পুরুলিয়ায় বরফের দেখা! তুষারপাতের সঙ্গে এর তফাত কী? জানালেন স্বরূপ কুলভী
পুরুলিয়ায় বরফের দেখা! তুষারপাতের সঙ্গে এর তফাত কী? জানালেন স্বরূপ কুলভী
‘কন্কনে শীত তাই
চাই তার দস্তানা;
বাজার ঘুরিয়া দেখে
জিনিসটা সস্তা না।
কম দামে কিনে মোজা
বাড়ি ফিরে গেল সোজা—
কিছুতে ঢোকে না হাতে,
তাই শেষে পস্তানা।’
ছোট্ট বন্ধুরা, কয়েকদিন আগে খবরের কাগজে একটা খবর নিশ্চয়ই নজরে পড়েছে তোমাদের— শীতের পুরুলিয়ায় বরফ কণা জমেছে। প্রবল ঠান্ডা আর উত্তুরে হাওয়ার দাপটে কাঁপছে পশ্চিমবঙ্গের ওই এলাকা। এরইমধ্যে পুরুলিয়ায় প্রকৃতি এক অভিনব সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়েছে। সেখানে শীতের ভোরে দেখা মিলল বরফের। ভোরের আলো ফুটতেই দেখা যাচ্ছে, মাঠের ঘাস, গাছের পাতা বা বাড়ির চাল, খড়ের গাদা, লোহার পাইপ ও গাড়ির কাচে জমে রয়েছে বরফের পাতলা আস্তরণ। কেউ কেউ অতি উৎসাহে বলছে, পুরুলিয়ায় বরফ পড়েছে! কিন্তু মোজা যেমন দস্তানা নয়, তেমনই পুরুলিয়ায় হালকা বরফের দেখা পাওয়া আদতে তুষারপাত নয়। তাহলে সেটা কী? বিজ্ঞানের ভাষায় এটি আদতে গ্রাউন্ড ফ্রস্ট বা ভূমি তুষার। শীতের রাতে যে শিশির পড়ে, উপযুক্ত পরিবেশে তা ভোরের দিকে জমে বরফ হয়ে যায়। আর ভোরে ঘুম থেকে উঠে সাধারণ মানুষ দেখেন, সাদা বরফের একটা আস্তরণ। পুরুলিয়ায় সম্প্রতি এমনটাই দেখা গিয়েছে। তবে এই ঘটনা নতুন কিছু নয়। পুরুলিয়ার বান্দোয়ান ও বেগুনকোদর এলাকা আগেও এধরনের ঘটনার সাক্ষী থেকেছে।
গ্রাউন্ড ফ্রস্ট কীভাবে তৈরি হয়?
শীতের দীর্ঘ রাতে সম্পূর্ণ মেঘমুক্ত আকাশ গ্রাউন্ড ফ্রস্টের পরিবেশ গড়ে তোলে। সেইসঙ্গে বায়ুপ্রবাহহীন অবস্থা এবং ভূপৃষ্ঠের আর্দ্রতা পর্যাপ্ত থাকতে হবে। মেঘহীন আকাশে প্রবল ঠান্ডার রাতে ভূপৃষ্ঠ খুব দ্রুত তাপ বিকিরণ করে শীতল হয়ে পড়ে। ওই স্থানের সংস্পর্শে এসে বাতাসও শীতল হয়। শীতল বাতাস জলীয় বাষ্প ধারণ করে রাখতে পারে না। ফলে অতিরিক্ত জলীয় বাষ্প ধুলোবালিকে আশ্রয় করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয়। তারপর তা মাঠের ঘাসে, গাছের পাতায় জলবিন্দু হয়ে পড়ে। একে বলা হয় শিশির। আর পাহাড়ি বা মালভূমি এলাকায় যখন তাপমাত্রা শিশিরাঙ্কের নীচে নেমে যায়, তখন ওই জলীয় বাষ্প আর শিশিরে পরিণত হয় না। তা সরাসরি কঠিন বরফ আকারে জমা হয়। এজন্য ভোরে বরফের আস্তরণ দেখা দেয়। পুরুলিয়ায় এটাই দেখা গিয়েছে। তা মোটেই তুষারপাত নয়।
তুষারপাতের সঙ্গে গ্রাউন্ড ফ্রস্টের ফারাক কী?
এর উত্তরের জন্য আগে জেনে নেওয়া যাক— তুষারপাত কাকে বলে? আসলে তুষার আর বৃষ্টি একইভাবে হয়। ভূপৃষ্ঠের জল গরম হয়ে বাষ্প আকারে আকাশে উঠে যায়। জলীয় বাষ্প বায়ুমণ্ডলের উপরের দিকে উঠে ঠান্ডা হয়ে ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয়। ক্ষুদ্র জলকণা ও ধূলিকণা মিশে আকাশে মেঘ তৈরি করে। তা আরও উপরে উঠে ক্রমশ ঠান্ডা হতে থাকে। মেঘের জলীয় বাষ্প প্রথমে জলবিন্দু এবং আরও ঠান্ডা হলে বরফের কুচিতে পরিণত হয়। এই জলবিন্দু বা বরফ কণাগুলি মেঘের আরও অন্যান্য জলবিন্দুর সঙ্গে যুক্ত হলে আয়তনে বড় হতে থাকে। একটা সময় আকাশে আর ভেসে থাকতে পারে না। ফলে মাটির দিকে নেমে আসতে থাকে। যেখানে তাপমাত্রা উষ্ণ থাকে, সেখানে মাটিতে পড়ার আগেই আকাশে বরফকণাগুলি গলে যায়। তা জল আকারে ঝরে পড়ে। একেই বলে বৃষ্টি। আর মেঘ থেকে বরফকণাগুলি পড়ার সময় মাটি পর্যন্ত তাপমাত্রা হিমাঙ্কের কম অর্থাৎ শূন্য ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড বা তারও কম থাকলে কী হবে? তাহলে আর বরফকণাগুলি
সম্পূর্ণ গলে যাবে না। সেটিই তুষারপাত বলে পরিচিত। শীতল তাপমাত্রার পার্বত্য অঞ্চলে এমনটা দেখা যায়।
ছোট্ট বন্ধুরা, তাহলে বুঝতেই পারছ তুষারপাতের জন্য প্রয়োজন মেঘ আর বৃষ্টি। অন্যদিকে, গ্রাউন্ড ফ্রস্টের জন্য কিন্তু মেঘ থাকতে হবে না। এজন্য প্রয়োজন পরিষ্কার আকাশ আর প্রবল ঠান্ডা।