


ভাইরাসের ভয়!
কেন ভাইরাস কম ক্ষতিকর?
ভাইরাস নিজে নিজে বাঁচতে বা বংশবৃদ্ধি করতে পারে না। তার জন্য তাদের মানুষ, প্রাণী বা উদ্ভিদের জীবন্ত কোষের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ভাইরাস মানব শরীরে ঢুকলেই কাজ করতে শুরু করবে, এমনও নয়। প্রতিটি ভাইরাসের নিজস্ব ‘রিসেপ্টর’ থাকে। সেই রিসেপ্টরগুলি নির্দিষ্ট অঙ্গেই সক্রিয় হতে পারে। অর্থাত্ হেপাটাইটিস-বি ভাইরাস কখনই মানুষের ফুসফুসে সক্রিয় হতে পারবে না। সে সক্রিয় হবে লিভারে। সেখানেই সে আঘাত হানবে। ফলে ভাইরাসের আক্রমণের এলাকা ব্যাকটেরিয়ার তুলনায় অনেক ছোট। ব্যাকটেরিয়া শরীরে একাধিক অংশে আক্রমণ হানতে সক্ষম। এছাড়া ভাইরাসের যে রিসেপ্টরের কথা বলা হল, সেটিকে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অতি সহজেই চিহ্নিত করতে পারে এবং অ্যান্টিবডি তৈরি করতে শুরু করে।
কোভিড বা নিপা আতঙ্ক অমূলক?
নতুন কোনো ভাইরাস এলে তার ‘রিসেপ্টর’গুলি চিহ্নিত করতে সময় লাগে। এর ফলে প্রথমদিকে সেই ভাইরাসের মারণ ক্ষমতা বেশি হয়। কিন্তু যখনই সেই ভাইরাসের রিসেপ্টর চিহ্নিত করে অ্যান্টিবডি তৈরি করা সম্ভব হয়, তখন ভাইরাসও নিজেকে বদলাতে শুরু করে। এর ফলে ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সেই মারণ ভাইরাস নিজের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। কোভিডের ক্ষেত্রে যখন ‘আলফা স্ট্রেন’ এসেছিল, তখন তার আক্রমণে মৃত্যুহার অনেক বেশি ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই ভাইরাস যখন বদলাতে শুরু করে। পরের দিকে যখন কোভিডের ‘ডেল্টা স্ট্রেন’ এল, তখন দেখা গেল ভাইরাসের মারণ ক্ষমতা কার্যত নেই। নিপা ভাইরাসের ক্ষেত্রেও প্রাথমিকভাবে মারণ ক্ষমতা বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে নিপাও সম্ভবত সাধারণ ভাইরাসে পরিণত হবে। এইচআইভির ক্ষেত্রেও একই জিনিস দেখা গিয়েছে।
কতটা সতর্ক থাকা দরকার?
ভাইরাসের তাৎক্ষণিক মারণক্ষমতা কমলেও, দীর্ঘমেয়াদে এর আক্রমণে শরীরের ক্ষতি হতেই পারে। কোভিড বা এইচআইভির মারণক্ষমতা কমে গিয়েছে বলে এই সব ভাইরাস সংক্রান্ত সব সতর্কতা ভুলে গেলে মুশকিল। একইভাবে কুকুর বা বিড়াল কামড়ালে সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্টি-র্যাবিস ভ্যাকসিন নেওয়া দরকার। কেউ র্যাবিসে আক্রান্ত হলে কিন্তু তার মৃত্যু নিশ্চিত। তাই কোনো যুক্তিতেই ভাইরাসকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।
কয়েকটি ক্ষতিকর ভাইরাস
র্যাবিস বা জলাতঙ্ক
মৃত্যুর হারের দিক থেকে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে মারাত্মক ভাইরাস। একবার এই ভাইরাসের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর রোগীর মৃত্যুর হার ১০০ শতাংশ। এটি সাধারণত সংক্রমিত কুকুর, বিড়াল, বাদুড় বা অন্যান্য প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। এটি মারাত্মক হলেও, প্রাণী কামড়ানোর পরপরই দ্রুত ভ্যাকসিন নিলে এই রোগ সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এইচআইভি
এইচআইভি সরাসরি মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ধ্বংস করে। এর ফলে সাধারণ কোনো রোগও মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। চিকিৎসা না করালে এটি এইডস-এ রূপ নেয়। একসময় এটি নিশ্চিত মৃত্যু ডেকে আনলেও, বর্তমানে উন্নত অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপির মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
লিখেছেন শুভজিত্ অধিকারী
কতটা ভয়ঙ্কর ব্যাকটেরিয়া!
ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার তুলনা করলে দেখা যাবে, ব্যাকটেরিয়ার মারণ ক্ষমতা অনেকটাই বেশি। ২০০১ সালে আমেরিকায় চিঠির মাধ্যমে অ্যানথ্রাক্স ছড়ানোর ঘটনাটি বিশ্ববাসী এখনও মনে রেখেছে। ব্যাকটেরিয়ার মারণ ক্ষমতার জন্যই আমেরিকা সহ রাশিয়া, চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো শক্তিশালী দেশগুলো নিজেদের অস্ত্রাগারে গোপনে জৈব মারণাস্ত্র হিসেবে কিছু ব্যাকটেরিয়া মজুত রেখেছে বলে অনেকেই মনে করেন।
কতটা মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া
না সব ব্যাকটেরিয়ার সমান ক্ষতিকর নয়। তবে কিছু ব্যাকটেরিয়া সত্যিই ভয়ঙ্কর। আর তার কারণও রয়েছে। কিছু এমন ব্যাকটেরিয়া আছে যেগুলি প্রতিকূল পরিবেশে কোনো পুষ্টি ছাড়াই বছরের পর বছর বেঁচে থাকতে পারে। এছাড়া এরোসল, ত্বকের সংস্পর্শ এবং খাবার বা জলের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে সক্ষম। ফলে খুব অল্প সময়ে একটি বিশাল জনপদকে আক্রান্তও করতে পারে।
প্রধান মারক ব্যাকটেরিয়াগুলি
• ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস (অ্যানথ্রাক্স): কিউটেনিয়াস বা ত্বকের অ্যানথ্রাক্স প্রাণঘাতী না হলেও, নিউমোনিক অ্যানথ্রাক্স (যা ফুসফুসে ঢোকে) এবং সেপটিসিমিক অ্যানথ্রাক্স দ্রুত মৃত্যু ঘটাতে পারে।
• ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস (প্লেগ): বর্তমানে এর প্রকোপ কমলেও নিউমোনিক প্লেগ অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং এর মারণক্ষমতাও অত্যন্ত বেশি।
• বুর্খোলডেরিয়া: এই ব্যাকটেরিয়া পরিবেশে দীর্ঘকাল টিকে থাকে। এরোসল বা বাতাসবাহিত সংক্রমণ অত্যন্ত মারাত্মক।
• ক্লসট্রিডিয়াম বটুলিনাম ব্যাকটেরিয়া: এই ব্যাকটেরিয়া এক ধরনের নিউরোটক্সিন তৈরি করে। সামান্য পরিমাণ বটুলিনাম টক্সিন মানুষের স্নায়ুতন্ত্র বিকল করে দিতে সক্ষম। এ ছাড়াও টুলারেমিয়া, ব্রুসেলোসিস ও কিউ ফিভারের মতো সংক্রমণগুলিও প্রাণঘাতী হতে পারে।
উপসর্গ ও শারীরিক জটিলতা
ফুসফুসের সংক্রমণ: জীবাণু শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করলে প্রাথমিক উপসর্গ হিসেবে থাকবে তীব্র শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা। অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণও হতে পারে।
সেপটিসিমিয়া: জীবাণু রক্তে মিশে গেলে ‘মাল্টি অর্গান ফেলিওর’ হতে পারে। এর ফলে লিভার, কিডনিসহ শরীরের প্রধান অঙ্গগুলো কাজ করা বন্ধ করে দেয়।
শরীরে বিষক্রিয়া: কিছু ব্যাকটেরিয়া সরাসরি আক্রমণ না করে শরীরে বিষ বা টক্সিন তৈরি করে।
প্রতিরোধ ও প্রতিকার
সংক্রমণের বাড়বাড়ন্ত হয়েছে এমন এলাকার বাসিন্দাদের উচিত দ্রুত মাস্ক ব্যবহার করা। সাধারণ মাস্কের তুলনায় এন৯৫ বা আরও উন্নত মানের মাস্ক, যা রোগ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পারে। স্বাস্থ্যকর্মীরাও পিপিই, গগলস এবং অক্সিজেন সাপ্লাই সহ মাস্ক পরবেন।
চিকিৎসা
সন্দেহভাজন সংক্রমণের ক্ষেত্রে ডক্সিসাইক্লিন বা ফ্লোরোকুইনোলন গ্রুপের ওষুধ যেমন সিপ্রোফ্লক্সাসিলিন, লিভোফ্লক্সাসিলিন অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর হতে পারে। তবে গুরুতর ক্ষেত্রে আইভি ড্রিপের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
অ্যান্টিবডি ও ভ্যাকসিন
ব্যাকটেরিয়া টক্সিন তৈরি করলে, গামাগ্লোবিউলিন বা নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি (মোনোক্লোনাল) ব্যবহার করে বিষাক্ত পদার্থকে নিষ্ক্রিয় করতে হয়। ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে বলা যায়, সাধারণত প্লেগ বা কলেরার টিকা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রয়োগ করা হয়।
শেষ কথা
জনসচেতনতাই মূল কথা। মাস্কের উপযোগিতা তাই ভুললে চলবে না। এছাড়া জরুরি চিকিৎসার উপযোগী পরিকাঠামো থাকলে যে কোনও জীবাণুর আক্রমণ রুখে দেওয়া সম্ভব।
লিখেছেন সুপ্রিয় নায়েক