


অর্পণ সেনগুপ্ত, হরিপাল; কথিত আছে, পাল সাম্রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল হুগলির হরিপালের। সেখান থেকেই নাম হয়েছে হরিপাল। এক সময় তন্ত্র সাধনার পীঠস্থান ছিল এই এলাকা। হরিপাল রেল স্টেশনে নেমে আঁটপুরে গিয়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এই প্রাচীন জনপদই কৌতূহলের কেন্দ্রে। কারণ এবার এই কেন্দ্রের লড়াই শুধু তৃণমূল বনাম বিজেপি নয়। মন্ত্রী বেচারাম মান্নার এক সময়কার সেনাপতি শেখ মুজফফর আলির সঙ্গে তাঁর স্ত্রী করবী মান্নারও বটে। হরিপাল বিধানসভার অন্তর্গত নালিকুলে মুখ্যমন্ত্রীর সভা ছিল বুধবার। তারপর আরও বেশি করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে হরিপাল।
এলাকার মানুষের বক্তব্য, করবী মান্না দু’বারের বিধায়ক এবং একইসঙ্গে দক্ষ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক। তবে, সংগঠন এবং প্রশাসনিক কাজ পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন স্বামী বেচারাম মান্নাই। কৃষি বিপণন দপ্তরের মন্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি হুগলি জেলায় দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। ফলে সেই রাজনৈতিক ক্ষমতা, বিচারবুদ্ধি এবং পরামর্শের সুফল যে তাঁর স্ত্রী পাবেন, সেটা বলাই বাহুল্য। বেচারাম মান্না অবশ্য দু’বার এই কেন্দ্রেই বিধায়ক ছিলেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দল তাঁকে সিঙ্গুরে দাঁড় করায়। আর হরিপালে টিকিট দেয় তাঁর স্ত্রী করবী মান্নাকে। সেবার অবশ্য হরিপালে তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান কিছুটা কমে। তাও নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপির সমীরণ মিত্রকে তিনি ২৩ হাজারেরও বেশি ভোটে পিছনে ফেলেছিলেন। সিনেমাতলার মাঠে মমতার জনসভার পরে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, এই ব্যবধান আরও বাড়বে। জনসমাগম দেখে তাঁর আত্মবিশ্বাসী হওয়ারই কথা।
করবীদেবীর আশ্বাস, ক্ষমতায় এলে একটি গার্লস স্কুল করবেন। অলিপুর কাশীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে মেয়েদের জন্য আলাদা একটি স্কুলের প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়াও একটি আইটিআই কলেজ, হরিপাল বাসস্ট্যান্ড নতুন করে তৈরি এবং একটি দমকল কেন্দ্র স্থাপনও তাঁর পরিকল্পনায় রয়েছে। তবে আলুচাষিদের জন্য একটি বহুমুখী হিমঘর তৈরিকে তিনি অগ্রাধিকার দিতে চান। যে সব কাজ তাঁকে এগিয়ে রাখবে বলে তিনি মনে করছেন, তার মধ্যে রয়েছে কয়েকশো কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ, ডাকাতিয়া খাল সংস্কার এবং ২৯টি নতুন ব্রিজ তৈরি। এতে পরিবহণ গতি পেয়েছে। আরও মসৃণ হয়েছে জনজীবন। দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের গা ঘেঁষে যে মাঝারি শিল্পের জোয়ার এসেছে, তার সুফল পাচ্ছে হরিপালও। তারকেশ্বর-বৈদ্যবাটি রোডে বেশ কিছু কারখানা গড়ে ওঠায় সেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে। সার্বিকভাবে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। তাই বড়ো কোনো অসন্তোষ নেই তাঁদের মধ্যে। এমনই মনে করছেন শাসকদলের অনুগামীরা।
এদিকে, বেচারাম মান্না এবং করবী মান্না পাশাপাশি দু’টি কেন্দ্রে বিধায়ক হওয়ায় একে স্থানীয়ভাবে দাদা-বউদি রাজনীতি বলা হয়ে থাকে। এটাকে অনেকেই ভালোভাবে দেখেন না। ২০১৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনের সময় থেকে তৃণমূলের সংস্রব ত্যাগ করা শেখ মুজফফর আলিও এই অভিযোগ তুলে সোচ্চার হয়েছেন আগে। তবে, ফোনে তাঁকে কিছুটা সাবধানী শোনায়। তিনি বলেন, ‘জেতার জন্যই লড়াই করছি। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’ ভোটে না জিতলে আইএসএফ কি ভোট কেটে বিজেপির সুবিধা করে দেবে না? এই অভিযোগ উড়িয়ে তিনি দাবি করেন, আইএসএফ জিতেই শেষ করবে। তৃণমূল অবশ্য বলছে, মাজা (এলাকায় এ নামেই পরিচিত মুজফফর) তো আগে বিজেপিতে গিয়েছিল। তাই বিজেপিকে সুবিধা পাইয়ে দিতে আইএসএফে গিয়ে ভোট কাটতে তাঁর অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
এদিন হরিপাল বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত অথচ সিঙ্গুর ব্লকে পড়ে যাওয়া কেজিডি অর্থাৎ খাস গোপীনাথপুর দুর্গাপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে প্রচার করছিলেন বিজেপি প্রার্থী মধুমিতা ঘোষ। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ পরিবর্তন চেয়ে স্লোগান দিচ্ছেন। এতে ভর করেই বিজেপি ২৩ হাজারের ঘাটতি পুষিয়ে অনেকটাই এগিয়ে যাবে। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা বিভিন্ন ভাতার লোভ জয় করে সাধারণ মহিলারাও আমাদের পাশে রয়েছেন। জিতব, এটা নিশ্চিত। প্রথম কাজই হবে হরিপাল বাসস্ট্যান্ড পাকা করে তৈরি করা। এছাড়া জল, রাস্তা, হিমঘর তৈরি এসব কাজ করতেই হবে। বহু মানুষের ঘর বলতে প্লাস্টিকের ছাউনি বা ছিটে বেড়ার। আমার বিধানসভা কেন্দ্রে কাউকে আর এভাবে থাকতে হবে না। এটুকু প্রতিশ্রুতি দিতে পারি।’