


কীভাবে যাবেন: নেতাজি সুভাষ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সরাসরি বিমান রয়েছে ভিয়েতনাম যাওয়ার জন্য। হ্যানয় অথবা হো চি মিন সিটি দুটো বিমানবন্দরেই আপনাকে এই সরাসরি বিমান পৌঁছে দেবে। এছাড়া কিছু কানেকটিং প্লেনও রয়েছে যা ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়া হয়ে ভিয়েতনাম পৌঁছয়।
ছোটোবেলায় ভূগোল বইতে পড়া সাইগন নদী, ভয়াবহ যুদ্ধ আর প্রাণান্তকারী চেষ্টার পর স্বাধীন একটা দেশ। এই নিয়েই ভিয়েতনাম। যে দেশের সঙ্গে যুক্ত এক দুর্জয় ব্যক্তিত্ব, দক্ষ সংগঠক, হো চি মিন। যাঁর নেতৃত্বের কাহিনি কালজয়ী। ওঁর নেতৃত্বেই আমেরিকার মতো শক্তিশালী দেশকে পরাজিত করেছিলেন ভিয়েতনামিরা। সেই ইতিহাস বিজড়িত মাটিতে পা রাখব, সাইগন নদী চোখের সামনে দেখব! এটা ভেবেই রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড়ানে হো চি মিন পৌঁছতে আমাদের সময় লাগল তিন ঘণ্টা, পঁয়তাল্লিশ মিনিট। সেখানে পা দিয়েই আমার মনে পড়ছিল ভিয়েতনামের যুদ্ধের সময়কার সেই বিশেষ স্লোগান ‘তোমার নাম আমার নাম, ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম’। ছয়-সাতের দশকে শুরু হওয়া এই স্লোগান যেন বিশ্বের মানুষের মনে আজও একেবারে গেঁথে রয়েছে। আর সেই যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু অতীতের সাইগন আর বর্তমানের হো চি মিন সিটি।
এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেখলাম হোটেল থেকে আসা ভিয়েতনামি এক যুবক আমাদের পরিবারের নাম লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমরা তাঁর সঙ্গে চললাম হোটেলে। রাস্তায় যেতে যেতেই লাল টুকটুকে উজ্জ্বল ঝকঝকে জাতীয় ও দলীয় পতাকার সারি চোখে পড়ল। শুনলাম ওঁরা নাকি নিয়মিত পতাকা বদলান। দেশের প্রতি কতটা সম্মান, শ্রদ্ধা, আবেগ ও দায়িত্ববোধ থাকলে এটা সম্ভব হয় তা বুঝলাম।
সাইগনের ইতিহাস কখনো ফরাসি আক্রমণ কখনো জাপানি আবার কখনো আমেরিকানদের কবলের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফরাসিদের হাত থেকে শহরটি কেড়ে নেয় জাপান। কিন্তু সে দখলও বেশিদিন টেকেনি। যুদ্ধের শেষে জাপান হেরে যেতেই ফরাসিরা আবার সাইগনের মালিকানা দাবি করে বসে। কিন্তু স্বাধীনতার স্বপ্ন তো আর দমন করা যায় না।
যুগে যুগে ইতিহাস তেমন কথাই বলে। ১৯৫৪ সালে প্রথম ইন্দো-চীন যুদ্ধের পর ভিয়েতনাম ফরাসিদের হাত থেকে মুক্তি পায়। জেনেভা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী দেশ দু’ভাগে ভাগ হয়। উত্তর অংশটির নেতৃত্ব কমিউনিস্ট শাসনে গেল। আর দক্ষিণ অংশটি আমেরিকার সমর্থন পাওয়া অ্যান্টি কমিউনিস্ট সরকার দ্বারা শাসিত হল। যদিও এই ব্যবস্থা খুবই অল্প সময়ের জন্য ছিল। এরপরই শুরু হয় ইতিহাসের এক ভয়ংকর অধ্যায় ভিয়েতনাম যুদ্ধ। বছরের পর বছর যুদ্ধের ধ্বংসলীলা চলল। রক্ত ঝরল, মানুষ ঘরছাড়া হল। শেষে ১৯৭৫ সালে উত্তর ভিয়েতনাম বিজয়ী হল। দেশ একত্রিত হল। অনেকবার নাম বদলের পর সাইগনের নতুন নাম হল হো চি মিন সিটি। স্বাধীনতার কান্ডারি রাষ্ট্রনায়ককে সম্মান জানাতেই এই নাম। হো চি মিন ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড় শহরই নয়, দেশের প্রাণকেন্দ্র, ব্যস্ত নগরী ও অর্থনীতির মূল কেন্দ্রও বটে।
