


পরামর্শে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডাঃ প্রীতম রায়।
অল্পেতেই জ্বর-সর্দি-কাশি ভাইরাল। আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা আছেই, সঙ্গে দোসর নানারকম সংক্রমণ। ঘন ঘন বাড়ির বাইরে বেরলে, তবেই সংক্রমণ শরীরে বাসা বাঁধে এমনটা নয়। বাড়ি, স্কুল, অফিস—যে কোনো জায়গাই হতে পারে সংক্রমণের উৎস। বরং দেখা গিয়েছে, আমাদের নিত্যব্যবহৃত জিনিসপত্রের মাধ্যমেই শরীরে সংক্রমণ প্রবেশের হার বেশি। শিশু সহ যে কোনো বয়সি মানুষই দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত জিনিস থেকে সংক্রমিত হতে পারেন। পার্স বা মানিব্যাগ, মোবাইল, শিশুদের খেলনা, গাড়ির স্টিয়ারিং, বাস-ট্রেন-মেট্রোর হাতল, রড, গাড়ির দরজা, অফিস ডেস্ক, লিফটের বোতাম— সংক্রমণ বাহকদের তালিকা আরও লম্বা! মোদ্দা কথা, যেসব জিনিসে একাধিক মানুষের হাত পড়ে, সেসব জিনিস থেকেই সংক্রমণ ছড়ায়।
তাহলে উপায়?
নিত্য কাজ করতে হবে। বাইরে বেরতেও হবে। যেসব জায়গা থেকে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, তাদের সংস্পর্শেও আসতে হবে। এগুলি এড়িয়ে বাঁচা যায় না। তাই কিছু বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত। সংক্রমণ এড়ানোর প্রসঙ্গ এলে প্রথমেই মনে পড়ে ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতাটি। ধরণির ধুলো না ঢেকে চর্মকার যেমন পা দু’টি ঢাকতে বলেছিলেন, এক্ষেত্রেও সংক্রমণ ছড়ানোর মূল মাধ্যমটি নিয়েই সচেতন হতে হবে। কোনো জায়গা ছুঁলেই সংক্রমণ হয় না। আণুবীক্ষণিক ছত্রাক, ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস যে হাতে ছুঁলাম, সেই হাত যখন নাকে-মুখে বা চোখে দিচ্ছি, তখনই শরীরে সংক্রমণ প্রবেশ করছে। তাই
১. এসব জিনিস ছোঁয়ার পর হাত ভালো করে ধুয়ে নেওয়াই সবচেয়ে সহজ সমাধান।
২. রাস্তার হাত চোখে-মুখে-নাকে না দেওয়াই প্রাথমিক ও প্রধান সচেতনতা।
৩. শিশুরাও এই নিয়মের বাইরে নয়। তারা নানা ধরনের খেলনা হয়তো মুখে দিল বা খেলনায় হাত দিয়ে সেই হাতেই চোখ রগড়াল, তখনই অসুস্থ হওয়ার শঙ্কা বাড়ে। তাই একদম ছোটো যারা, তাদের একা একা খেলতে দেবেন না। সঙ্গে অভিভাবকস্থানীয় কারওকে থাকতে হবে। স্কুলে যায় এমন শিশুরা যাতে ঘন ঘন মুখে হাত না দেয়, সে শিক্ষাও তাকে দিতে হবে।
৪. সংক্রমণের আর এক বড় উৎস রান্নাঘর। নিজের বাড়িতে খান বা রেস্তরাঁয়—থালাবাসন খুব ভালো করে পরিষ্কার করতে হবে। জলের জগ বা জল রাখার জায়গাটিও যেন পরিচ্ছন্ন হয়। রান্নাঘরে আরশোলা বা টিকটিকির উপদ্রব হলেও সংক্রমণের শঙ্কা বাড়ে। তাই রান্নাঘরের ডাস্টবিন সবসময় পরিষ্কার রাখা উচিত।
৫. সংক্রমণ আসে বেডরুম থেকেও। বিছানার চাদর ও বালিশের ওয়াড় পাল্টানোর প্রতি সকলে যত্নবান হন না। একই চাদর দিনের পর দিন পেতে রাখেন। নোংরা হলে তবেই বদলান। বিছানার চাদর ও বালিশের ওয়াড়ে অনেক সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম আণুবীক্ষণিক পোকা বা মিস্ট হয়। সেখান থেকেও সংক্রমণ ছড়ায়।
তিন বড় ভিলেন
নিত্য প্রয়োজনীয় সবকিছু থেকেই সংক্রমণ ছড়াতে পারে। সংক্রমণের প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে তিনটি জিনিস। মোবাইল, পার্স বা মানিব্যাগ ও বেসিনের পাশে রাখা তোয়ালে। অনেক সময় দেখা যায়, হাত ধোয়ার অভ্যাস রয়েছে, তবু ঘন ঘন সংক্রমণের শিকার হন অনেকে। দেখা যায়, হাত ধোয়ার পর যে তোয়ালেতে হাত মুছছেন, সেটি অপরিষ্কার বা দীর্ঘদিন কাচা হয়নি। মোবাইল কভার ও পার্স প্রায় সবসময় বাইরের পরিবেশে বের হয়। বিভিন্ন মানুষের হাতঘোরা টাকা-পয়সা রাখতে হয় পার্সে। তাই সংক্রমণের বড় উৎস পার্স। মোবাইলের কভারের মধ্যেও প্রচুর আণুবীক্ষণিক জীবাণু থাকে। অনেকে আবার বাথরুমে ফোন নিয়ে ঢোকেন। সেখান থেকেও ফোনের গায়ে ও কভারে অসংখ্য জীবাণু এসে জমে।
কোন পথে সমাধান
• সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে ১০-১৫ সেকেন্ড সময় ধরে হাত ধুতে হবে। বাইরে থেকে এসে হাত-পা ধুয়ে ঘরে প্রবেশ করুন। অফিসে পৌঁছেও ভালো করে হাত ধুয়ে নিন।
• কোনো সময়ই হাত না ধুয়ে নাকে-মুখে চোখে হাত দেবেন না।
• শিশুদের দিকে কড়া নজর রাখতে হবে। মেঝে থেকে কিছু তুলে বা খেলনা মুখে পুরে দেওয়া তাদের স্বভাব। তাই অভিভাবকদের কড়া নজরদারি প্রয়োজন।
• কোনো কোনো শিশুর আঙুল চোষার অভ্যাস থাকে। হাত মুখে দেওয়ার অভ্যাস কাটাতে পারলেই ভালো। নইলে অন্তত হাতের হাইজিন রক্ষা করতে হবে। ঘন ঘন হাত ধোয়ায় অভ্যস্ত করে তুলতে হবে।
• বেসিনের পাশের তোয়ালেটি যেন পরিচ্ছন্ন ও পরিষ্কার থাকে।
• বিছানার চাদর, সোফা ও বালিশের ওয়াড় সপ্তাহে অন্তত একবার কেচে রোদে দিন।
• পার্স বা মোবাইলের জন্য ডিসইনফেক্ট স্প্রে ব্যবহার করতে পারেন। তবে হাত ধোয়ার দিকে জোর দিলে খরচ না বাড়িয়েও সংক্রমণ রুখে দেওয়া যায়।
লিখছেন মনীষা মুখোপাধ্যায়