Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বন্দে মাতরম্ গান নয়, দেশপ্রেমের বীজমন্ত্র

বন্দে মাতরম্। দু’টিমাত্র শব্দের মধ্যে মিশে অনেক আবেগ। শুধু আবেগ নয়, একইসঙ্গে দেশপ্রেম, দেশমাতৃকার প্রতি ভক্তি। জাতীয় গীতের পাশাপাশি ভারতের যে কোনও প্রান্তে যে কোনও রাষ্ট্রপ্রেমী মানুষের কাছে জনপ্রিয়তম জয়ধ্বনিও। কিন্তু আসলে তা মন্ত্র। দেশপ্রেমের মন্ত্র। যদিও জন্মলগ্ন থেকে বন্দে মাতরম্ হয়ে ওঠে প্রতিবাদের স্বর, প্রতিরোধের স্লোগান।

বন্দে মাতরম্ গান নয়, দেশপ্রেমের বীজমন্ত্র
  • ১৫ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুকান্ত মজুমদার: বন্দে মাতরম্। দু’টিমাত্র শব্দের মধ্যে মিশে অনেক আবেগ। শুধু আবেগ নয়, একইসঙ্গে দেশপ্রেম, দেশমাতৃকার প্রতি ভক্তি। জাতীয় গীতের পাশাপাশি ভারতের যে কোনও প্রান্তে যে কোনও রাষ্ট্রপ্রেমী মানুষের কাছে জনপ্রিয়তম জয়ধ্বনিও। কিন্তু আসলে তা মন্ত্র। দেশপ্রেমের মন্ত্র। যদিও জন্মলগ্ন থেকে বন্দে মাতরম্ হয়ে ওঠে প্রতিবাদের স্বর, প্রতিরোধের স্লোগান।

