


তিনি কিংবদন্তি। ফিল্ম ক্রিটিকরা বলেন তিনি প্রথম সুপারস্টার। যাঁর অমলিন হাসি লাখো হৃদয়ে ঝড় তুলেছিল। তিনি রাজেশ খান্না। অনুরাগীদের কাছে আজও তিনি এভারগ্রিন। জন্মমাসে রাজেশ খান্নার অজানা গল্প শোনালেন স্বস্তিনাথ শাস্ত্রী।
২০১২ সাল। মে মাস। আইপিএলের মরশুম প্রায় শেষের মুখে। একদিন খেলার ফাঁকে একটা বিজ্ঞাপন দেখে চমকে উঠল গোটা দেশ। ৩৫ সেকেন্ডের সেই বিজ্ঞাপনটি আলোড়ন ফেলে দিল। কেউ কেউ স্মৃতি রোমন্থনে ভাসলেন। অনেকে হা হুতাশ করতে লাগলেন। আবার অনেকে প্রবল সমালোচনায় মুখর হলেন। সেটি ছিল ছিল একটি ফ্যান কোম্পানির— ‘ফ্যানস কেয়া হোতা হ্যায় ইয়ে হামসে পুছো।’ আধো স্বরের ভয়েস ওভারের মধ্যে স্ক্রিনজুড়ে দেখা যায় কালো ট্রাউজার্স আর চকচকে শ্যু পরা দু’টি পা। ব্যাক টু ক্যামেরা। লম্বা করিডর দিয়ে হেঁটে চলেছে সামনের দিকে। দূরে দরজা। যে দরজা দিয়ে সোজা প্রবেশ করা যায় মঞ্চে। তারই মধ্যে সিপিয়া টোনের টুকরো টুকরো শটে দেখা যায় ভারতের প্রথম সুপারস্টারের সিনেমার দৃশ্য, তাঁর ফ্যানেদের পাগলামো। গাড়ির কাচে মেয়েরা এঁকে দিয়ে যায় চুম্বন চিহ্ন। পরের শটেই প্রকাশ হয় স্টারের পরিচয়। কিন্তু এ কী! কোথায় সেই গোলাপি আভাওয়ালা গাল, লাল টুকটুকে ঠোঁট? শরীর শীর্ণকায়, গাল তুবড়ে গিয়েছে। দেশের প্রথম সুপারস্টার রাজেশ খান্নার এ কী চেহারা! তবে হ্যাঁ, হাসিটি সেই একইরকম মিষ্টি আছে। সেই বিখ্যাত হাসি হেসে ঘাড় একদিকে কাত করে শেষ দৃশ্যে রাজেশ বলছেন, ‘বাবুমশায়... মেরা ফ্যানস মুঝসে কোই নেহি ছিন সাকতা’। দেখা যায় দর্শকাসনে বসানো সারি সারি ইলেকট্রিক ফ্যান। নেপথ্যে শোনা যায় বিখ্যাত সেই গানের সুর— ইয়ে শাম মস্তানি মদহোস কিয়ে যায়।
এটি ছিল রাজেশ খান্নার জীবনের প্রথম বিজ্ঞাপনি ছবি, আর শেষবারের মতো ক্যামেরার মুখোমুখি হওয়া। এর মাত্র দু’ মাস বাদে ১৯ জুলাই মারা গিয়েছিলেন রাজেশ। যে শহরের লক্ষ লক্ষ মানুষ একদিন রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিল বরের সাজে রাজেশ খান্নাকে দেখতে, বহু নারী চোখের জল ফেলেছিল— সেই শহরই ভেঙে পড়ল রাজেশের শবযাত্রা দেখতে। এবং এই দুই যাত্রাতেই রাজেশের পাশে ছিলেন ডিম্পল কাপাডিয়া। রাজেশের জীবন ছিল সিনেমার চিত্রনাট্যের মতোই। এক সাধারণ যুবকের সুপারস্টার হয়ে ওঠা, আবার পাহাড়ের মতো উঁচু সেই খ্যাতির চূড়া থেকে মাটিতে আছড়ে পড়ার গল্প। তবে জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে নিজের ভুল উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন রাজেশ। তারই প্রমাণ ওই অ্যাড।