ভিয়েতনাম পৌঁছে প্রথম দিনই আমরা ঠিক করলাম ইতিহাসে বিখ্যাত সেই কু চি টানেল দেখতে যাব। ওখানে পৌঁছে গাইড নিলাম। প্রবেশের সময় টিকিটের সঙ্গে গাইড চার্জ ধরা থাকে। বিদেশিদের গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক। আমাদের গাইডের নাম ছিল তিয়েন। ইংরেজি বোঝেন এবং বলেন।
তিয়েনের মুখেই জীবন্ত হয়ে উঠল যুদ্ধের ইতিহাস। শহরের বাইরে অবস্থিত এই টানেল যেন ভিয়েতনাম যুদ্ধের এক জীবন্ত দলিল। তিয়েন বললেন, ১৫০ কিমি-র বেশি দীর্ঘ এই ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের ভেতরে মানুষ বসবাস করেছে, গোলাবারুদ মজুত করেছে, হাসপাতাল চালিয়েছে দিনের পর দিন। বছরের পর বছর ভিয়েত কং সৈনিকরা মাটির নীচে লুকিয়ে থেকে মার্কিন সেনাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালাত।
টানেলের কিছু অংশ এখন পর্যটকদের জন্য খোলা। এর ভিতরে ঢুকে মনে হচ্ছিল আমি যেন অতীত ইতিহাসকে ছুঁয়ে আছি। টানেলে ঢুকে গেরিলা যুদ্ধের নানা কলাকৌশল দেখে হোটেলে ফিরলাম। লাঞ্চের পরেই আমাদের গন্তব্য ওয়ার রেমান্টস মিউজিয়াম। এই মিউজিয়াম ভিয়েতনামের ঐতিহাসিক পর্যটনের জায়গাগুলোর অন্যতম। এখানে প্রবেশের জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের ৪০ হাজার ভিএনডি অর্থাৎ ভিয়েতনামি ডং লাগে। ভিয়েতনামে টাকাকে ডং বলে। ভারতীয় মুদ্রায় ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা। তবে ছ’বছরের নীচে শিশুদের প্রবেশ ফ্রি। সকাল সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত খোলা থাকে। আমাদের এক টাকা ওদের দুশো আশি ডং। তাই ডংয়ের হিসেবে সব কিছুর দামই হাজারের অঙ্কে!
ভিয়েতনাম যুদ্ধের নৃশংসতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী কী হয়েছিল সেই প্রদর্শনের জন্যই এই মিউজিয়াম রয়েছে। দেখেছি ভিয়েতনাম যুদ্ধে ব্যবহার করা বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম। মার্কিন বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার এবং অবিস্ফোরিত বিশাল বোমা।
রাজনৈতিক বন্দিদের উপর চালানো নৃশংস নির্যাতনের স্মৃতি হিসেবে দক্ষিণ ভিয়েতনামের কুখ্যাত জেলখানার প্রতিকৃতিও দেখলাম যার নাম টাইগার কেজ। আরেকটা জিনিস জানলাম, এজেন্ট অরেঞ্জ প্রদর্শনী। রাসায়নিক যুদ্ধ এজেন্ট অরেঞ্জ-এর ব্যবহারের ফলে ভিয়েতনামে পরিবেশ ও মানুষের উপর যে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছিল তার হৃদয়বিদারক আলোকচিত্র এখানে প্রদর্শিত হয়। ভিয়েতনামি জনগণের মর্মান্তিক অতীতের এক ঝলক দেখে মনে হচ্ছিল স্বাধীনতা বড় সহজ বস্তু নয়। সব দেশের ক্ষেত্রেই কত শত মানুষের যে কত আত্মনিদান আর রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম থাকে তা জানলে শিউরে উঠতে হয়! যুদ্ধ বিদ্রোহের ভয়াবহ স্মৃতি আর ভারাক্রান্ত মনকে ঠিক করে নিতে পরের দিন আমাদের গন্তব্যে রয়েছে সাইগন সেন্ট্রাল পোস্ট অফিস। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সবথেকে প্রাচীন এবং সচল ডাকঘর হল সাইগন সেন্ট্রাল পোস্ট অফিস।
কোনো পোস্ট অফিস যে জীবন্ত ইতিহাসের অংশ হয়েও এইরকম দৃষ্টিনন্দন ও সাজানো গোছানো হতে পারে সেটা না দেখলে বিশ্বাসই হত না।
উঁচু গম্বুজ, গথিক জানলা আর রেনেসাঁর মিশ্রণে সাদা, সবুজ আর হালকা হলুদ রঙের কেন্দ্রীয় ডাকঘরটি দেখে প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ হলাম। অপূর্ব তার সৌন্দর্য। ফরাসি ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলীর একটি অন্যতম নিদর্শন এই ডাকঘর। দেখলাম প্রবেশপথের উপরে একটা বড়ো ঘড়ি আর সামনে বিখ্যাত ফরাসি আবিষ্কারকদের নাম খোদাই করা আছে। ভিতরে ঢুকে উঁচু ছাদের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সেখানে অদ্ভুত লোহার কারুকাজ করা হয়েছে। এমনভাবে নকশা করা যাতে যে কোনো পর্যটকই মুগ্ধ হয়ে যাবে।
