


কলহার মুখোপাধ্যায়: ‘ভোট গণতন্ত্রের উৎসব,’ এই কথা বারবার শোনা যায়। কিন্তু সেই উৎসবের মঞ্চে যখন বিকট আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে থাকে আধাসেনা, তাদের উপস্থিতি নিরাপত্তার বদলে ভয়েরই প্রতীক হয়ে ওঠে। প্রশ্ন জাগে, এটা কি সত্যিই নিরাপত্তা, নাকি এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সন্ত্রাস প্রদর্শনের রূপ?
গ্রামের বুথ হোক বা শহরের স্কুলঘর, ভোটের দিন বহু জায়গা থেকেই উঠে আসে অভিযোগ, লাইন ভাঙার জন্য সপাটে চড়, পরিচয় যাচাইয়ের অজুহাতে অপমান
কিংবা অস্ত্রে হাত দিয়ে শৃঙ্খলা শেখানো। সাধারণ কোনো ভোটার যিনি হয়তো সারাবছর প্রশাসনের মুখই দেখেন
না, সেই মানুষটিকে ভোটের দিন হঠাৎ এমন এক
ক্ষমতার সামনে দাঁড় করানো হয় যেখানে তাঁর প্রতিবাদ করার সাহস পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এটা হল, ভারতবর্ষের নির্বাচনগুলিতে নিরাপত্তার নামে ভয় দেখানোর এক প্রকাশ্য মহড়া।
রাষ্ট্রের যুক্তি, ‘ভোট অবাধ ও শান্তিপূর্ণ রাখতে নিরাপত্তা বাহিনী দরকার।’ কিন্তু প্রশ্ন, সেই নিরাপত্তা মানবিক থাকছে তো? যদি এক বৃদ্ধ ভোটারকে লাইনে একটু এগিয়ে যাওয়ার জন্য চড় খেতে হয়, যদি একজন প্রথমবারের ভোটার অস্ত্রের ঝলক দেখে আতঙ্কিত হয়ে বাড়ি ফিরে যান, সেই নির্বাচন ভয় মুক্ত, ন্যায়সঙ্গত হল তো?
ভয় দেখিয়ে আদায় করা শৃঙ্খলা কি কখনো গণতন্ত্রের ভাষা হতে পারে?
সন্ত্রাসের সত্যিকারের সংজ্ঞাটা এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। সন্ত্রাস মানে বোমা, গুলি বা রক্তপাত শুধু নয়। সন্ত্রাস মানে ভয় তৈরি করাও। এমন ভয় যা মানুষের স্বাভাবিক অধিকার প্রয়োগের ইচ্ছাকেই স্তব্ধ করে দেয়। যখন আইনরক্ষার ভার যাঁদের হাতে সেই বাহিনীই এরকম ভয় তৈরির মাধ্যম হয়ে ওঠে, তখন তাকে কীভাবে সন্ত্রাসের থেকে আলাদা করা যায়? ইউনিফর্ম আর আইনের মোড়কে থাকছে বলেই কি তা সন্ত্রাস নয়?
