Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সংযমের বার্তা কীসের ইঙ্গিত?

আমেরিকা-ইরানের যুদ্ধের আবহে গত মার্চ মাসে গৃহস্থালির রান্নার গ্যাসের দাম বেড়েছে। ১ মে বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম এক ধাক্কায় বেড়ে হয়েছে ৩২০০ টাকার।

সংযমের বার্তা কীসের ইঙ্গিত?
  • ১২ মে, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

আমেরিকা-ইরানের যুদ্ধের আবহে গত মার্চ মাসে গৃহস্থালির রান্নার গ্যাসের দাম বেড়েছে। ১ মে বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম এক ধাক্কায় বেড়ে হয়েছে ৩২০০ টাকার। এবার আর কোনো রাখঢাক না করে পেট্রল, ডিজেল ও গ্যাস ব্যবহারে ‘সংযমী’ হওয়ার পরামর্শ দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর এই সতর্কবার্তা আসলে জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধির আশঙ্কাকে উসকে দিল বলে মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। দাম বাড়ানোর আগে সংযতভাবে পেট্রপণ্য ব্যবহারের কথা বলে দেশবাসীকে করোনাকালের মতো সংযমী হওয়ার অবস্থায় ফিরে যেতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর পরামর্শের মধ্যে রয়েছে, পেট্রল­-ডিজেলের ব্যবহার কমানো, ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহণ ও মেট্রো ব্যবহার করা, এক বছর সোনা কেনা বন্ধ রাখা, ডলার বাঁচাতে অযথা বিদেশে যাওয়া এড়ানো, অন্তত এক বছর শুধু অত্যাবশ্যকীয় পণ্যই কিনুন, পণ্য পরিবহণে রেলপথ ব্যবহার করাই ভালো এবং কোভিড পর্বের মতো সম্ভব হলে বাড়ি থেকে কাজ করার মতো বিষয়গুলি। বৈঠক হোক অনলাইনে, রান্নায় ভোজ্য তেল ব্যবহারেও রাশ টানতে বলেছেন মোদি। প্রধানমন্ত্রীর মতে, আমদানি হওয়া পণ্য ব্যবহার কমিয়ে দেশীয় পণ্য ব্যবহারে জোর দিতে হবে। ‘আন্তর্জাতিক আর্থিক সংকট, জোগানের সমস্যা এবং সংঘাতের কারণে বাড়তে থাকা দামের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ভারতকে সাহায্য করতে দেশবাসীর একসঙ্গে এগিয়ে আসা জরুরি’— চান প্রধানমন্ত্রী। দেশের কঠিন সময়ে দেশবাসীকে নিজেদের কর্তব্য পালনের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। 

Advertisement

ভারতে পেট্রপণ্যের মোট চাহিদার ৯০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। যুদ্ধের বাজারে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে অনেকটাই। পাশাপাশি ডলারের নিরিখে টাকার দামে বিপুল পতন ঘটেছে। সন্দেহ নেই, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলিকে বড়ো অঙ্কের বাড়তি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। এতে লোকসানে ডুবছে তেল সংস্থাগুলি, যা দীর্ঘদিন চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। বলা হচ্ছে, বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৩৬ শতাংশ বাড়ায় আমেরিকার মতো ধনী দেশ নিজেদের বাজারে ৪১ শতাংশ তেলের দাম বাড়িয়েছে। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গত আড়াই মাসে ভারতে তেলের দাম বাড়েনি। পরিস্থিতি এখন, একদিকে ঘুরপথে তেল আনতে পরিবহণ খরচ বেশি পড়ছে, বেড়েছে বিমান খরচও। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে তেলের মজুতও প্রায় বাড়ন্ত। অতএব, পেট্রল ডিজেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। এপ্রিলে পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটের দিকে তাকিয়ে দাম বাড়ানো হয়নি। কিন্তু এখন দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতেই তেলের দামবৃদ্ধি করাটা প্রায় অনিবার্য হয়ে পড়েছে। তাই আম জনতার তোপের মুখে পড়ার আগে সংযমের বার্তা দিয়ে মোদি আসলে জমি তৈরি করে বোঝাতে চাইলেন, কেন্দ্র শেষ বিন্দু পর্যন্ত দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঠেকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর। 
এখনও তেলের দাম না বাড়লেও মূল্যবৃদ্ধির ছ্যাঁকা অবশ্য ভালোভাবেই টের পেতে শুরু করেছে দেশের সাধারণ ও কম রোজগেরে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। ইতিমধ্যে সাবান থেকে ডিটারজেন্ট, বিস্কুট থেকে প্যাকেটবন্দি খাবার, চা-কফি থেকে শ্যাম্পু— দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রায় সব জিনিসেরই দাম বেড়েছে ৩ থেকে ৫ শতাংশ। এখানেই না থেমে আরও দাম বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে কনজিউমার গুডস তৈরির সংস্থাগুলি। তাদের অধিকাংশের দাবি, যুদ্ধের কারণে তাদের উৎপাদিত পণ্য তৈরির খরচ ১০ থেকে ২০ শতাংশ নাকি বেড়েছে। সুতরাং আরও একদফা দাম না বাড়ালে সংস্থা চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে। উৎপাদনও কমিয়ে বা বন্ধ করে দিতে হবে। কোনো কোনো সংস্থা আবার সরাসরি দাম না বাড়িয়ে কিছুটা কম পণ্য ভরে প্যাকেটের ওজন কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কথা ভাবছে। সব মিলিয়ে তাই দামের ছ্যাঁকায় ঝলসে যাওয়ার অবস্থা তৈরি হয়েছে। অনেকেরই আশঙ্কা, এই সুযোগে আনাজপাতির বাজারেও দাম বেড়ে যেতে পারে পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়লে। একদিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা, অন্যদিকে মুদির দোকানের পণ্য সামগ্রীর আরও একদফা দাম বৃদ্ধির হুঁশিয়ারির বলি ঘুরে ফিরে সেই আম জনতাই। সংযমী হওয়ার বার্তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী যেন দেশবাসীকে বলতে চাইলেন, ‘আপনি কুর্সি কি পেটি বাঁধ লিজিয়ে, মৌসম বিগাড়নেওয়ালা হ্যায়।’

সম্পর্কিত সংবাদ