কাস্ট আবেগকে অস্ত্র করবে। 
২০২৭ সালের কাস্ট সেন্সাসের পর সেই নতুন রাজনীতি প্রকটভাবে আত্মপ্রকাশ করবে। রাহুল গান্ধী, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদবরা মরিয়া হয়ে প্রচার শুরু করবেন যে, অনগ্রসরদের উন্নতি হয়নি মোদি সরকারের আমলে। কিন্তু বিজেপি যথেষ্ট কুশলী রাজনীতিক। তাদের কাছেও নিশ্চিত থাকবে পালটা হাতিয়ার! তাহলে কি ২০২৯ সালের লোকসভা ভোট হবে হিন্দুত্ব বনাম কাস্ট রাজনীতির লড়াই? দুটিই আইডেন্টিটি ইমোশন। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