অ্যাডটি এয়ার হওয়ার পর অনেকেই বলতে শুরু করেন, এ তো রাজেশ খান্নার স্টারডমকে উপহাস করা হল। বহু পত্র-পত্রিকায় সমালোচনামূলক লেখাও বের হয়। পরবর্তীকালে অ্যাডটির পরিচালক আর বাল্কি জানান, তিনি কিন্তু শুরুতেই রাজেশকে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, এই বিজ্ঞাপনে তাঁর ফ্যান ফলোয়িং, তারকা ইমেজকে নিয়ে মজা করা হবে। মুচকি হেসে কাকা (ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এই নামেই পরিচিত ছিলেন রাজেশ) বলেছিলেন, সেটা আমি স্ক্রিপ্ট পড়েই বুঝতে পেরেছি। আর সেই কারণেই আমার ভালো লেগেছে। রাজেশের লিভারের ক্যান্সার তখন স্টেজ থ্রি লেভেলে। মৃত্যু হাতছানি দিয়ে ডাকছে। তারমধ্যেই শ্যুটিং করার জন্য ব্যাঙ্গালোরে উড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি শুরু করলেন। বাল্কি তাঁকে দু’টি শ্যুটিং স্পটের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে বলেছিলেন। একটি ছিল দিল্লিতে, আর অপরটি ব্যাঙ্গালোরে। রাজেশ ব্যাঙ্গালোরেই শ্যুট করবেন বলে জানিয়েছিলেন। কারণ, ব্যাঙ্গালোরের ওই স্টেডিয়ামেই তিনি একবার সম্মানিত হয়েছিলেন। সম্ভবত সেই স্মৃতির টানে। কিন্তু যাওয়ার আগের দিন বাথরুমে পড়ে গিয়ে পায়ে চোট। পা ফুলে ঢোল। জুতো ঢুকছে না। ছুটলেন হাসপাতালে। ডাক্তারকে বললেন, যে করে হোক জুতো পরার মতো অবস্থায় নিয়ে আসুন পা-টাকে। ডাক্তারদের চেষ্টায় ফোলা খানিকটা কমিয়ে ব্যাঙ্গালোরের ফ্লাইট ধরলেন। এরপর শুনুন বাল্কির অভিজ্ঞতা। তিনি বলছেন, একমাস আগে রাজেশের বাড়িতে বসে কথা হয়েছিল। কিন্তু শ্যুটিংয়ের দিন দেখলাম তাঁর চেহারা আরও ভেঙেছে। আমি শ্যুটিং পিছিয়ে দেওয়ার কথাও বলেছিলাম, কিন্তু রাজি হলেন না। শিডিউল মেনে কল টাইমে হাজিরা দিলেন। আমি মাঝে প্যাক আপ করার কথা বললেও তিনি মত দেননি। সন্ধে সাতটা পর্যন্ত একটানা কাজ করার পর বললেন, এবার আমার টায়ার্ড লাগছে।
অবিশ্বাস্য! এই কি সেই রাজেশ? যিনি কোনওদিন কল টাইমের দু’ঘণ্টা পরে ছাড়া সেটে ঢুকতেন না। হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে শর্মিলা ঠাকুর পর্যন্ত প্রত্যেকে তাঁর উপর এই কারণে বিরক্ত ছিলেন। রাজেশের সন্ধে শুরু হতো রাত একটার পর। রাত হতো ভোর পাঁচটায়। ভোর হতো বেলা একটায়। তারপর তিনটে নাগাদ তিনি যেতেন শ্যুটিংয়ে। আশা ভোঁসলে তাঁর স্মৃতিকথায় বলেছেন, রাহুল দেব বর্মনের বাড়িতে পার্টি থাকলে কাকা রাত তিনটেয় ঢুকতেন। পরনে থাকত ফুল ডিনার স্যুট। সর্বক্ষণ দশ-বারো জন চামচে তাঁকে ঘিরে থাকত। এই জীবনযাপন যে কতটা ক্ষতি করেছিল তাঁর কেরিয়ারের, তা কাকা বুঝতে পেরেছিলেন জীবনের প্রায় শেষ প্রান্তে পৌঁছে। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত কাকার সঙ্গী অনিতা আদবানিকে তিনি এ কথা বলে আক্ষেপও করেছিলেন। সম্ভবত সেই উপলব্ধিই কাকাকে পাল্টে দিয়েছিল। যে কারণে বাল্কির শ্যুটিংয়ে তিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন। মৃত্যু তাঁকে অকালে (৬৯ বছর বয়স হয়েছিল মৃত্যুকালে) কেড়ে না নিলে হয়তো দেশের মানুষ অন্য এক রাজেশ খান্নাকে দেখতে পেতেন। কারণ, তখনও তাঁর কাছে কাজ আসত।
উত্থান
সেটা ১৯৬৫ সাল। ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিন ও ১২ জন প্রযোজককে নিয়ে তৈরি এক প্ল্যাটফর্ম ‘ইউনাইটেড প্রোডিউসার্স’ যৌথভাবে এক ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। ঠিক হয়েছিল, প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের ওই ১২ প্রযোজক তাঁদের ছবিতে সুযোগ দেবেন। এই চুক্তি বলবৎ থাকবে ৫ বছরের জন্য। বম্বের গিরগাঁওয়ের সরস্বতী নিবাসের বাসিন্দা বছর কুড়ির যতীন খান্না সেই প্রতিযোগিতায় নাম দেন। যতীন স্কুল, কলেজে নাটক করতেন। কলেজ পাশ করে বেরিয়েও মঞ্চে অভিনয় ছাড়েননি। ছোটবেলা থেকে নাটক দেখতে দেখতে অভিনয় তাঁর রক্তে ঢুকে পড়েছিল। প্রতিযোগিতার শেষে দেখা গেল আরও কয়েকজনের সঙ্গে বিজয়ী হয়েছেন যতীনও। যতীন তখন ঝকঝকে যুবক। গালে গোলাপি আভা, লাল ঠোঁট, মুখটাও সারল্যে মাখা। দেখলেই যে কোনও মেয়ে প্রেমে পড়ে যাবে। ওইরকম মুখের কারণেই তাঁর পালক মা তাঁকে ‘কাকা’ নামে ডাকতেন। পাঞ্জাবিতে ‘কাকা’ শব্দের অর্থ বাচ্চাদের মতো মুখ, বেবি ফেস। তবে কাকার যতীন নামটা পছন্দ হল না প্রযোজকদের। তাঁরা তাঁকে নাম বদলানোর প্রস্তাব দিলেন। যতীনের নতুন নাম হল রাজেশ খান্না। প্রথম দিকে পাঁচ-ছ’টি ছবি মোটামুটি হিট হলেও দর্শকমনে রাজেশ সেভাবে দাগ কাটতে পারেননি। ইউনাইটেড প্রডিউসার্স দলে ছিলেন নাসির হুসেন, জিপি সিপ্পি, বিমল রায়, জে ওমপ্রকাশ, শক্তি সামন্ত, হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের মতো পরিচালক-প্রযোজকরাও। সেটা ১৯৬৯ সাল। রাজেশের সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তির আর মাত্র এক বছর বাকি। শক্তি সামন্ত তখন শাম্মি কাপুরকে নিয়ে ‘দ্য গ্রেট গ্যাম্বলার’ ছবি বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন (অনেক বছর বাদে শক্তি অমিতাভ বচ্চনকে নায়ক করে ছবিটি বানিয়েছিলেন)। তার আগে রাজেশকে নিয়ে একটা ‘ক্যুইকি’ তৈরি করার কথা ভাবলেন। না হলে চুক্তি লঙ্ঘন হবে। চুক্তি মতো রাজেশকে দিতে হবে মাত্র ৩৫ হাজার টাকা। একদিন চিত্রনাট্যকার শচীন ভৌমিকের সঙ্গে দেখা