Advertisement

আমাদের একটু উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে যেতে হবে। মনে করতে হবে মহাবিদ্রোহের পরের ভারতের রাজনৈতিক অবস্থা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে রানির হাতে গেল ক্ষমতা। দেশকে ঘিরে ভারতীয়দের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আবেগ তখন ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। বাংলায় এবং গোটা ভারতেই— মুসলমান সমাজ অবশ্য সেই আলোর বৃত্তে নেই। এই সত্য তাঁদের মনে রাখতে হবে আজও যাঁরা বন্দে মাতরম্ ধ্বনির মধ্যে বৈষম্য দেখতে চান। 
ভারতীয় আদর্শে বরাবরই ধর্ম ও সমাজ ভাবনায় কোনও দূরত্ব ছিল না। সনাতন হিন্দু কল্পনায় তো দেশকে মাতৃতুল্য মানা হয়। শুধু দেশ নয়, বসুন্ধরা পৃথিবীকেও তাই। সেই কারণেই ভারতীয় পরম্পরায় ভূমি প্রণাম অবশ্য কর্তব্য। ফলে ইংরেজ ক্ষমতা দখলের সেই সময়ে দেশমাতার কল্পনাকে সংস্কৃত ও বাংলা শব্দের মিশেলে আশ্চর্য এক মন্ত্রের জন্ম দিচ্ছেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সেটা ১৮৭৫ সাল। এর সাত বছর পরে ১৮৮২ ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে গানটি সংযুক্ত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সৃষ্ট চরিত্র কমলাকান্ত জন্মভূমিকে দেবী রূপে কল্পনা করেছে। উপন্যাসে সন্তানদলের কর্মীরা আবেগ ভরা গলায় গাইছেন বন্দে মাতরম্। এ গানে তাঁদের উদ্দীপনা জাগ্রত হত। স্বাধীন ভারতে দেশমাতা যেমনটা ছিলেন, সেই সমৃদ্ধির কথা স্মরণ করে বর্তমানের রিক্ত, পরাধীন মায়ের জন্য ক্রন্দন ছিল সেই গাওয়ায়। তখন থেকেই গান থেকে মন্ত্রে উত্তরিত হল বন্দে মাতরম্।
গান ও মন্ত্রে অনেক ফারাক। গান হল— শব্দ, সুর, তাল, লয়ের মিলনে এক ছন্দবদ্ধ রচনা, যা গায়ক ও শ্রোতার মনে আনন্দ আনে। হৃদয়ে আবেগ আনে। কিন্তু মন্ত্র তা নয়। নিরুক্তকার যাস্ক নিরুক্তের ৭/১২ তে বলেছেন, ‘মন্ত্র মননাৎ’ অর্থাৎ মননে মন্ত্র হয়। এখানে মনন শব্দের অর্থ— সৃষ্টি। কোনও বাক্য, পদ বা পদ্য যখন ঋষিদের মনে সৃষ্টি হয় তখন তা মন্ত্র। তাই তো বন্দে মাতরম্‌-এর উদ্গাতা বঙ্কিমচন্দ্রকে আমরা ঋষি বলি। 
এই মন্ত্রের মধ্যে যাঁরা হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব দেখেন তাঁরা ভুল নন। তবে ভ্রান্তি রয়েছে। হিন্দু অর্থে তাঁরা ধর্মের কথা ভাবেন। কিন্তু হিন্দুত্ব এক সংস্কৃতি, ভারতীয়দের জাতি পরিচয়। সেই ভাবনায় ভারতকে মা বলে যাঁরা সম্বোধন করেন তাঁদের উপাসনা পদ্ধতি যাই হোক না কেন তাঁরা হিন্দু পদবাচ্য। এটা মানতে পারলেই আর কোনও গোল থাকে না। আর ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মূলে জাতীয়তাবাদের যে তাত্ত্বিক ভিত্তি তা সম্পূর্ণভাবেই হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাবে পুষ্ট ছিল। ‘দেশ’কে মায়ের আসনে বসিয়ে স্বাধীনতা-যুদ্ধ হয়ে উঠেছিল এই দেবী ভারতমাতার সেবা, যার মূল মন্ত্রটি ছিল বন্দে মাতরম্।
কিন্তু পরবর্তী কালে কংগ্রেস-সহ কিছু রাজনৈতিক শক্তি হিন্দুত্বকে ধর্ম বলে দাগিয়ে হিন্দু-মুসলমান বিভাজন তৈরি করতে চেয়েছে। সেই বিভাজনের কারণেই বন্দে মাতরম্ মন্ত্রও খণ্ডিত হয়েছে। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, দেশভাগের মতো মন্ত্রেরও ভাগ হয়েছে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে। 
বন্দে মাতরম্ মন্ত্র নিয়ে যাঁরা বিতর্ক তৈরি করেন, তাঁরা শুধু শব্দার্থ দিয়ে দেখেন, ভাবার্থে নজর নেই। সেই সঙ্গে তাঁরা দেশকে মাতৃরূপে দেখার চেয়ে রাজনৈতিক ভূখণ্ড মনে করেন। তাঁরা যদি একটি বার বন্দে মাতরম্-এর প্রতিটি ছত্রের মধ্যে যে ভক্তি নিহিত রয়েছে তার মর্মার্থ অনুভব করেন তবে আর মতানৈক্য থাকবে না।
এই গানে ভারতমাতার প্রাথমিক পরিচয় ব্যক্ত। তিনি স্বর্গাদপী গরীয়সী জননী জন্মভূমি। তিনি দুর্গা-কমলা-বাণীর একত্রীভূতা মূর্তি, মন্দিরে মন্দিরে তাঁরই প্রতিমার পূজা। তিনিই বাহুতে শক্তি, হৃদয়ে ভক্তি, এবং সর্বশরীরে প্রাণস্বরূপে অধিষ্ঠাত্রী। দেশজননীকে দুর্গা, লক্ষ্মী ও বাণী বলা হলেও পরবর্তী স্তবকে তিনি হয়ে উঠলেন লক্ষ্মী ও সরস্বতীর থেকে পৃথক ও গরীয়সী এক স্বতন্ত্র দেবী। এ হেন বিশ্বজনীন মাতৃমূর্তির আরাধনায় কোনও ধর্মীয় বিভেদ নেই।
বঙ্কিমচন্দ্রের রচনায় দুর্গার শক্তি, কমলার বৈভব ও বিদ্যাদায়িনী বাণীর জ্ঞানৈশ্বর্যের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। সকল দেবতার বিশেষ গুণাবলির মিলন হলেও কোনও দেবতার মধ্যে তিনি বিলীন নন। এই মাতৃমন্ত্রে মায়ের গুণাবলিই শুধু বর্ণিত হয়নি— মায়ের রূপ, সৌন্দর্য, চিন্ময়ী সত্তা, ঐশীশক্তি, বিশ্ব ও ধরিত্রীর পালক জগজ্জননীর সঙ্গে তাঁর একাত্মতা বিধৃত হয়েছে। আর তাতেই ‘বন্দে মাতরম্’ বিশ্বের মহত্তম দেশবন্দনা। এমন অনন্য সৃষ্টির কোনও তুলনা বিশ্বের ইতিহাসে নেই। দেশের জল, ফল, স্নিগ্ধবায়ু এবং শস্য-শ্যামলক্ষেত্রে দেশমাতৃকা প্রকাশমান। কাননের ফুল্লকুসুম ও দ্রুমদলে তিনি সুশোভিত। তিনি সুহাসিনী, সুমধুরভাষিণী। তিনি সুখদা ও বরদা। তিনি সর্বকল্যাণময়ী। তিনি শক্তিময়ী। সন্তানদের ঐক্যশক্তিতে তিনি বহুবলধারিণী। তিনি সকল বাধা-বিপদ অতিক্রমে কৃপা করেন, সন্তানদের রিপু, দুর্বলতা নিবারণ করেন। এমন দেশমাতৃকার চিন্ময়মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হবে সারা দেশের মন্দিরে মন্দিরে। দেশপ্রেমের সেই ভাবনা থেকেই তো স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, “আগামী পঞ্চাশ বছর আমাদের গরীয়সী ভারতমাতাই আমাদের আরাধ্য দেবতা হউন…।”