উদ্বেগজনক হল, নির্বাচন কমিশনের প্রশাসন এই ধরনের ঘটনাগুলিকে ‘ছোটোখাটো বিষয়’ বলে দাগিয়ে দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। চড় মারার অভিযোগ জমা পড়ে না। অহেতুক অস্ত্র প্রদর্শনের তদন্ত হয় না। ধীরে
ধীরে দেশের মানুষ এই পরিস্থিতিকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করেছেন। এই স্বাভাবিকীকরণই গণতন্ত্রের সবথেকে বিপজ্জনক অবস্থা। কারণ একবার যদি মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, ভোট দিতে গেলে অপমান বা হেনস্তা হবেনই, তাহলে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিটাই হয়ে পড়ে দুর্বল, ভঙ্গুর।
গণতন্ত্রে ভোট শুধু অধিকার নয়। নাগরিকের আত্মমর্যাদার প্রকাশও। সেই মর্যাদাকে যদি চড় মেরে, ভয় দেখিয়ে, অপমান করে দমন করার চেষ্টা চলে তা নিছক প্রশাসনিক কঠোরতা হয়ে থাকে না। তা হয়ে ওঠে প্রাতিষ্ঠানিক সন্ত্রাস। তা গভীরভাবে সমাজের ভিত্তিটাকে, গণতন্ত্রের মূল ধারণাটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
তাই ভোটের দিন যদি রাষ্ট্র নিজেই নাগরিকের সামনে দাঁড়িয়ে ভয় প্রদর্শন করে, তাহলে তাকে আর নিছক ‘নিরাপত্তা’ বলা যায় না, তা স্পষ্টতই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের চেহারা হয়ে ওঠে। অনেকের কাছে বিষয়টি অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবের কিছু উদাহরণ দেখলেই বোঝা যায়, বিষয়গুলি কতটা গভীর ও উদ্বেগজনক।
কয়েকটি ঘটনার দিকে তাকানো যাক,
২০২১, শীতলকুচি, কোচবিহার। চতুর্থ দফার ভোটে আধাসেনার গুলিতে ৪ জনের মৃত্যু। বাহিনীর দাবি, ‘আত্মরক্ষা করার জন্য গুলি চালাতে হয়।’ কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘বুথের কাছে অতিরিক্ত আগ্রাসী আচরণ ও গুলিচালনা ভোটারদের মধ্যে ভয় ছড়ানোর চেষ্টা।’ ২০১৯, এপ্রিল, মে। জম্মু ও কাশ্মীরের লোকসভা নির্বাচন। বিভিন্ন কেন্দ্রে কড়া নিরাপত্তা, ঘনঘন তল্লাশি ও বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে অভিযোগ, ‘সাধারণ মানুষ ভোট দিতে বেরতেই ভয় পেয়েছিলেন। ফলে কিছু এলাকায় ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যরকম কম।’ ২০১৯ , এপ্রিল। ত্রিপুরার লোকসভা নির্বাচন। একাধিক বুথ নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ, ‘কেন্দ্রীয় বাহিনী ভোটারদের লাইনে দাঁড়ানো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। অনেককে ফিরিয়ে দিয়েছে ভয় দেখিয়ে।’ ২০১৯, এপ্রিল। কাশ্মীরের লোকসভা। বারামুলাতে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক মোতায়েন ও কড়া নিয়ন্ত্রণের ফলে ভোটার উপস্থিতি কম। ২০১৯, এপ্রিল। উত্তরপ্রদেশের লোকসভা ভোট। বেশ কিছু এলাকায় অভিযোগ, ‘ভোটকেন্দ্রে পুলিশি কড়াকড়ি ও চেকিং এতটাই কঠোর ছিল যে, অনেক গ্রামীণ অঞ্চলের ভোটার আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।’ ২০১৬, মে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন। বিভিন্ন জেলা থেকে অভিযোগ আসে, ‘একাধিক বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনী লাইনে দাঁড়ানো ভোটারদের উপর চড়াও হয়েছে। অতিরিক্ত জেরা করেছে। কিছু ক্ষেত্রে ভয়ও দেখিয়েছে।’ সবক্ষেত্রেই বিরোধীরা এগুলিকে ‘সাইলেন্ট ইন্টিমিডেশন’ বলে ব্যাখ্যা দিয়েছিল।
ঘটনাগুলি একটি বিষয় পরিষ্কার করে, ভয় সবসময় দৃশ্যমান সহিংসতা হয় না। কখনো তা গুলির শব্দ, কখনো কড়া নজরদারি, কখনো আচরণের অহেতুক কঠোরতার মধ্যেও তা প্রকাশ পায়।
নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রশ্নটা তাই সরাসরি—নিরাপত্তা বাহিনী কি জনগণের রক্ষক? নাকি জনগণের নিয়ন্ত্রক? যদি রক্ষক হয়, তবে তাদের আচরণে মানবিকতা, সংযম এবং জবাবদিহি থাকা জরুরি। আর যদি নিয়ন্ত্রণই উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে, তাহলে সেই ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক বলা কতটা যুক্তিযুক্ত?
