নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: সোনা-রুপোর ঝলকানি, নতুন বাসন কেনার উন্মাদনা আর ঘরে ঘরে প্রদীপ জ্বালানোর প্রস্তুতি। দীপাবলির আগে বাজারজুড়ে উৎসবের আবহ তৈরি করে ধনতেরাস। তবে এই উৎসব কি শুধুই ধনসম্পদ কেনার শুভ দিন? নাকি এর পিছনে লুকিয়ে রয়েছে স্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং মৃত্যুকে জয় করার কোনো প্রাচীন আখ্যান? আসলে ধনতেরাসের ইতিহাস ও মাহাত্ম্য জুড়ে রয়েছে এমন দুই পৌরাণিক কাহিনি, যার সঙ্গে আজও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের বিশ্বাস।
কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে পালিত হয় ধনতেরাস। ‘ধন’ এবং ‘তেরাস’-এই দুই শব্দের মিলনেই উৎসবের নামকরণ। ধন অর্থ সম্পদ, আর তেরাস হল চন্দ্রপক্ষের ত্রয়োদশী। তবে এই তিথির সঙ্গে সম্পদের পাশাপাশি জড়িয়ে রয়েছে সুস্বাস্থ্যের আরাধনাও। আর সেই সূত্রেই সামনে আসে ধন্বন্তরী দেবের কাহিনি।
পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, অমৃত লাভের আশায় একসময় দেবতা ও অসুররা সমুদ্র মন্থনে মেতেছিলেন। সেই মন্থন থেকে উঠে এসেছিল নানা মূল্যবান রত্ন ও ঐশ্বরিক সম্পদ। একসময় সমুদ্রের গভীর থেকে আবির্ভূত হন ধন্বন্তরী দেব। তাঁর হাতে ছিল অমৃতপূর্ণ কলস। চিকিৎসাশাস্ত্রের দেবতা এবং আয়ুর্বেদের আদি প্রবর্তক হিসেবে তাঁকে মান্য করা হয়। বিশ্বাস, ধনতেরাসের তিথিতেই ঘটেছিল তাঁর আবির্ভাব। সেই কারণে এই দিনে ধন্বন্তরীর পুজো করে সুস্বাস্থ্য, রোগমুক্তি ও দীর্ঘ জীবনের প্রার্থনা করেন মানুষ। অর্থাৎ সম্পদের উৎসবের অন্তরালে রয়েছে শরীরকে সুস্থ রাখার প্রাচীন বার্তাও। ধনতেরাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দ্বিতীয় কাহিনিটি আরও নাটকীয়। এখানে সম্পদ নয়, বরং মুখ্য হয়ে উঠেছে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই। লোককথা অনুযায়ী, রাজা হেমের পুত্রের জন্মের সময়ই জ্যোতিষীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, বিবাহের চতুর্থ দিন সাপের কামড়ে মৃত্যু হবে তাঁর। সেই আশঙ্কার কথা জানতে পেরে রাজপুত্রের স্ত্রী স্বামীকে বাঁচাতে অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন। নির্দিষ্ট রাতে রাজপুত্রের ঘরের দরজায় জড়ো করা হয় সোনা, রুপো ও নানা মূল্যবান ধাতব সামগ্রী নিয়ে। ঘরের চারপাশে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় অসংখ্য প্রদীপ। স্বামী যাতে ঘুমিয়ে না পড়েন, সে জন্য সারারাত গান গেয়ে তাঁকে জাগিয়ে রাখেন নববধূ। কথিত আছে, নির্ধারিত সময়ে যমরাজ সাপের রূপ ধরে রাজপুত্রের প্রাণ নিতে হাজির হন। কিন্তু প্রদীপের তীব্র আলো এবং সোনা-রুপোর ঝলকানিতে তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে যায়। ঘরে প্রবেশ করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত ফিরে যান তিনি। এভাবেই মৃত্যুর মুখ থেকে রক্ষা পান রাজপুত্র। এই উপাখ্যান থেকেই ধনতেরাসের রাতে প্রদীপ জ্বালিয়ে অশুভ শক্তি ও অকালমৃত্যুকে দূরে রাখার বিশ্বাসের প্রচলন হয়েছে বলে মনে করা হয়। পৌরাণিক কাহিনির গণ্ডি ছাড়িয়ে বর্তমানে ধনতেরাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনীতিরও এক বড় অধ্যায়। এই দিনটিকে ঘিরে সোনা-রুপোর গয়না, কয়েন, বাসনপত্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধাতব সামগ্রী কেনার প্রবণতা রয়েছে। অনেকেই নতুন কিছু কিনে ঘরে সমৃদ্ধির আগমন ঘটবে বলে বিশ্বাস করেন। দোকানঁ-বাজারে বাড়ে ক্রেতাদের আনাগোনা। ব্যবসায়ীরাও নতুন হিসাবের খাতা খুলে লক্ষ্মী ও কুবেরের পুজোর মাধ্যমে আগামী দিনের মঙ্গল কামনা করেন।



