প্রীতম দাশগুপ্ত: ইডিয়েটস ছবিটার কথা মনে আছে? দেওয়ালে লেখা আছে মাত্র দু’টো ইংরেজি শব্দবন্ধ। ‘আই কুইট’। ঝুলছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিভাধর জয় লোবো। তাঁর তৈরি প্রজেক্ট এককথায় খারিজ হয়েছিল। অথচ সেটি ছিল একটি অনবদ্য কাজ। থ্রি ইডিয়েটস রুপোলি পর্দায় যেটি তুলে ধরেছিল, বাস্তবের সঙ্গে কিন্তু তার প্রচুর মিল রয়েছে। সাম্প্রতিক সমীক্ষা সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
ভারতের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলতে আমরা বুঝি আইআইটি, আইআইএম, এইমস, আইজার, এনআইটি— এইসব। দেশের প্রথম সারির এইসব প্রতিষ্ঠানে সুযোগ পায় দেশের সবচেয়ে মেধাবী পড়ুয়ারা। এই মেধাবীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান আত্মহত্যার প্রবণতায় উদ্বিগ্ন সুপ্রিম কোর্টও। আইআইটি-খড়্গপুর ও সারদা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই পড়ুয়ার অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে শুনানি হয়েছিল শীর্ষ আদালতে। সেই মামলাতেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট।
একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট বলছে, ২০১৮ সাল থেকে ২০২৫-এর অক্টোবর পর্যন্ত এইসব প্রতিষ্ঠানের ৯৮ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী আত্মঘাতী হয়েছে। এর ৩৯টি ঘটনা শুধুমাত্র আইআইটিতেই ঘটেছে। ২৫ জন করে পড়ুয়ার মৃত্যু হয়েছে এনআইটি ও কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে। এছাড়া আইআইএমের চারজন, আইজারের তিনজন ও আইআইআইটির দু’জন পড়ুয়ার আত্মঘাতী হওয়ার খবর মিলেছে।
সম্প্রতি ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো বা এনসিআরবির তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। সেখানকার রিপোর্ট আরও ভয়াবহ। সেখানে বলা হয়েছে, স্রেফ ২০২৩ সালেই ১৩ হাজার ৮৯২ জন পড়ুয়া আত্মঘাতী হয়েছে। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৪৪। অর্থাৎ এক বছরে পড়ুয়া আত্মঘাতী হওয়ার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে সাড়ে ছয় শতাংশ। এক দশকের যে তথ্য কেন্দ্রীয় সংস্থা দিয়েছে তাতে যে কোনও মানুষ উদ্বিগ্ন হতে বাধ্য। ২০১৩ থেকে ২০২৩—এই ১০ বছরে দেশ হারিয়েছে ১ লক্ষ ১৭ হাজার ৮৪৯ জন পড়ুয়াকে। ১০ বছরে এই পড়ুয়া-স্বেচ্ছামৃত্যু বেড়েছে ৬৪.৯ শতাংশ। মোদিজি উন্নয়নের এত গালভরা প্রতিশ্রুতি দিতে পারেন, কিন্তু মেধাবীদের এই মৃত্যুমিছিল রোধে নীরব! প্রতিবছরই ধাপে ধাপে এই মৃত্যু বাড়ছে। যে সব রাজ্যে সবচেয়ে বেশি পড়ুয়া আত্মঘাতী হয়েছে, তার প্রথম তিনেই রয়েছে মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ। মানে ডাবল ইঞ্জিন রাজ্য। তথ্য বলছে, সবচেয়ে বেশি আত্মঘাতী পড়ুয়া সেকেন্ডারি পর্যায়ের। স্নাতক বা তার চেয়ে বেশি পর্যায়ের পড়ুয়া সাড়ে পাঁচ শতাংশ। গত ২০ আগস্ট সংসদে শিক্ষা দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলেছিলেন, শিক্ষার্থী আত্মহত্যা রুখতে মনোদর্পণ কর্মসূচির সূচনা করেছে সরকার। চালু করা হয়েছে টোল ফ্রি হেল্পলাইন। এছাড়া মানসিক শক্তিবৃদ্ধিতে নানাবিধ টেলি সার্ভিস চালুর কথাও জানান তিনি। কিন্তু এতকিছুর পরেও পড়ুয়া মৃত্যু মিছিল আটকানো যাচ্ছে কি? উত্তরটা না। অকালেই ঝড়ে যাচ্ছে অসংখ্য প্রতিভা।
এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সুপ্রিম কোর্ট অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এস রবীন্দ্র ভাটের নেতৃত্বে একটি জাতীয় টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে। এই দলে রয়েছেন মনোরোগ, শিক্ষা, আইন, ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বিশেষজ্ঞরা। রয়েছেন সরকারি কর্মকর্তারাও। তাঁদের কাজ হল, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার কারণ বিশ্লেষণ করা ও সারা দেশের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের পরামর্শ দেওয়া।
