Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নতুন বিপদ লাদাখে হিংসা

২০১৯ সালের ৫ আগস্ট সংবিধানের ৩৭০ এবং ৩৫(ক) অনুচ্ছেদ বাতিল করা হয়। এরপর জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন আইনে রাজ্যটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে তৈরি হয় ‘জম্মু ও কাশ্মীর’ এবং ‘লাদাখ’ নামে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল।

নতুন বিপদ লাদাখে হিংসা
  • ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

২০১৯ সালের ৫ আগস্ট সংবিধানের ৩৭০ এবং ৩৫(ক) অনুচ্ছেদ বাতিল করা হয়। এরপর জম্মু ও কাশ্মীর পুনর্গঠন আইনে রাজ্যটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে তৈরি হয় ‘জম্মু ও কাশ্মীর’ এবং ‘লাদাখ’ নামে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। ঠিক হয় যে নবগঠিত কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জম্মু ও কাশ্মীর নিজস্ব বিধানসভা পাবে, কিন্তু লাদাখের জন্য তেমন কোনও সংসদীয় ব্যবস্থা থাকবে না। তবে উভয় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জন্য একজন করে লেফটেন্যান্ট গভর্নর আছেন। এর ফলে ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর রাজ্যের মর্যাদা হারিয়ে জম্মু ও কাশ্মীর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়, অন্যদিকে সাবেক জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের একটি বিভাগ থেকে লাদাখ উন্নীত হয় একটি স্বতন্ত্র কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে। লাদাখের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার লক্ষ্য নিয়েই অঞ্চলটিকে জম্মু ও কাশ্মীর থেকে পৃথক করা হয়েছিল বলে কেন্দ্রের দাবি। 

Advertisement

বলা বাহুল্য, জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের মর্যাদাহরণ এবং সেখানে পূর্ণ গণতন্ত্র ফেরানোর দাবিতে সংসদের ভিতরে ও বাইরে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। তুলনায় চাপা পড়েছিল লাদাখ ইস্যু। অথচ লাদাখ বিচ্ছিন্ন করার ফলে জম্মু ও কাশ্মীরের ৫৮.৩৫ শতাংশ ভূমিভাগ পৃথক হয়ে গিয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর থেকে লাদাখের বিচ্ছিন্নতা নিয়ে ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক এবং নৃতাত্ত্বিক বিতর্কের অবকাশ রয়েছে বলে মনে করেন পণ্ডিতদের একাংশ। লাদাখের ইতিহাস অতিপ্রাচীন এবং দীর্ঘ। তা নিয়ে আলোচনার পরিসর এটা নয়। লাদাখ একসময় তিনটি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত ছিল—লেহ, কারগিল এবং স্কার্দু। ১৯৪৭-৪৯ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় স্কার্দু অঞ্চলটি জবরদখল করে পাকিস্তান। ওই অঞ্চলটি বর্তমানে পাক মানচিত্রে গিলগিট-বালটিস্তান নামে চিহ্নিত। লাদাখের অবশিষ্টাংশ অঞ্চল ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের একটি ভিভিশন বা বিভাগ হিসেবে শাসিত হয়েছে। শতাধিক বছর যাবৎ জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অংশ ছিল লাদাখ। তবে অঞ্চলটি অর্থনৈতিকভাবে পার্শ্ববর্তী একাধিক অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ১৯৪৭ সালে ইংরেজের পতনের পর গিলগিট ও বালটিস্তান পাকিস্তানের অংশ হয় এবং চীন ১৯৫০ সালে তিব্বত দখল করে।
এই আকস্মিক বিচ্ছিন্নতার পরই শুরু হয় লাদাখের অর্থনৈতিক সমস্যা। জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য কোনও দিনই শান্তিতে ছিল না। পড়শি দেশের ছায়াযুদ্ধের কারণে সেখানে হিংসা, রক্তপাত লেগেই আছে। এছাড়া রয়েছে বৌদ্ধ এবং মুসলিমদের মধ্যে সৌহার্দের অভাব। সব মিলিয়ে লাগাতার ভুগতে হয়েছে, বিশেষ করে আর্থিক দিক থেকে, লাদাখকে। ১৯৯৩ সালে মুসলিম অধ্যুষিত কারগিল এবং বৌদ্ধপ্রধান লেহ অঞ্চলকে নিয়ে দুটি ‘স্বায়ত্তশাসিত পাহাড়ি উন্নয়ন পরিষদ’ গঠন করেও কাউকে সন্তুষ্ট করা যায়নি। অথচ লাদাখের উন্নয়নই ছিল এই পরিষদ গঠনের উদ্দেশ্য। তাই লাদাখি বৌদ্ধরা স্বায়ত্তশাসন ও পৃথক রাজ্যের দাবিতে সোচ্চার হন। জম্মু ও কাশ্মীর থেকে লাদাখকে পৃথক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তাঁদের দাবির প্রতি সহানুভূতি থেকেই। তবে পৃথক রাজ্যের মর্যাদা আদায়ের মতো অবশিষ্ট দাবিপূরণই এখন বৌদ্ধদের লক্ষ্য। বলা বাহুল্য, তাঁদের এই দাবির প্রতি স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর কোনও সমর্থন নেই, তাঁরা পূর্বতন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যেরই পুনর্বহাল চান। যাই হোক, এক অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতির মধ্যে নতুন করে অশান্ত হয়ে উঠেছে লাদাখ। আন্দোলনের নামে অবাঞ্ছিত হিংসা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সেখানে। অগ্নিগর্ভ লাদাখে ইতিমধ্যেই চারটি তাজা প্রাণ চলে গিয়েছে। জখমও হয়েছেন বহু মানুষ। সহায়-সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বিস্তর। এই ঘটনার দায় বর্তানো নিয়ে চলছে পারস্পরিক দোষারোপের পালা। সংবিধান মেনে এবং গণতন্ত্রের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখে লাদাখ পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা দরকার। সংকীর্ণ রাজনীতি যেন আর একটা মণিপুর উপহার না দেয় আমাদের। তাহলে দেশকে যে মাশুল গুনতে হবে তার পরিমাণ কিন্তু মণিপুরের চেয়ে অনেক বেশিই। কারণ বৈরীভাবাপন্ন একাধিক পড়শি দেশ সুযোগ নেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