‘বন্দে মাতরম্’-কে মন্ত্র মেনেই তো বিপিনচন্দ্র পাল এবং পরবর্তী কালে ঋষি হয়ে ওঠা শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ তাঁর পত্রিকার নাম দিচ্ছেন, ‘বন্দে মাতরম্’। এই মন্ত্রের ভিত্তিতেই তো অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতমাতার রূপ ফুটিয়েছেন তাঁর আঁকা ছবিতে। সেখানে তিনি গৈরিক বসনে আবৃতা চতুর্ভুজা যোগিনী। দেবীর চার হাতে ধান্য, বস্ত্র, বিদ্যার আকর পুঁথি, আর ধর্মসাধনার দ্যোতক জপমালা। এ তো সনাতন ভাবনার প্রকাশ।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচনায় গণমানসে জগন্মাতা হয়ে ওঠেন ভারতমাতা। পরাধীন ভারতে যিনি ভারতবাসীর মঙ্গলময়ী এবং ব্রিটিশদের উপরে খড়্গহস্তা। ঠিক যেমন দেবী দুর্গা ও মহিষাসুর। ‘বন্দে মাতরম্’ হয়ে ওঠে স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজমন্ত্র। সেই সময়কালে দেশের মুক্তির জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল এমনই এক শক্তিশালী মন্ত্র। যা প্রাণের মায়া ত্যাগ করে দেশমাতৃকার পায়ের কাছে নিজেকে নৈবেদ্য হিসেবে অর্পণ করার শক্তি জুগিয়েছিল বীর যোদ্ধাদের।
এই ধ্ব঩নি ক্রমশ বাংলা অতিক্রম করে গোটা দেশের কাছেই দেশপ্রেমের মন্ত্র হয়ে ওঠে। বাংলার পথ থেকে বম্বের অন্দরে, পাঞ্জাবের সমতলে ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রতিধ্বনি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে যায়। ১৯০৬ সালের ২০ মে বর্তমান বাংলাদেশের বরিশালে ‘বন্দে মাতরম্’ শোভাযাত্রা বার হয়েছিল। হিন্দু, মুসলিম নির্বিশেষে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ যোগ দেন। ‘বন্দে মাতরম্’ লেখা পতাকা নিয়ে শহর পরিক্রমা হয়। এই মন্ত্র ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে দেখে ব্রিটিশ প্রশাসন সচকিত হয়ে ওঠে এবং নানা বিধিনিষেধ আরোপ করতে শুরু করে। স্কুল-কলেজে ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া নিষিদ্ধ করে নির্দেশিকা জারি করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির অনুমোদন বাতিল এবং রাজনৈতিক বিক্ষোভে যোগ দেওয়া পড়ুয়াদের সরকারি চাকরি পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার হুমকি দেওয়া হয়।
কিন্তু তাতেও আবেগ বন্ধ করায় পরাভূত হয় ব্রিটিশ। ১৯০৫ সালের নভেম্বর মাসে বাংলার রংপুরের একটি স্কুলের ২০০ জন পড়ুয়া ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি দেওয়ায় তাঁদের জরিমানা করা হয়। ১৯০৮ সালে লোকমান্য তিলককে যে দিন বর্মার মান্দালয়ে নির্বাসনে পাঠানো হয়, সে দিনও ‘বন্দে মাতরম্’ স্লোগান দেওয়ার অপরাধে পুলিশ বহু মানুষের উপর অত্যাচার চালায়। এর ফলে ‘বন্দে মাতরম্’ মন্ত্রের জাতীয়তাবাদী চেতনা ও তাৎপর্য বেড়ে যায়। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি রাজনৈতিক সমাবেশে এই মন্ত্র উচ্চারণ করতে থাকেন।
অধ্যাপক জগদীশ ভট্টাচার্য একটি প্রবন্ধে লিখছেন— ‘পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এমন উদার, এমন গভীর, এমন কোমল বিশ্বপ্রীতিপূর্ণ স্বদেশসংগীত আছে বলে আমাদের জানা নেই।’ আবার ঐতিহাসিক  রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখছেন— ‘দেশের বাহ্যিক রূপ ও আধ্যাত্মিকতার এমন সুষ্ঠু সমন্বয় বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।’
আজ দেশ যখন বন্দে মাতরম্‌-এর ১৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করছে, তখন ঐক্য, প্রতিরোধ এবং জাতীয় গর্বের প্রতীক এই গানের উত্তরাধিকারকে সম্মান জানাতে দেশজুড়ে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। শুধু যে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কালজয়ী সৃষ্টিকে শ্রদ্ধা জানাতে হবে তাই নয়, একইসঙ্গে এই উদযাপনে ‘বন্দে মাতরম্‌’–এর চেতনাকে নতুন করে প্রকাশ করতে হবে, যাতে ভারতের বর্ণময় অতীতের সঙ্গে দেশের ঐক্যবদ্ধ, আত্মনির্ভর, সাংস্কৃতিকভাবে প্রাণবন্ত ভবিষ্যতের যোগসূত্র গড়ে দেবে।
বন্দে মাতরম্।
 লেখক: প্রাক্তন অধ্যাপক, গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়। কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রী, শিক্ষা এবং উত্তর-পূর্ব উন্নয়ন মন্ত্রক

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