অনেক পর্যটককে দেখলাম পোস্ট কার্ড কিনে বন্ধু বা আত্মীয়দের ডাকঘর থেকে চিঠি পাঠিয়ে দিচ্ছেন। প্রাচীনতম পোস্ট অফিস থেকে চিঠি লেখার রোমাঞ্চই আলাদা।
ডাকঘরের প্রশস্থ হলের শেষ প্রান্তে হো চি মিনের ছবি দেখলাম। ইচ্ছে হলে ছোট্ট একটি নোট লিখে তাতে ডাকটিকিট লাগিয়ে ওখানকার বাক্সে ফেলে দেওয়া যায়। দাম সাধারণত কুড়ি হাজার থেকে চল্লিশ হাজার ভিয়েতনামি ডং। আবার সেই হাজারের গপ্প! তবে এখানে আন্তর্জাতিক ডাকখরচ আশ্চর্যজনক ভাবে বেশ কম।
পাশেই রয়েছে পুরনো দিনের ফোন বুথ। তারপর সারি সারি স্যুভেনিয়রের দোকান, যেখানে ছবি, চাবির রিং, দেশের নাম লেখা ম্যাগনেট, ডাক
টিকিট, ব্যাগ, টি-শার্ট, পুতুল, চকোলেট, লজেন্স পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু কোনো হাঁকাহাঁকি ডাকাডাকি নেই বিক্রেতাদের। সবকিছুই বেশ সুন্দর সাজানো, সুচারু। এখানে প্রবেশ কিন্তু বিনামূল্যে।
এর পাশেই রয়েছে নটর-ডেম ক্যাথিড্রাল চার্চ। ১৮৮০ সালে ফরাসিরা লাল ইট, টাইলস আর স্টেইন্ড গ্লাস আমদানি করে এনেছিল ফ্রান্স থেকে। ইউরোপের গথিক স্থাপত্যের রাজকীয় এক নমুনা এই চার্চ।
এরপর হাঁটা পথেই হো চি মিন সিটি বুক স্ট্রিট। শহুরে ব্যস্ততার পাশাপাশি আশ্চর্য শান্ত নিরিবিলি আর সবুজ গাছগাছালিতে ভরা এক মনোরম জায়গা। বই দেখা, কেনা এবং পড়ার জন্য বইপ্রেমীদের একেবারে স্বর্গ রাজ্য।
পরেরদিন সকাল-সকাল পরিবারের খুদেটিকে সঙ্গে নিয়ে আমরা চললাম সাইগন জু অ্যান্ড বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখতে। প্রকৃতিপ্রেমী ও বন্যপ্রাণী যাঁরা ভালোবাসেন তাঁদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য এই চিড়িয়াখানা।
গোলাপি ফ্লেমিঙ্গো আর কালো এশিয়ান ভল্লুক এখানকার বিশেষ আকর্ষণ। উন্মুক্ত চিড়িয়াখানায় ঢুকতেই দেখলাম আমাদের পায়ের কাছে দিয়ে ময়ূর হেঁটে বেড়াচ্ছে। এবং কখনো কখনো সে তার পেখম মেলে নাচও দেখাচ্ছে। অভূতপূর্ব এই দৃশ্য দেখে আমরা ভীষণ খুশি। এছাড়া কাচের দেওয়াল দেওয়া খাঁচায় রাজকীয় ভঙ্গিমায় ঘুরে বেড়াচ্ছে সাদা বাঘ। দু’পা অন্তর বসার জায়গা, খাবারের স্টল, বাচ্চাদের খেলনার দোকান ইত্যাদি। পায়ে ব্যথা থাকলে গাড়িও রয়েছে ঘুরে দেখানোর জন্য।
একটা কথা না বললেই নয়, এই শহরের প্রত্যেকটি দ্রষ্টব্য কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন কাহিনি বা ইতিহাস পুষ্ট। রাস্তার ধারে কত রকমের খাবার! কফিতে কত রকম বিশেষত্ব। এগ কফি। (ডিমের কুসুম আর কনডেন্স মিল্ক দিয়ে তৈরি), ফ্রুটি কফি (ফলের রসের কফি), কনডেন্স মিল্ক আর বরফ সহ আইসড্ কফি ইত্যাদি খুবই বিখ্যাত ওখানে। ভিয়েতনামি কফি কালচার বিশ্ববিখ্যাত। সেই নিদর্শন প্রতি পদে পাবেন। এছাড়া ফো, বান মি, কম তাম, স্ট্রিট ফুডের খাবার হিসেবে খুবই জনপ্রিয়।
মোটর বাইকে ভরা রাস্তা, সুস্বাদু স্ট্রিট ফুড ভিয়েতনামি, চীনে ও ফরাসি সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা সমৃদ্ধ ইতিহাস, হো চি মিন সিটিকে সবার থেকে আলাদা করেছে। সফর শেষে অন্য ধরনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরলাম।
তনুশ্রী কাঞ্জিলাল মাশ্চরক