শুভঙ্কর বসু, কলকাতা: কথায় আছে, একটা মিথ্যাকে সত্য প্রমাণ করতে আরও পাঁচটা মিথ্যা বলতে হয়! পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর নিয়ে জ্ঞানেশ কুমারদের যে লেজে-গোবরে পরিস্থিতি, সেটা বার বার এই প্রবাদই স্মরণ করাচ্ছে। সম্প্রতি জানা গিয়েছিল, বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যে ‘বৈধ’ চিহ্নিত হওয়া ১৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দিতে ট্রাইবুনালে আবেদন জানানো হয়েছে খোদ কমিশনের তরফে। তা নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ায় দায় ঠেলা হয়েছে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিকের দপ্তরের (সিইও অফিস) ঘাড়ে। সুপ্রিম কোর্টে দেওয়া হলফনামায় সেকথা উল্লেখ করেছেন জ্ঞানেশ কুমার অ্যান্ড কোম্পানি। যদিও আদালতের বাইরে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের উদ্বেগ বাড়িয়েছেন বাংলার এসআইআরে কমিশন নিযুক্ত বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত স্বয়ং। দাবি করেছেন, বিষয়টি নিয়ে তাঁর কিছুই জানা নেই। তাহলে কোন এক্তিয়ারে সিইও অফিসের আধিকারিকরা এমনটা করলেন? কারণ, ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন এবং ১৯৬০ সালের ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টে এমন কোনো সংস্থান নেই—দাবি করছে আইনজীবী মহল। তবে কি ১৬ লক্ষ ভোটার বাদের চেষ্টা নিয়ে কমিশনের সুপ্রিম হলফনামাতেও কারচুপি রয়েছে? প্রবীণ আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের ইঙ্গিত কিন্তু তেমনই। তাঁর সাফ কথা, ‘কোনো ভাবেই এটা করা যায় না।’ মমতাপন্থী তৃণমূল সাংসদ তথা আরেক বর্ষীয়ান আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়েরও একই দাবি, ‘ভোট চুরি ধামাচাপা দিতে নানা কারচুপি করছে কমিশন।’
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বাংলায় ‘বিচারাধীন’ তালিকা খতিয়ে দেখার পর ৩২ লক্ষেরও বেশি ভোটারকে ‘ক্লিনচিট’ দিয়েছিলেন বিচারকরা। তার মধ্যে ১৬ লক্ষ নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। এপ্রসঙ্গে গত ২৬ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে কমিশন জানিয়েছে, এই তথ্য তাদের জানা ছিল না। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই সিইও দপ্তরের আধিকারিকরা ওই আপত্তি সংক্রান্ত আবেদন ট্রাইবুনালে জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই হলফনামায় ইচ্ছাকৃতভাবে সূক্ষ্ম ফাঁক রাখা হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এসআইআরে ভোটার তালিকা প্রস্তুতির দায়িত্বে ছিলেন এইআরও, ইআরও, ডিইও, অ্যাডিশনাল সিইও এবং সিইও। এর মধ্যে ঠিক কোন স্তরের আধিকারিক ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন, তা নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। পাশাপাশি, কোন আইনে এই কাজ করা হয়েছে তারও উল্লেখ নেই। আর সেখানেই কারসাজি রয়েছে বলে মনে করছে বর্ষীয়ান আইনজীবীরা। তাঁদের বক্তব্য, ২০২৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ট্রাইবুনাল গঠিত হয়েছিল। ফলে সেখানে আবেদন জানানোর ক্ষেত্রে ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন এবং ১৯৬০ সালের ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টে কোনো সংস্থান না থাকাই স্বাভাবিক। বিকাশবাবুর তাই প্রশ্ন, ‘কোন আইনে আর কোন স্বার্থে কমিশন এই আপত্তি সংক্রান্ত আবেদন জানাল? আসলে প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ, মহিলা ও বিশেষত মুসলিম জনগোষ্ঠীর মানুষকে টার্গেট করা হয়েছে। আর এখন তো এই কৃতকর্মের দায় এড়ানোর পালা চলছে। বিষয়টি নিয়ে অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন।’ ইতিমধ্যে সিইও অফিসে স্মারকলিপি জমা করে বিষয়টি নিয়ে আইটি অডিটের দাবি জানিয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস। কোন তারিখে কোন সময়ে এবং কোন পদ্ধতিতে এই আবেদনগুলি জানানো হয়েছিল, তা প্রকাশ্যে আনার সওয়াল জোরালো হচ্ছে। পাশাপাশি অবিলম্বে সমস্ত আপত্তি সংক্রান্ত আবেদন বাতিলেরও দাবি জানানো হয়েছে।



