Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

বিচারাধীন

শব্দই ব্রহ্ম! এসআইআর পর্ব একটিমাত্র নয়, সৃষ্টি করেছে বিবিধ ব্রহ্ম। ‘আনম্যাপড’, ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ প্রভৃতি নিয়ে নাজেহাল ছিলেন বাংলার মানুষ। শনিবার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর সামনে এল ‘বিচারাধীন’

বিচারাধীন
  • ২ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

শব্দই ব্রহ্ম! এসআইআর পর্ব একটিমাত্র নয়, সৃষ্টি করেছে বিবিধ ব্রহ্ম। ‘আনম্যাপড’, ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ প্রভৃতি নিয়ে নাজেহাল ছিলেন বাংলার মানুষ। শনিবার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর সামনে এল ‘বিচারাধীন’ (আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন) শব্দটি। আর এই শব্দব্রহ্মনাদেই দিশাহারা অনেকে। এসআইআরের খসড়া তালিকায় বাদ পড়েছিল ৫৮ লক্ষ নাম। তারপর আনম্যাপড, লজিকাল ডিসক্রিপেন্সিসহ কিছু জটিলতা সামনে আসে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে খোদ সুপ্রিম কোর্টকেই হস্তক্ষেপ করতে হয়! সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ মেনে শনিবার পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হল। জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) কেরামতিতে এবার বাতিল হল আরো ৫ লক্ষ ৪৬ হাজার ৫৩ জন ভোটদাতার নাম। অর্থাৎ, ২০২৫ সালের তালিকার নিরিখে সর্বমোট ৬৩ লক্ষাধিক নাম বাদ গেল। খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয় ১৬ ডিসেম্বর। তাতে ৭ কোটি ৮ লক্ষ ১৬ হাজার ৬৩০ জনের নাম ছিল। এদিন প্রকাশিত তালিকায় রাখা হয়েছে মোট ৭ কোটি ৪ লক্ষ ৫৯ হাজার ২৮৪ জনের নাম। তাঁদের ভিতরে আবার নতুন ভোটার ১ লক্ষ ৮৮ হাজার ৭০৭ জন, যাঁদের মধ্যে ১ লক্ষ ৮২ হাজার ৩৬ জন যুক্ত হয়েছেন ৬ নম্বর ফর্ম দিয়ে। বাকিদের অন্তর্ভুক্তি ঘটেছে ৮ নম্বর ফর্মের ভিত্তিতে। এই প্রেক্ষিতে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, খসড়া তালিকাভুক্ত প্রায় সাড়ে ৫ লক্ষ ব্যক্তির নাম চূড়ান্ত তালিকার প্রথম দফায় জায়গা পেল না। এ এক রহস্য! তবে উদ্বেগের শেষ এখানেই নয়, কেননা আরো ৬০ লক্ষ ভোটারের ভাগ্য এখনো ‘বিচারাধীন’ (আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন)।

Advertisement

কয়েকটি বিস্ময়কর উদাহরণ: নন্দীগ্রাম-১ ব্লকের ৬৬ নম্বর বুথের বিএলও জাকির হোসেন বলেন, ‘‘আমার বুথে মোট ৫১ জন ভোটার ‘বিচারাধীন’। তাঁদের মধ্যে আমিও অন্যতম। ২৭ বছর চাকরি করছি। ভোটকর্মী হিসেবে কাজ করেছি সাতবার। আমার পাসপোর্ট আছে। নাম আছে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায়। তাতে কোনোরকম ভুল ছিল না। তারপরও কেন শুনানিতে যেতে হয়েছিল তা স্পষ্ট নয়। আমার বয়স্ক বাবা এবং স্ত্রীও ‘বিচারাধীন’ ভোটার!’’ ২০০২ সালের তালিকায় নাম ছিল ৯৫ বছরের বৃদ্ধা সুবর্ণবালা দে-র। তবু এবার শুনানিতে ডাকা হয় তাঁকে। শেষমেশ শুনানি হয় তাঁর বাড়িতেই। তবু চূড়ান্ত তালিকার বাইরে রয়ে গেলেন কাটোয়ার এই অতিবৃদ্ধা। তিনি জানেন না, এখন কী করবেন এবং কীভাবেই বা করবেন? গণনা ফর্ম বিলি থেকে ডিজিটাইজ—সবই করেছেন বিএলওরা। অথচ কাটোয়া-১ ব্লকের দুই বিএলওর নাম ‘বিচারাধীন’! নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাকি কাজে তাঁরা আর আদৌ অংশ নিতে পারবেন তো? সংশয় এখন এনিয়েই। বিচারাধীন ভোটারদের জন্য মহামান্যদের কোন সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করে আছে সে কেবল তাঁরাই জানবেন। স্বভাবতই বাতিল ভোটারের সংখ্যা এক কোটি অতিক্রম করার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। 
আর এখানেই বিজেপি নেতাদের হুংকারের সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছেন বিরোধীরা। কেননা, গেরুয়া শিবিরের একাধিক নেতা গত কয়েকমাসে বাংলায় দেড় কোটি ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার সম্ভাবনা শুনিয়েছেন বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে। এখানেই প্রশ্ন, তাহলে কি বিজেপির এই ‘টার্গেট’ ধরেই এসআইআর শুরু হয়েছে এরাজ্যে? ইসিআই কি ঘুরপথে মোদি-শাহের পার্টির লক্ষ্যপূরণে নিবেদিত প্রাণ? সবাই জানেন, ৭ নম্বর ফর্মের অপব্যবহার নিয়ে বারবার সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সাফ কথা, বহু বৈধ নাগরিকের ভোটাধিকার হরণের চক্রান্ত করছে বিজেপি। এমনকি ১.২০ কোটি ভোটারকে বাতিলের খাতায় ফেলা হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। শনিবার প্রকাশিত প্রথম চূড়ান্ত তালিকার গতিপ্রকৃতি তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিরোধীদের গভীর আশঙ্কার সঙ্গে বহুলাংশে সামঞ্জ্যপূর্ণ। পরবর্তী তালিকা সামনে না-আসা পর্যন্ত ইসিআইয়ের ভূমিকা সম্পর্কে সংশয়, সন্দেহ দূর হওয়ার নয়। এসআইআর চলাকালে বিরোধীদের উদ্বেগের জবাবে সিইও মনোজ আগরওয়াল ‘কিছু ভুলভ্রান্তি’র কথা কবুল করেন। তবে সেসব দ্রুত সংশোধনেরও আশ্বাস দেন তিনি। কিন্তু কোথায় কী? বরং লাগাতার বেড়েছে আনম্যাপিং এবং লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির ধুয়ো। শুনানির লাইনে বারবার দাঁড়িয়ে উপযুক্ত নথি জমা করা সত্ত্বেও ভোটার তালিকায় বহু মানুষের ঠাঁই হয়নি। তাঁদের মধ্যে সমাজের বিভিন্ন ধরনের মানুষ আছেন। স্বভাবতই বহু পরিবার হতাশ, উদ্বিগ্ন। প্রতিটি গ্রাহ্য দাবি ও অভিযোগের নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রণয়নে সার্বিক স্বচ্ছতার প্রমাণ দিতে হবে ইসিআই’কেই। একজনও যোগ্য নাগরিক যেন বঞ্চিত না-হন। কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে হাতিয়ার করে কোনো একটি দল বা রাজনৈতিক জোট যেন অন্যায় সুবিধা না-পায়। বৃহত্তম গণতন্ত্রের উন্নয়নের স্বার্থেই এগুলি নিশ্চিত হওয়া জরুরি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