কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: বিশ্বকর্মার মন্দির খুব একটা চোখে পড়ে না। দেবদেবীর মন্দিরে ভরা এই দেশে দুর্গা, কালী, শিব কিংবা কৃষ্ণের মন্দির যত সহজে খুঁজে পাওয়া যায়, শিল্পী-কারিগর-শ্রমজীবী মানুষের আরাধ্য দেবতা বিশ্বকর্মার জন্য আলাদা মন্দির ততটা দেখা যায় না। অথচ তিনি সেই দেবতা, যাঁর হাতে পুরাণের দেবলোকের প্রাসাদ, অস্ত্র, রথ আর নগর গড়ে উঠেছিল। অর্থাৎ তাঁর দৌলতেই বাসস্থান, বাহন, নিরাপত্তা পেয়েছিলেন দেবতারা। যদিও হাওড়া শহরে বিশ্বকর্মার একটি মন্দির আছে। সালকিয়ায় যেখানে দাঁড়িয়ে হাওড়া ব্রিজ দেখা যায়, সেখানে গঙ্গার খানিক দূরে বড়ো রাস্তার উপরই রয়েছে মন্দিরটি। গোলাবাড়ি থানার একটু দূরে।
হাওড়ার অনেক কিছু নিয়ে আমরা কথা বলি। রেল স্টেশনের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা হয়। শিল্প-স্থাপত্যের কথা বলি। কিন্তু যে মানুষগুলো সেগুলি তৈরি করেছেন, তাঁদের কথা কতবারই বা বলা হয়? হাওড়ার বিশ্বকর্মা মন্দির সেই কথার অদৃশ্য দরজাটাই যেয় খুলে।
মন্দির কর্তৃপক্ষের তরফে দিলীপ শর্মা জানান, সালকিয়ায় একটি কামারপাড়া আছে। বহু বছরের পুরনো। সেখানে রেলের চাবি ইত্যাদি যন্ত্রাংশ তৈরির কাজ করতে এসেছিলেন কিছু শ্রমিক। তাঁরা সেখানে বসবাস শুরু করেন এবং তাঁরাই তাঁদের প্রাণের দেবতাকে প্রতিষ্ঠা করেন মন্দিরে। মন্দিরের পুরোহিত বলেন, এই মন্দিরে গঙ্গা স্বয়ং আসেন। দেবতার সিংহাসনের নীচে একটি ছোট্ট কুঠুরির মতো অংশ আছে। তা দিনের নির্দিষ্ট সময় ভরে ওঠে গঙ্গার জলে। এটি দেব মাহাত্ম্য হিসাবেই মান্যি করেন ভক্তরা।
মন্দিরের উপরের অংশে দণ্ডায়মান বিশ্বকর্মা। তাঁর গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল। ঊধ্বার্ঙ্গ অনাবৃত। কোমর থেকে পা পর্যন্ত হলুদ ধুতি। মাথায় সোনালি মুকুট। মুখমণ্ডল শ্মশ্রুশোভিত। চার হাত। একহাতে মাপজোক করার স্কেল। অন্যহাতে ফিতে। আর এক হাতে কমণ্ডুল। শেষ হাতটি বরাভয় প্রদান করছে জীবজগতকে। পিছনে দাঁড়িয়ে নীল রঙের হাতি। রোজ পুজো হয় তাঁর। ফলফলাদি, মিষ্টি দিয়ে নিত্যপুজো। আর বিশ্বকর্মা পুজোয় মন্দিরে ভান্ডারা বসে। ভক্তরা পেটপুরে প্রসাদ খান।
কলকাতা বা হাওড়ার অন্য অনেক বিখ্যাত মন্দিরের মতো হয়ত এই মন্দিরের নাম প্রতিদিন শোনা যায় না। পর্যটন মানচিত্রে বিশেষ জায়গা নেই বিশ্বকর্মা মন্দিরের। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের মনে এর অবস্থান অনেক গভীরে। কারণ এই মন্দিরের দেবতা এমন একজন, যাঁর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক শ্রমের। তাই তাঁর প্রার্থনার মধ্যে জাঁকজমক কম। বরং জীবনযাপনের মূল ভিত তাঁর আরাধনার মধ্যে লুকিয়ে। যন্ত্র খারাপ হলে উৎপাদন বন্ধ হয়। কর্মহীন শ্রমিকের রান্নাঘরে আগুন জ্বলে না। কোনো শ্রমিকের হাত-পা আহত হলে সন্তানের পড়াশোনা অনিশ্চয় হয়ে পড়ে। বিশ্বকর্মা তাঁদের আরাাধ্য। তাঁর কাছেই তাঁদের প্রার্থনা, ‘হাতটা ঠিকঠাক রেখো ঠাকুর, ঠিকমতো যাতে কাজ করতে পারি।’ বা ‘ঠাকুর, কাজটা যেন থাকে।’ এই প্রার্থনার মধ্যে বিলাসিতা নেই। আছে পেটের চিন্তা। আছে সংসারের টান। আছে সন্তানের ভবিষ্যৎ। আছে জীবন টিকিয়ে রাখার লড়াই। হাওড়ার বিশ্বকর্মা মন্দির তাই একটি মন্দির শুধু নয়, যে হাত দিয়ে মানুষ পৃথিবীকে একটু একটু করে গড়ে নেয়, বিশ্বকর্মার সামনে সেই হাতই জোড় হয়। তখন মনে হয় বিশ্বকর্মা হয়তো আকাশে নন। লুকিয়ে থাকেন পরিশ্রমী মানুষের জমিতে। হাওড়া সেরকম জমিতেই তাঁর মন্দির তৈরি করেছে। নিজস্ব চিত্র