এই টাস্ক ফোর্স একটি জাতীয় পর্যায়ের সমীক্ষা করছে। যেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রশাসকদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। তবে, একাধিকবার অনুরোধ করার পরও ৬০ হাজারের বেশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র সাড়ে তিন হাজার প্রতিষ্ঠান সমীক্ষার উত্তর দিয়েছে। এর মধ্যে ছিল ১৭টি আইআইটি, ১৫টি আইআইএম, ১৬টি এইমস এবং ২৪টি এনআইটি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির এই অনীহায় রীতিমতো ক্ষুব্ধ সর্বোচ্চ আদালত বলেই দিয়েছে, যারা এই প্রচেষ্টাকে উপেক্ষা করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে এবং তাদের সুনাম ক্ষুণ্ণ হতে পারে।
ফিরে আসি থ্রি ইডিয়েট ছবিতে। জয় লোবো আত্মঘাতী হয়েছিল। আর কপাল ভালো ছিল বলে বেঁচে গিয়েছিল রাজু রাস্তোগী। মনে আছে বীরু ‘ভাইরাস’ সহস্রবুদ্ধে কীভাবে চাপ দিয়েছিল রাজুকে? যেভাবেই হোক ফাঁসাতে হবে র্যাঞ্চোকে। এমনই চাপ প্রতিষ্ঠান প্রধানের, দিশাহারা হয়ে গিয়েছিলেন রাজু। শেষে আত্মঘাতী হওয়ার সিদ্ধান্ত। এটা কিন্তু স্রেফ ফিল্মি বিষয় নয়। বাস্তবেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চাপ ও উদাসীনতা আত্মহত্যায় ইন্ধন দেয়। বিশেষ করে এলিট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই অদৃশ্য চাপ আরও বেশি থাকে। শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির শিক্ষার্থীরা ভয়ানক মানসিক চাপে ভোগে। একদিকে ভালো রেজাল্ট করার চাপ। তার উপর কখনও থাকে আর্থ-সামাজিক বৈষম্যর চাপ। সবমিলিয়ে পড়ুয়ারা একটি অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকে। এই এলিট ইনস্টিটিউশনগুলি গুণগতমানের জন্য সমাদৃত। কিন্তু তবুও তাদের অনেকে শিক্ষার্থীদের মানসিক সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায় আত্মহত্যার সঙ্গে পড়াশোনা নিয়ে প্রত্যাশার অত্যধিক চাপ অথবা সামাজিক চাপ দায়ী।
মনে আছে রোহিত ভেমুলার কথা। হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পিএইচডি স্কলার। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁর আত্মহত্যার ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। অভিযোগ ছিল, এবিভিপি সদস্যদের সঙ্গে গোলমালের জেরে তাঁকে হস্টেল থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছিল। এ সংক্রান্ত অভিযোগও তিনি করেছিলেন উপাচার্যকে। বলেছিলেন, তিনি হয়রানি ও হেনস্তার শিকার।
উত্তর ২৪ পরগনার শ্যামনগরের বাসিন্দা অনমিত্র রায়কে মনে পড়ছে। অটিজমে আক্রান্ত এই ব্যক্তি আইজারের কল্যাণী ক্যাম্পাসে গবেষণা করছিলেন। চলতি আগস্টে ল্যাবরেটরির ভিতরেই আত্মহত্যার চেষ্টা করেন অনমিত্র। পরে কল্যাণীর এইমসে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে অনমিত্র লিখেছিলেন, এক সতীর্থ গবেষক তাঁকে বার বার হেনস্তা করতেন। ওই গবেষকের বিরুদ্ধে তাঁদের সুপারভাইজ়ারের কাছে নালিশ করলেও তিনি বিষয়টি গুরুত্ব দিতে চাননি। এর পরই আইজার কলকাতার ‘অ্যান্টি র্যাগিং’ সেলে অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু তারাও বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি বলে অভিযোগ।
উঁচু ক্লাসের ঘটনা নয়, সম্প্রতি কলকাতায় একটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে। শৌর্য (রাজুল) সরকার নামে একটি ছেলে বুলির শিকার হয়ে আত্মঘাতী হয়েছে। অথচ কী ব্রাইট ছিল ছেলেটি। তার একমাত্র দোষ, সে ছিল স্পেশাল চাইল্ড। এই অপরাধে ক্লাসে বুলির শিকার হতে হয় ছেলেটিকে। শেষমেশ জীবন শেষ। এরকম ঘটনা অহরহ ঘটছে।