যে কোনো ভোট নীরব সন্ত্রাসের এই ধারাবাহিকতা মারাত্মক প্রভাব ফেলে চলেছে নাগরিকদের আত্মায়। ফলে দেশের নাগরিকরা নিজেদের অপমান একপ্রকার মেনে নিতে শিখেই গিয়েছেন। এই মেনে নেওয়াটাই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সবচেয়ে বড়ো সাফল্য। প্রশাসনের ভিতরে যে বিপজ্জনক প্রবণতাটি কাজ করে চলেছে তা ঘুণ ধরিয়ে দিয়েছে গণতন্ত্রে। ‘উপরওয়ালার নির্দেশ মানতেই হবে’—মাঠে থাকা আধাসেনা এটাই জানে। তারা এটাও জানে, সে যে কাজটি করছে তা মানবিক নয়। কিন্তু নির্দেশ অমান্য করলে শাস্তি। ফলে বিবেক চাপা পড়ে যায় প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির নীচে। আর এই কাঠামোই তৈরি করে এমন এক যন্ত্র, যা ‘প্রশ্নহীন ভয়’ ছড়িয়ে চলে নির্বাচনের পর নির্বাচনজুড়ে।
তিনবছরের রোহন কার্টুন দেখে না। ওর মা ডাক্তার। বাবা অধ্যাপক। কার্টুনে বিস্তর গোলাগুলি চলে। রোহন হিংসা শিখতে পারে। শিক্ষিত, সচেতন মা-বাবা তিনবছরের বাচ্চাটির মনে হিংসার বীজ পুঁততে চান না। রোহন সেদিন বেরিয়েছিল পার্কে যাবে বলে। কেন্দ্রীয় বাহিনী ভারী বন্দুক হাতে দিচ্ছিল পাহারা। রোহন বন্দুক দেখে উত্তেজিত। ‘মা গুড়ুম’ বলে জিভ উলটে মারা যাওয়ার ভঙ্গিমায় রাস্তায় শুয়ে পড়ে। বন্দুক দেখে ওর প্রথম রি-অ্যাকশান এটাই। রোহনের মা সচেতন। দ্রুত সরিয়ে নিয়ে গেলেন ছেলেকে। ‘হাল্লা রাজার সেনা’ দেখল। হেসে উঠল। রোহনের মা ভাবেন, এটুকু সচেতনতা রাষ্টের কাছ থেকে কি আশা করা যায় না যে, বাচ্চাদের উপর আগ্নেয়াস্ত্রের প্রভাব মারাত্মকভাবে পড়ে? এটুকু সচেতনতা আশা করা যায় না, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা মানুষগুলির কাছে?
তবে নির্বাচন কমিশন কেন কোনো রাষ্ট্রীয় কাঠামোই একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারে না? রাষ্ট্র কার জন্য? যদি রাষ্ট্র নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে তাকে আতঙ্কিত করে তোলে তাহলে সেই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র কতটা অবশিষ্ট থাকে? গণতন্ত্রে শৃঙ্খলা দরকার, কিন্তু সেই শৃঙ্খলা ভয় দেখিয়ে নয়, আস্থার মাধ্যমে গড়ে উঠবে। বন্দুক দেখিয়ে ভোট করানো যায়, কিন্তু বিশ্বাস অর্জন করা যায় না। আর বিশ্বাস ছাড়া গণতন্ত্র শুধুই কাঠামো, তার ভিতরে প্রাণ থাকে না।
রোহনের মা একা নন, লক্ষ লক্ষ মানুষ কি এটুকু সচেতনতা আশা করতে পারে না নির্বাচন কমিশনের কাছে?
‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ কোনো তাত্ত্বিক শব্দ নয়। এটা
সেই বাস্তবতা যেখানে ক্ষমতা নিজের সীমা ভুলে গিয়ে নাগরিকের উপর চেপে বসে। গলা টিপে ধরে। এই বাস্তবতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা, প্রতিবাদ করা—গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখার এটাই প্রথম শর্ত। ভোটের পরিবেশ
এমন হওয়া উচিত, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বন্দুকের ছায়ায় নয়, নিজের বিবেকের উপর নির্ভর করে।