Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

উপাসক

উপাসক
  • ২২ নভেম্বর, ২০২৪ ০০:০০
যে সমস্ত ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়গণ ব্রহ্মমন্ত্রের উপাসক হন, তাঁহারা গৃহাশ্রমে বাস করিলেও ‘যতি’ বলিয়া কথিত হইয়া থাকেন। প্রতিকারের চেষ্টা না করিয়া সমস্ত দুঃখকে সহ্য করা এবং কোনপ্রকার চিন্তা বা বিলাপ না করাকে ‘তিতিক্ষা’ বলে। সত্য, ক্ষমা, ঋজুতা (সরলতা), ধ্যান, দয়া, হিংসা না করা, ইন্দ্রিয় জয়, প্রসন্নতা, মাধুর্য্য ও মৃদুতা—এই দশটি ‘যম’ বলিয়া অভিহিত। শৌচ, স্নান, তপস্যা, দান, মৌনাবলম্বন, যজ্ঞ, অধ্যায়ন, ব্রতাচরণ, উপবাস এবং কামেন্দ্রিয় নিগ্রহ—এই দশটি ‘নিয়ম’ বলিয়া অভিহিত।
Advertisement
যম এবং নিয়ম-পালনকারী ভক্তকে আমি নিজ বলিয়াই মনে করি। স্থিরাসনযুক্ত ভক্ত মহেশ্বর-পদবাচ্য হইয়া থাকে, অর্থাৎ সে ভক্ত আর আমি এক—অভিন্ন। প্রাণীগণের চিত্ত যদি বিষয়াসক্ত হয়, তবে তাহার বন্ধন হয়; কিন্তু যদি ঐ চিত্ত ব্রহ্মেতে আসক্ত হয়, তখন কে না ভব-বন্ধন হইতে মুক্ত হয়? বিগত দিনের ভোগৈশ্বর্য্যের কথা মনে স্মরণ করিবে না, ভবিষ্যতের ভোগৈশ্বর্য্যের কথাও মনে করিবে না। প্রাপ্তি হইলে তাহাকেও অভিনন্দিত করিবে না। যে এই প্রকার করিতে পারে, তাদৃশ কোন্‌ ব্যক্তি বন্ধন হইতে মুক্ত না হয়? ক্রোধ হইতেছে প্রথম শত্রু এবং ক্রোধ নিষ্ফল ও দেহনাশক হইয়া থাকে; অতএব জ্ঞানরূপ খড়্গের দ্বারা তাহাকে ছেদন করিয়া ভক্ত পরম সুখ প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। তৃষ্ণা অনেক প্রকারের ও মায়াস্বরূপিনী, তৃষ্ণা বন্ধনকারিণী এবং পাপকারিণী; অতএব এই তৃষ্ণাকে জ্ঞানখড়্গের দ্বারা ছেদন করিয়া মানব সুখে থাকিতে পারে। আসক্তি দেবতাদিগেরও পরম অধর্ম্ম বলিয়া কথিত হয়, ইহা শ্রুতি বলিয়াছেন। অনাসক্ত এই আত্মারও এই সঙ্গ পরম শত্রু বলিয়া কথিত হয়। সাধুগণ এই সংশয়কে দূর করিয়া পরম অভিলষিত বস্তু প্রাপ্ত হইয়া থাকেন; কেন না সংশয় পরম নাশের কারণ এবং ধর্ম্ম ও অর্থের বিনাশকারী হইয়া থাকে।
আশা পিশাচীর ন্যায় অন্তরে প্রবেশ করে এবং সমস্ত সুখকে নষ্ট করে; জ্ঞানরূপ অস্ত্রের দ্বারা পূর্ণরূপে তাহাকে নাশ করিয়া সাধক জীবন্মুক্তত্ব লাভ করিয়া থাকে। ক্ষমার তুল্য প্রশংসার আর কিছু নাই, কীর্ত্তির সমান ধন আর নাই, জ্ঞানের তুল্য লাভ আর নাই, অনশনের তুল্য তপস্যা আর নাই। সর্ব্বত্রাবস্থিত অথচ অনাসক্ত, কামনাশূন্য, তর্কের অতীত, তেজস্বরূপ, আত্মরূপী সেই পরাৎপরকে আমি প্রণাম করি।
যিনি কেবল সংজ্ঞামাত্র, সৎ ও অসৎরূপে যিনি প্রতিভাত, যিনি পরম মহৎ এবং যিনি অত্যন্ত দুর্জ্ঞেয়, যিনি নিজের তেজের দ্বারা সর্ব্বদা সমস্ত শঠতা, কপটতা প্রভৃতিকে পরাভূত করিয়াছেন, তাদৃশ ব্রহ্ম তোমাকে আমি বন্দনা করি। সমাহিত চিত্তে প্রাণায়াম করিলে সমস্ত রোগের নাশ হইয়া থাকে, আর সমাহিত চিত্ত না হইয়া প্রাণায়াম অভ্যাস করিলে তাহাতে সমস্ত রোগের উৎপত্তি হয়। প্রাণকে সংযত করিলে গলিত ধাতুসমূহের ময়লাগুলি যেমন দগ্ধ হইয়া যায়, তেমনি ইন্দ্রিয়সমূহের দোষগুলিও দগ্ধ হইয়া যায়। দক্ষিণ নাসিকায় বায়ুর রেচন অর্থাৎ পরিত্যাগ এবং বাম নাসিকায় পূরক অর্থাৎ বায়ু গ্রহণ করিবে, অঙ্গুষ্ঠা এবং অন্য অঙ্গুলিসমূহের দ্বারা এই প্রাণায়াম করিতে হয়। পূরক অর্থাৎ শ্বাসগ্রহণে যত মাত্রা, রেচক অর্থাৎ শ্বাস ত্যাগের বেলায় তাহার দ্বিগুণ সংখ্যা করিতে হইবে। কুম্ভক অর্থাৎ শ্বাস রোধের বেলায় রেচকের চতুর্গুণ সংখ্যা করিতে হইবে,—ইহাকে ‘প্রাণায়াম’ বলে। 
স্বামী শংকরানন্দ সংকলিত ‘রত্নমালা’ থেকে
সম্পর্কিত সংবাদ