এই যে ব্রাইট ছেলেগুলি ঝরে যাচ্ছে, তার দোষ কার? দোষ আমাদের সবার। আমরা যারা বাবা-মা। আমরা যারা শিক্ষক। আমরা যারা সহপাঠী। আমরা, সমাজ-প্রতিষ্ঠান। কেউই নিজেকে নির্দোষ বলতে পারব না। বাবা-মা মনে করেন, ছেলে-মেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠানে ভরতি হয়েছে, তাদের কেরিয়ার ভালো করতে হবে। এটা ভাবা দোষের নয়। কিন্তু অনেক সময়ই বাবা-মায়েরা সন্তানদের চাহিদা বুঝতে পারেন না। তাদের ভালোলাগা না বুঝেই তাদের ইঁদুর দৌড়ে শামিল করাতে চান। ফল বহু ক্ষেত্রেই হিতে বিপরীত হয়। সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মেলামেশা করা, তাদের চাহিদা বোঝা, তাদের ভালোলাগা বহু অভিভাবক সবসময় বুঝতেই পারেন না।
প্রতিষ্ঠান তা সে যতই নামী হোক না কেন, দায়িত্ব এড়াতে পারে না। পড়াশোনার একটা চাপ তো থাকেই। তার উপর যদি সামাজিক চাপ অসহনীয় হয়ে ওঠে তাহলে সেই পড়ুয়া ভেঙে পড়তে বাধ্য। ক্যাম্পাসে সামাজিক বঞ্চনা এবং উচ্চবর্ণ বা শহরমুখী সংস্কৃতির আধিপত্য অনেক শিক্ষার্থীকে একঘরে করে দেয়। অনেকেই সাহায্য চাইতে লজ্জা পায় বা দ্বিধা করে। শেষে দেখা যায় চাপের মুখে কেউ কেউ মাদকাসক্তির মতো ক্ষতিকর অভ্যাসে জড়িয়ে পড়ে। প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও প্রশাসনিক উদাসীনতা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। বহু ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, পড়ুয়ার জীবন শেষ করে দেওয়ার পিছনে ইন্ধন রয়েছে সহপাঠীদেরও। মনোবিদরা বলছেন, শিশুদের ব্যর্থতা, হতাশা বা অনিশ্চয়তা সামলানোর শিক্ষা দেওয়া হয় না। আমরা তাদের জীবন নয়, শুধু পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করি। তাই শিশু সহজে ভেঙে পড়ে ও নিজের জীবন শেষ করে দেয়। এটা সত্যি খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক। সন্তানকে মানসিকভাবে শক্ত করার দায়িত্ব অভিভাবকদেরই।
এই মেধাবী পড়ুয়াদের মৃত্যুতে উদ্বিগ্ন সুপ্রিম কোর্ট ১৫ দফা নির্দেশিকা জারি করেছে। যেমন ১) ১০০ বা তার বেশি শিক্ষার্থীযুক্ত প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর নিয়োগ বাধ্যতামূলক, ২) শিক্ষক ও কর্মীদের নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ, ৩) গোপনীয় অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি গঠন, ৪) আত্মহত্যা প্রতিরোধে নিরাপত্তার ব্যবস্থা ইত্যাদি।
আসলে মানসিক স্বাস্থ্যের শিক্ষা স্কুল জীবন থেকেই নিয়মিত করা উচিত। শিক্ষার্থীর কথা শোনা ও অনুধাবন করা দরকার শিক্ষকদের। ওর কথা শোনার দরকার নেই বা বাচ্চাকে ইগনোর করলে বহু ক্ষেত্রেই তাদের আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। এই তো দিন কয়েক আগে রাজস্থানের নামী স্কুলের একটি ক্লাস ফোরের বাচ্চা আত্মঘাতী হল বুলির শিকার হয়ে। বাবা-মার অভিযোগ, এক বছর ধরে শিক্ষকদের বললেও তাঁরা বিষয়টিকে ইগনোর করেছেন। উলটে মেয়েটিকে মানিয়ে নেওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। দিল্লির নামী স্কুলের ছেলে শৌর্য পাতিলের আত্মহত্যা কিংবা মধ্যপ্রদেশের ক্লাস ইলেভেনের ছাত্রীর আত্মঘাতী হওয়ার ঘটনাতেও উঠে এসেছে শিক্ষকদের ভূমিকা। মনে রাখা দরকার, শিক্ষার্থীদের একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা আমাদের দায়িত্ব। আবার ফিরে আসি থ্রি ইডিয়েটে। র্যাঞ্চোর কথায়, কামিয়াব হোনে কে লিয়ে নেহি, কাবিল হোনে কে লিয়ে পড়ো।… কামিয়াবি তো ঝাক মারকে পিছে ভাগেগি। অর্থাৎ, যোগ্য হওয়ার চেষ্টা কর, সাফল্যের পিছনে দৌড়িও না। সাফল্য আপনা থেকেই আসবে। এটাই সত্যি। আল ইজ ওয়েলের দায়িত্ব আমাদের সবার।