Bartaman Logo
২৮ মে, ২০২৬

দ্বিতীয় চিপকো আন্দোলনের অপেক্ষায় ‘দেবভূমি’ উত্তরাখণ্ড, হতাশ পর্যটকরা

সালটা ১৯২৯। দু’দিনের জন্য কৌশানি এসেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এখানে ১৪ দিন ছিলেন তিনি। এই এলাকাকে ভারতবর্ষের ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন রাষ্ট্রপিতা।

দ্বিতীয় চিপকো আন্দোলনের অপেক্ষায়  ‘দেবভূমি’ উত্তরাখণ্ড, হতাশ পর্যটকরা
  • ২৮ মে, ২০২৬ ০৪:০০

সুমন তেওয়ারি, কৌশানি: সালটা ১৯২৯। দু’দিনের জন্য কৌশানি এসেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এখানে ১৪ দিন ছিলেন তিনি। এই এলাকাকে ভারতবর্ষের ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন রাষ্ট্রপিতা। গান্ধীজীর বসবাস করা সেই স্থানে আজ রয়েছে গান্ধীজীর অনাসক্তি আশ্রম। সেখান থেকেই নন্দা দেবী সহ ন’টি পর্বতশৃঙ্গ থেকেই দেখা যেত। এহেন কৌশানির আজ অত্যন্ত করুণ দশা। দুষ্টচক্র পাহাড়ে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। একরের পর একরজুড়ে জ্বলছে পাইন বন। ধোঁয়ায় ঢাকছে গোটা এলাকা। পরিস্থিতি এমনই, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারছেন না পর্যটকরা। চিপকো আন্দোলনের ভিত্তিভূমিতে এভাবে প্রকৃতি ধ্বংসের ঘটনায় প্রবল ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দা থেকে পর্যটকরা। পরিবেশ বাঁচাতে দ্বিতীয় চিপকো আন্দোলনের অপেক্ষায় তাঁরা। 

Advertisement

সাতের দশকে দেশজুড়ে সাড়া ফেরেছিল চিপকো আন্দোলন। প্রকৃতি বাঁচানোর সেই আন্দোলন আজও বিশ্ববন্দিত। উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলার রেনি গ্রাম থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিটি পাহাড় এক-একজন ঠিকাদারকে দেওয়া হত। ঠিকাদারির দায়িত্ব পেয়েই তাঁরা নির্বিচারে গাছ কাটা শুরু করেন। ধ্বংসের মুখে পড়ে দেবভূমির সৌন্দর্য। এরই প্রতিবাদে শুরু হয় আন্দোলন। সুন্দরলাল বহুগুণা, চণ্ডীপ্রসাদ ভট্ট, গৌরী দেবীদের নেতৃত্বে নিমেষে ছড়িয়ে পড়ে সেই আন্দোলন। চিপকো কথার অর্থ ‘আলিঙ্গন করা’। গ্রামের পুরুষ ও মহিলারা গাছকে আঁকড়ে ধরে গাছ কাটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নেমেছিল। আন্দোলনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, ঠিকাদারদের পরিবারের সদস্যরাও আন্দোলনে নেমে গাছকে আলিঙ্গন করে প্রতিবাদ শুরু করেন। সেই আন্দোলনের জেরে সরকারকে সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসতে হয়।।
বর্তমানে সেই দেবভূমিতেই ফের শুরু হয়েছে পরিবেশ ধ্বংস করা। পদ্ধতিটা অবশ্য আলাদা। সরকারি আইন বাঁচাতে সরাসরি গাছ কাটা হচ্ছে না। অভিযোগ, বিস্তীর্ণ জঙ্গল এলাকায় আগুন লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আগুনে ঝলসে যাচ্ছে বড়ো বড়ো গাছগুলি। গাছের গোড়া দুর্বল হয়ে তা নিজে নিজেই ভেঙে পড়ছে। সেই গাছই তুলে নিয়ে গিয়ে পাচার হচ্ছে। সন্ধ্যা নামলেই পাহাড়ে পাহাড়ে আগুনের লেলিহান শিখা দেখা যাচ্ছে। যার জেরে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে দূষণ। ধোঁয়ায় ঢাকা পড়ছে বিস্তৃর্ণ এলাকা। দেখা মিলছে না হিমালয়ের শৃঙ্গগুলির। ভারতের বিভিন্ন অংশ থেকে হাজার হাজার মানুষ হিমালয় দর্শনের জন্য ছুটে আসেন দেবভূমি উত্তরাখণ্ডে। রাজ্যের অর্থনীতির বড়ো ভরসা পর্যটন শিল্প। সরকারের ভাঁড়াতে লক্ষ্মী দান করা সেই পর্যটকরাই বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ে চূড়ান্ত হতাশ। তাঁদের চোখের সামনেই চলছে প্রকৃতি ধ্বংসের খেলা। এহেন পরিস্থিতি চলতে থাকলে ব্যবসায় তার প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কায় ভুগছেন ব্যবসায়ীরা। স্থানীয়দের দাবি, এই চক্র অত্যন্ত প্রভাবশালী। বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করেও কোনো কাজ হয় না। আধিকারিকরা এক দপ্তর অন্য দপ্তরের ঘাড়ে দায় ঠেলে দেন। এমনকি, যে সমস্ত পর্যটকরা পাহাড়ে আগুন লাগার খবর দিয়েছিলেন, তাঁদের উপরেও চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পর্যটকের দাবি, পাহাড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়তে দেখে তিনি বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনেন। পরে দমকল বিভাগের এক কর্মী পরিচয় দিয়ে তাঁকে হুমকিও দেওয়া হয় বলে দাবি করেন ওই পর্যটক। এই পরিস্থিতির বদল না হলে ধীরে ধীরে পর্যটকরা দেবভূমি মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন বলে মত স্থানীয় বাসিন্দা থেকে ব্যবসায়ী মহলের।

সম্পর্কিত সংবাদ