Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বেদ

শ্রীমন্মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য দ্বাপরে পার্থসারথি শ্রীকৃষ্ণচন্দ্ররূপে গীতায় তাঁহার স্বরূপের একটী পরিচয় দিয়াছেন। তিনি কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ বেদব্যাসরূপে বেদান্তশাস্ত্র বা ব্রহ্মসূত্রের রচয়িতা এবং বেদের তাৎপর্য একমাত্র তিনিই জানেন।

বেদ
  • ২৭ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

“বেদৈশ্চ সর্বৈরহমেব বেদ্যো বেদান্তকৃৎ বেদবিদেব চাহম্‌”

Advertisement

শ্রীমন্মহাপ্রভু শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য দ্বাপরে পার্থসারথি শ্রীকৃষ্ণচন্দ্ররূপে গীতায় তাঁহার স্বরূপের একটী পরিচয় দিয়াছেন। তিনি কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ বেদব্যাসরূপে বেদান্তশাস্ত্র বা ব্রহ্মসূত্রের রচয়িতা এবং বেদের তাৎপর্য একমাত্র তিনিই জানেন। আমাদের সনাতন ধর্মের জ্ঞানবিজ্ঞানের ভাণ্ডার এবং আর্য-সভ্যতার মূল তিনটী প্রস্থান। শ্রুতিপ্রস্থান অর্থাৎ উপনিষৎসমূহ, ন্যায় প্রস্থান অর্থাৎ বেদান্তদর্শন এবং স্মৃতি প্রস্থান অর্থাৎ শ্রীমদ্‌ভগবদগীতা—এই তিনটী প্রস্থান রাত্রির নিবিড় অন্ধকারে আলোকস্তম্ভের ন্যায় সংসার-সমুদ্রে ভাসমান মনুষ্যের উদ্ধার-লাভের পথ নির্দেশ করে। বেদের প্রথম কাণ্ডটী কর্মকাণ্ড ও অন্তকাণ্ডটী জ্ঞানকাণ্ড বা উপনিষদ। সমস্ত উপনিষদের, শ্রুতিসমূহের বিচারগ্রন্থই বেদান্তসূত্র বা বেদান্তদর্শন। সমস্ত উপনিষদের সারনির্যাস গীতা। বেদের কর্মকাণ্ডের বা জ্ঞানকাণ্ডের যথার্থ তাৎপর্য কি ইহা একমাত্র পরমেশ্বরই জানেন। কারণ বেদসমূহ তাঁহার নিঃশ্বাসতুল্য, তাঁহা হইতেই প্রকাশিত এবং তিনিই ব্রহ্মযোনি ও শাস্ত্রযোনি। তাঁহার কৃপাতেই ঋষিদের হৃদয়ে বেদ প্রতিভাত হইয়া থাকে। বেদের মন্ত্রসমূহ অস্পষ্টার্থ এবং পরোক্ষবাদে আবৃত তাই তিনি গীতাশাস্ত্রে বেদার্থ স্পষ্ট ভাষায় বিবৃত করিয়াছেন এবং শ্রীমদ্ভাগবতও বেদবৃক্ষের সুমধুর ফল ও বেদার্থের সরল বিবৃতি। শ্রীপাদ রামানুজ, শ্রীপাদ নিম্বার্ক, শ্রীপাদ মধ্ব ও শ্রীপাদ বিষ্ণুস্বামী এই চারজন প্রখ্যাত আচার্য যথাক্রমে, শ্রী, চতুঃসন, ব্রহ্মা ও রুদ্রের সম্প্রদায় মধ্যে পরম বৈষ্ণব। এই চারটী সম্প্রদায়েরই আদি প্রবর্তকরূপে শ্রীনারায়ণ বিরাজিত। এমন কি নির্বিশেষ অদ্বৈতবাদের বিখ্যাত আচার্য শ্রীশঙ্করের গুরুপরম্পরার শীর্ষ দেশেও শ্রীনারায়ণ অবস্থিত। অতএব পরাবিদ্যা বা ব্রহ্মবিদ্যা ও ভাগবতধর্মের আদি প্রবর্তক শ্রীভগবান। তিনি জীবোদ্ধারের জন্য করুণা করিয়া এই পরমধর্ম রাজবিদ্যা রাজগুহ্য প্রচার করেন। এই কথা আমরা তাঁহার নিজের শ্রীমুখের উক্তি হইতেও জানিতে পারি “ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবানহমব্যয়ম্‌” ইত্যাদি গীতা।
উপনিষদের শ্রুতিসমূহের বিচারের জন্য যে মীমাংসাগ্রন্থ তাহাই ব্রহ্মমীমাংসা বা বেদান্তদর্শন। ইহা সর্বদর্শন শিরোমণি এবং ‘বিশাল বুদ্ধি’ শ্রীবেদব্যাসের প্রসার মনীষার শ্রেষ্ঠ ফল। ভারতবর্ষের প্রত্যেক আচার্য এই বেদান্তদর্শনের ভাষ্য প্রণয়ন করিয়া অমর হইয়া আছেন। এই দর্শন অপৌরুষেয় বেদের উপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ইহার প্রতিপাদ্য বিষয়সমূহ সত্য, কল্পিত নহে। ইহার সিদ্ধান্তসমূহ যুক্তিসিদ্ধ এবং ইহাতে জীবের পরম পুরুষার্থ নির্দ্ধারিত হইয়াছে। বৌদ্ধ, জৈন, সাংখ্য, পাতঞ্জল যোগ, ন্যায়, বৈশেষিক ও মীমাংসা দর্শনের বেদবিরুদ্ধ সিদ্ধান্তসমূহের খণ্ডন এবং আরও অনেক অপূর্ব বৈশিষ্ট্যের জন্য বেদান্তদর্শন সর্বদর্শন শ্রেষ্ঠ হওয়ায় বিশ্ববিখ্যাত।
বেদান্তদর্শনের ভাষ্যকার আচার্যবৃন্দের মধ্যে শ্রীশঙ্করের ভাষ্যে নির্বিশেষ ব্রহ্মবাদ। বৌদ্ধমতে ও শঙ্কর মতে কেবল পার্থক্য শূন্যে ও নির্বিশেষ ব্রহ্মে। শঙ্করের ব্রহ্ম ও জীব অভিন্ন, ব্রহ্ম নির্গুণ, নিঃশক্তিক, নিরবয়ব, জ্ঞানস্বরূপ, জ্ঞাতা নহেন, রসস্বরূপ, রসিক নহেন, আনন্দস্বরূপ, আনন্দময় নহেন, মায়ার যোগে সগুণ হইয়া জগৎকর্তাদি হয়েন।
পণ্ডিতপ্রবর জ্যোতির্ময় নন্দের ‘মহাদাতা মহাপ্রভু’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