অভিজিৎ চৌধুরী, সপ্তগ্রাম: সাবেক বাংলায় বন্দর শহর ছিল সপ্তগ্রাম। আজও সপ্তগ্রামের আনাচে-কানাচে রয়েছে মনসামঙ্গল কাব্যের প্রবাহ। চিরজাগ্রত হয়ে আছে নেতা ধোপানির ঘাট। একদা বেনে অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের বাস ছিল সপ্তগ্রাম, বাঁশবেড়িয়া, ত্রিবেণী, মহানাদ সহ বিস্তীর্ণ এলাকায়। ২০২৬ সালেও সপ্তগ্রাম বিধানসভার ভোট সমীকরণ অনেকটাই বাণিজ্য নির্ভর। কিছুটা বিজ্ঞানও। আর বাণিজ্য-বিজ্ঞানকে ভোটের বাক্সে সঠিকভাবে প্রয়োগ করার জন্য লাগে, কলা। বলা বাহুল্য, সেটাও কার্তিকপুজোর নগরীতে বহাল তবিয়তে আছে। ফলে, সপ্তগ্রাম বিধানসভা যেন কলা-বাণিজ্য-বিজ্ঞান মিলিয়ে ভোট রাজনীতির আস্ত মহাবিদ্যালয়। আর সেখানকার মেধাবী ছাত্রের নাম তৃণমূল কংগ্রেস। পরীক্ষার ফলাফল তাই বলে।
সপ্তগ্রামে বাণিজ্যিক সম্পর্ক মূলত, বাম এবং বিজেপির। সপ্তগ্রামে তৃণমূলের ভোটব্যাংক অটুট আছে। সেই ব্যাংকের ভল্টে প্রায় ৪৯ শতাংশ ভোট আছে। উল্লেখ্য, গত ষোলো বছরে নিরিখে এটাই সবচেয়ে কম। অর্থাৎ খরার বাজারেও সপ্তগ্রামে ভোটের ওই হার নিয়ে লড়তে নামে তৃণমূল। বাকি ৫১ শতাংশ ভোট বাম-কংগ্রেস এবং বিজেপির। বিজেপির নিজস্ব ভোট কত? না, হদিশ নেই। তবে বাম ও কংগ্রেসের ভোটের দিকে তাকালে সেই সংখ্যাটা ৪ শতাংশের বেশি হওয়া কঠিন। গত কয়েকটি নির্বাচনে ‘মহাজন’ বামেরা নিজস্ব ভোটের প্রায় সবটাই বিজেপিকে দিয়ে দিয়েছে। তারপরেও বিধানসভায় বিজেপির ভোট তৃণমূলকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। জনশ্রুতি, এবার ‘বাণিজ্যক চুক্তি’ খতম। মহাজন তার ভোট ফেরাতে প্রতিদিন তাগাদা করছে। বামপ্রার্থী অনির্বাণ সরকার দলের দাপুটে নেতা। পেশায় আইনজীবী, শ্রমিক রাজনীতিতে ধুরন্ধর। তিনি বলেন, তৃণমূলকে সরানোর ক্ষেত্রে বিজেপির কোনো সততা নেই। আমাদের সমর্থকদের তা বোঝাতে পেরেছি। তাঁরা বুঝেছেন। তাই এবার দলকে শক্তিশালী করার লড়াই। আমাদের ভোট, এবার আমাদেরই থাকবে। অনির্বাণের বাণী ফলে গেলে পদ্মপার্টি যে পাঁকেও জায়গা পাবে না, সেটা স্পষ্ট জানেন বিজেপির অন্ধ সমর্থকও। পদ্মপার্টির জেলা কমিটির সহ সভাপতি সুরেশ সাউ সদ্য তৃণমূলে এসেছেন। তিনি বলেন, সপ্তগ্রাম তৃণমূলের মজবুত ঘাঁটি। আমি বিজেপিতে থাকাকালীন দেখেছি, সপ্তগ্রামে হাওয়া আর বামেদের ভোটই ছিল ভরসা। বামেরা তাদের ভোটব্যাংক ফিরিয়ে নিলে বিজেপির কাঙাল দশা হবে। পদ্মপ্রার্থী স্বরাজ ঘোষ সবুজ ফতুয়া ছেড়ে বছর দু’য়েক হল গেরুয়া ধরেছেন। তাঁর জামাবদল নিয়ে অন্তহীন ক্ষোভ বিজেপির অন্দরে। ফলে, দাদন নেওয়া ভোট রক্ষা বা তৃণমূলের মজবুত ভোটব্যাংকে ভাঙন ধরানো কতটা সম্ভব তাঁর পক্ষে, সেব্যাপারে বিজেপি সন্দিহান। স্বরাজ বলছেন, অপশাসনের বিরুদ্ধে এবার বন্দরশহর সপ্তগ্রামে ভোট হবে। ধারের ভোট বা ভোটের ধারা, কিছুই প্রতিবন্ধক হবে না। তৃণমূলের প্রার্থী বিদেশ বসু খ্যাতনামা ফুটবলার ছিলেন। হাওড়ার উলুবেড়িয়া পূর্ব কেন্দ্র থেকে ২০২১ সালে বিধায়কও হয়েছিলেন। খেলার নিয়মকানুন ও কলা তাঁর জানা। আর জানেন মজবুত ভোটব্যাংকে বাড়িয়ে নেওয়ার বিজ্ঞান। ঝুলিতে সরকারি উন্নয়ন থেকে নাগরিকদের সমস্যা, সঙ্গে আছে নিজস্ব সহজ সরল ভাবমূর্তি। ফলে, সপ্তগ্রামের মাঠ-ময়দান-খলিয়ানের মন জিতে নিয়েছেন অনেকটাই। তিনি বলেন, মজবুত জনভিত্তি এবং সরকারি উন্নয়নের লম্বা তালিকা আছে। আর আছে মানুষের ভালোবাসা। তাই হবেই হবে জয়। সপ্তগ্রামের আধুনিক ভোটমঙ্গল কাব্যে আমনানের সম্পন্ন কৃষক কৃষ্ণ সাঁতরার কথাটা বলতেই হবে। এক সকালে মুচকি হাসি দিয়ে বলছিলেন, মনসামঙ্গলের কবি লখিন্দরকে বাঁচিয়ে তুলতেনই। কারণ, সে নায়ক। গল্পটা ফাঁপিয়ে তুলতে নেতা ধোপানির কথা এনেছিলেন। সপ্তগ্রামের ভোটমঙ্গলে লখিন্দর হল মমতার দল। বাকিরা নিজেদের মধ্যে একটু ‘বাঁচা-মরা’ খেলছে। সূর্যটা তখন ঠিক কৃষ্ণর মাথার উপরে। বাড়তি ছটা ছড়াতে শুরু করেছিল।