নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: হোটেলের ভিতরে ছিল স্প্রিঙ্কলার—অগ্নি নির্বাপণের আধুনিক ব্যবস্থাপনা। প্রতিটি ফ্লোরে সেই স্প্রিঙ্কলারের সঙ্গে রয়েছে জলের পাইপের সংযোগও। কিন্তু এসব যে আদতে লোক দেখানো, মঙ্গলবার রাতে হোটেল ঋতুরাজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর তা কার্যত স্পষ্ট হয়ে গেল। বিপদের সময় স্প্রিঙ্কলারগুলি কোনও কাজই করেনি। তার কারণ, এগুলি সচল রাখার জন্য নির্দিষ্টভাবে কোনও পৃথক বিদ্যুৎ সংযোগ ছিল না। যে ব্যবস্থা ছিল, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে তা বিকল হয়ে যায়। একটি লাইন থেকে হোটেলের সর্বত্র বিদ্যুৎ সংযোগ থাকায় আগুনের কারণে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গোটা অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় স্বাভাবিকভাবেই। তদন্তে নেমে এমনই তথ্য এসেছে দমকলের হাতে। স্প্রিঙ্কলারের জন্য কেন পৃথক লাইন করা হল না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
স্প্রিঙ্কলারের জন্য কেন পৃথক বিদ্যুৎ সংযোগ প্রয়োজন? দমকল সূত্রে জানা গিয়েছে, এর জন্য শুধু পাইপ বসিয়ে দিলেই হয় না। জল যাতে রির্জাভার থেকে উপরে উঠতে পারে, তার জন্য অন্তত ২ হর্স পাওয়ারের পাম্প প্রয়োজন। এই পাম্পের জন্য সাধারণ বিদ্যুৎ সংযোগ ছাড়াও একটি পৃথক কানেকশন নিতে হয়। কারণ, সেক্ষেত্রে আগুন লেগে সাধারণ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় কোনও ব্যাঘাত হয় না। ঋতুরাজ হোটেলে এই ব্যবস্থা না থাকাতেই স্প্রিঙ্কলার থেকেও কোনও লাভ হয়নি বলে জানাচ্ছে দমকল। তাছাড়া, রিজার্ভারেও জল ছিল না বলে অভিযোগ। এমনকী, অগ্নিনির্বাপণের জন্য রাখা অগ্নি নির্বাপক সিলিন্ডারও কাজ করেনি। বুধবার ঘটনাস্থল ঘুরে দেখার পর ডিজি (দমকল) রণবীর কুমার বলেন, ‘২০২২ সালে শেষবার এই হোটেলটি দমকলের কাছ থেকে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট পুনর্নবীকরণ করেছিল। ওই শাংসাপত্র ছাড়া এতদিন কীভাবে হোটেলটি চলছিল, খতিয়ে দেখা হবে।’ সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, দমকলের সার্টিফিকেট না থাকলেও কীভাবে কলকাতা পুলিস ওই হোটেলকে ‘নো অবজেকশন’ দিল? ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত তাদের হোটেল চালানোর অনুমতি রয়েছে। এপ্রিল মাসে আবেদন জমা পড়ার কথা ছিল। এনওসি দেওয়ার আগে এসব ক্ষেত্রে পুলিস অগ্নিনির্বাপণের সমস্ত ব্যবস্থা ও রান্নাঘরে আগুন নেভানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে কি না, খতিয়ে দেখে। তাহলে কি সরেজমিনে পরিদর্শন না করেই এনওসি দিয়েছিল পুলিস? দমকলের ছাড়পত্র না থাকলেও কলকাতা পুরসভার কাছে হোটেল কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবারই ট্রেড লাইসেন্স পুনর্নবীকরণের জন্য ৬ হাজার টাকা জমা করে।
পুরসভা সূত্রে খবর, ২০১৯ সালের ২৯ মে ঋতুরাজ হোটেলের নতুন নামে লাইসেন্স ইস্যু হয়। ১৯৮০ সালে হোটেলটি চালু হয়েছিল। তখন অন্য নাম ছিল। পুরসভার এক কর্তা জানিয়েছেন, লাইসেন্সের খাতায় এই হোটেলটি থাকা ও খাওয়ার হোটেল হিসেবে নথিভুক্ত রয়েছে। ‘বলরাম প্রপার্টি প্রাইভেট লিমিটেড’-এর মালিক আকাশ চাওলার এক আত্মীয়ের যে বার একতলায় রয়েছে, সেটিও ২০০২ সালে লাইসেন্সপ্রাপ্ত। কিন্তু দ্বিতীয় পানশালা কাম রেস্তরাঁ নিয়ে কোনও তথ্য পুরসভার লাইসেন্স বিভাগের কাছে নেই। সূত্রের খবর, হোটেল মালিকই ‘হোটেল কাম বার কাম রেস্তরাঁ’র জন্য আবগারি দপ্তরে আবেদন জানিয়েছেন, যাতে হোটেলের মধ্যেই বারের পাশাপাশি আবাসিকদের ঘরেও মদ পাঠানোর পরিষেবা দেওয়া যায়। কিন্তু আবগারি দপ্তরের ছাড়পত্র এখনও মেলেনি।।