তাপস ঘোষ, বহরমপুর: বেলডাঙা-১ ব্লকের চৈতন্যপুরের ডাকাত কালীর পুজোয় একাধিক ছাগ বলি দেওয়া হলেও মায়ের পুজোয় নিরামিষ ভোগ নিবেদন করা হয়। নিরামিষ ভোগে রকমারি ফল, লুচি, মিষ্টান্ন, পরমান্ন নিবেদন করা হয়। পুজোয় যিনি পৌরহিত্য করেন তাঁকে নির্জলা উপবাসে থাকতে হয়। চৈতন্যপুরে ডাকাত কালী প্রায় ৩০৮ বছরের প্রাচীন। মুসলিম সম্প্রদায় খাঁ পরিবার ও বাগদী সম্প্রদায় হাজরা পরিবার মিলিতভাবে এই কালীর সাধনা করেই ডাকাতির উদ্দেশে রওনা দিত। জনশ্রুতি রয়েছে, মায়ের আশীর্বাদে ডাকাতদলের কেউ কোনোদিন ধরা পড়েনি। বিপদে পড়লে মা বিভিন্ন রুপে তাদের উদ্ধার করত। স্থানীয়দের বক্তব্য, একশো বছর আগেও গ্রামের এক প্রান্তে মুলোপুকুড়ের পাড়ে জঙ্গলে ঘেরা স্থানে প্রতিষ্ঠিত বেদিতেই কালীর পুজো হতো। গ্রামের জমিদাররা জায়গা দেওয়ায় হাজরা পাড়ার মন্দিরে দেবীকে পুনপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। অমাবস্যায় রাত বারোটায় পুজো শুরু হয়। চলে ভোর রাত পর্যন্ত। স্থানীয় বাসিন্দা অমিত সিংহ রায় বলেন, বহুভাবে দেবী মাহাত্ম্য প্রমাণিত হয়েছে এবং তা গ্রামে গ্রামে ছড়িয়েছে। হাজার হাজার মানুষ এখানে আশা পূরণের জন্য মানসিক করে দেবীর আশীর্বাদ পেয়েছেন। ভাদুড় গ্রামের বাসিন্দা ইন্দ্রজিৎ মণ্ডলের মামার বাড়ি এই গ্রামে। ইন্দ্রজিৎবাবু বলেন, মায়ের কাছে শুনেছি, আমার যখন তিনদিন বয়স তখন খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ি। চিকিৎসকরা বাঁচার আশা প্রায় নেই বলে দিয়েছিলেন। মা ডাকাত কালীর কাছে মানসিক করায় আমি সুস্থ হয়ে উঠি। মা প্রতিবছর ডাকাত কালীর পুজো দেন। চৈতন্যপুরে ৮০ শতাংশ মুসলিম পরিবারের বাস। ডাকাত কালী যেহেতু খাঁ পরিবারের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত তাই মুসলিম সম্প্রদায় এই পুজোর সঙ্গে একাত্মভাবে জড়িয়ে রয়েছে। প্রতিমার বিসর্জনের আগে খাঁ পরিবারের উঠানে প্রতিমা নামানো হতো। এখন রাস্তা সংকীর্ণ হওয়ায় ১৫ ফুট উচ্চতার প্রতিমার শোভাযাত্রার পথ ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে খাঁ ও হাজরা পরিবারের নামেই এখনও সংকল্প করা হয়।
পৈতৃক সূত্রে পুজো কমিটির সম্পাদক রয়েছেন নাড়ু হাজরা। নাড়ুবাবু বলেন, পুজোর পরদিন সকালেই শোভাযাত্রা করে প্রতিমা নিরঞ্জন করা হতো। বছর কয়েক ধরে গ্রামবাসীরা সাহায্য করায় পুজোর আড়ম্বর বেড়েছে। গ্রামবাসীদের আবদারে আমি মায়ের কাছে তিনদিন প্রতিমা রাখার অনুমতি চেয়ে নিয়েছি। পুজোয় ভুল ত্রুটি হলে মায়ের কোপ পড়তে পারে এই আশঙ্কায় ডাকাত কালীর পুজো করতে এলাকার বহু ব্রাহ্মণ সাহস করেননা। পুজোর আগের দিন থেকে নির্জলা উপবাস থেকেই পুজোয় বসতে হয়। ওই গ্রামের বাসিন্দা হেমন্ত সিংহ রায় বলেন, যে ব্রাহ্মণ পুজো করতেন একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পুজোর দিন উপবাস থাকা কোনো ব্রাহ্মণের খোঁজ মিলছিল না। অবশেষে ঘোড়ামারা গ্রামে এক ব্রাহ্মণের দেখা মেলে। জগন্নাথ বন্দ্যোপাধ্যায় নামে ওই ব্রাহ্মণ স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে দু›দিন অভুক্ত ছিলেন। সেবছর থেকে জগন্নাথ বন্দ্যোপাধ্যায় একটানা পুজো করছেন। এটাও মায়ের কৃপা। প্রতিমার ডাকের সাজ আসে কলকাতা থেকে।