হতে শক্তি তাঁকে একটা ভালো গল্প দিতে বললেন। যাতে কম খরচে অল্প সময়ের মধ্যে একটা ছবি বানিয়ে নিতে পারেন। শচীন তাঁকে গল্প দিলেন। শচীন দেব বর্মনকে দেওয়া হল সুর রচনার দায়িত্ব। নায়িকা ঠিক করা হল শর্মিলা ঠাকুরকে। ছবির নাম ঠিক হল ‘সুভা প্যায়ার কা’। শ্যুটিং শুরু হল। কিন্তু ছবির রিলিজের আগে পোস্টার ডিজাইনারের পরামর্শে বদলে গেল ছবির নাম। নতুন নাম হল ‘আরাধনা’। ছবি মুক্তি পেতেই হইহই রইরই কাণ্ড। সুপার ডুপার হিট ছবি। রাজেশ পেয়ে গেলেন ‘সুপারস্টার’-এর তকমা। সেই শুরু। ১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত সোলো হিরো হিসেবে রাজেশের টানা ১৫টি ছবি সুপার হিট! এই নজির এখনও কেউ ভাঙতে পারেননি। ‘আরাধনা’ দিয়ে শুরু করে ‘দো রাস্তে’, ‘সফর’, ‘আন মিলো সাজনা’, ‘কাটি পতঙ্গ’, ‘মেহবুব কি মেহেন্দি’, ‘আনন্দ’, ‘আন্দাজ’, ‘হাতি মেরে সাথী’ হয়ে ‘অনুরাগ’। টানা ১৫টি ছবি সুপারহিট। রাজেশ তখন যা ছুঁচ্ছেন সেটাই সোনা হয়ে যাচ্ছে। গোটা দেশ রাজেশ বলতে পাগল। মহিলারা তাঁকে দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়তেন। সেই সময়ে রাজেশের সঙ্গে অভিনয় করা শর্মিলা ঠাকুর, মমতাজ, ফরিদা জালাল, জিনাত আমন প্রত্যেক নায়িকাই সেই পাগলামির সাক্ষী। মমতাজ আর ফরিদা জালাল তো সাক্ষাৎকারে বলেই দিয়েছিলেন, রাজেশের জন্য মেয়েদের এই পাগলামো দেখলে তাঁদের গা জ্বালা করত। ফরিদা জালাল বলেছিলেন তাঁর অভিজ্ঞতার কথা। একটি ছবির আউটডোর শ্যুটিংয়ে মেয়েরা রাজেশকে দেখে ছুটে এসে কেউ তার হাত, কেউ গাল, কেউ খোলা পিঠ এগিয়ে দিয়েছিলেন সেখানে অটোগ্রাফ করে দেওয়ার অনুরোধ নিয়ে। একটি সাক্ষাৎকারে রাজেশ বলেছিলেন, তাঁর এই সুপারস্টারডমের নেপথ্যে রয়েছে তাঁর অভিনীত ছবিগুলি। মেয়েরা তাঁর মতো প্রেমিক চাইত। স্ত্রীরা চাইত তাঁদের স্বামী হোক রাজেশের মতো। মা’রা চাইতেন রাজেশের মতো ছেলে পেতে। বোনেরা চাইত তাদের দাদা হোক ওইরকম। সিনেমার সঙ্গে দর্শকের এই একাত্ম হয়ে যাওয়াই তাঁর স্টারডমের কারণ বলে মনে করতেন কাকা।
পতন
একের পর এক ছবি যত হিট হচ্ছিল, কাকা ততই পালটে যাচ্ছিলেন। হিন্দিতে একটা কথা আছে ‘ঘামন্ডি’ অর্থাৎ অহঙ্কারী। রাজেশ অহঙ্কারী হয়ে উঠছিলেন। তাঁর জীবনযাপন বদলে যাচ্ছিল। সর্বক্ষণ ‘চামচা’ পরিবৃত হয়ে থাকতে পছন্দ করতেন। অফুরন্ত মদ্যপান আর সিগারেট তাঁর নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছিল। বেহিসেবি ছিলেন, দু’হাতে টাকা খরচ করতেন। বন্ধুবান্ধবদের দেদার উপহার দিতেন। রাজা মুরাদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কাউকে বাংলো, কাউকে গাড়ি পর্যন্ত গিফট করতেন। দিন-রাত কাকার বাড়িতে পার্টি লেগেই থাকত। সেখানে নিমন্ত্রিতরা নিজেদের ইচ্ছেতে এলেও কাকা না বললে পার্টি ছেড়ে বের হতে পারতেন না। ভোর পাঁচটায় ডিনার সার্ভ হতো। পরিচালক, প্রযোজকদের তাঁর মর্জিমাফিক চলতে বাধ্য করতেন। বিবিসি একটি ডকুমেন্টরি ফিল্ম করার জন্য রাজেশের দ্বারস্থ হয়েছিল। সকাল ১১টায় সাংবাদিকদের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফিক্স হলেও তাঁরা রাজেশের বাড়িতে ঢুকতেই পারেননি। পাঁচদিন ক্রমাগত ঘুরিয়ে অবশেষে বিবিসির মুখোমুখি হয়েছিলেন রাজেশ। তাঁর এই মেজাজ, খামখেয়ালিপনায় বিরক্ত হয়ে উঠছিলেন এক শ্রেণির পরিচালক ও প্রযোজক। ‘নমক হারাম’ করার পর কাকার প্রিয় পরিচালক হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায় পর্যন্ত নিজস্ব বৃত্তে বলেছিলেন, রাজেশকে নিয়ে আর ছবি করা যাবে না। রাজেশ সে কথা জানতে পেরে ভেবেছিলেন, অমিতাভ তাঁর বিরুদ্ধে হৃষিদার কানভারী করেছে। এ কারণে অমিতাভের উপর কাকা রাগ পুষে রেখেছিলেন বহুদিন যাবৎ। তবে তাঁর এই অহঙ্কারী আচরণ, উদ্ধত স্বভাব নিয়ে সাংবাদিকরা যতবারই তাঁকে প্রশ্ন করেছেন,ততবারই অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে সেসব প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়েছেন কাকা। বলতেন, আমি অহঙ্কারী, উদ্ধত হলে কি প্রযোজকরা কাজ দিতেন আমাকে?
রাজেশের জীবনে আরও একটি দিক, যা তাঁর কেরিয়ারের ক্ষতি করেছে, তা হল নারীসঙ্গ। তাঁর ছবির নায়িকাদের অনেকের সঙ্গেই রাজেশ ঘনিষ্ঠ হয়েছেন। কিন্তু সেগুলো ছিল ছোটখাট অ্যাফেয়ার। রাজেশের জীবনে প্রথম সিরিয়াস অ্যাফেয়ার হয়েছিল অভিনেত্রী অঞ্জু মহেন্দ্রুর সঙ্গে। অঞ্জু ছিলেন সঙ্গীত পরিচালক মদন মোহনের ভাগ্নি। ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের পাশাপাশি তিনি ছবিতে অভিনয় করতেন। অঞ্জুর সঙ্গে রাজেশের বহুদিন পর্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। গোটা ইন্ডাস্ট্রি সেই সম্পর্কের কথা জানত। সবাই ধরেই নিয়েছিলেন অঞ্জুর সঙ্গেই রাজেশের বিয়ে হবে। কিন্তু হঠাৎই বদলে যায় পরিস্থিতি। ডিম্পল কাপাডিয়ার সঙ্গে রাজেশের যাকে বলে ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’ তাই হয়েছিল। তখনও ডিম্পলের প্রথম ছবি ‘ববি’ মুক্তি পায়নি। ববি মুক্তি পাওয়ার ছ’ মাস আগে ডিম্পলের সঙ্গে বিয়ে সেরে ফেলেন কাকা। ডিম্পলের বয়স তখন ১৫ বছর, আর কাকার ৩২। বম্বের (এখন মুম্বই) রাস্তা দিয়ে ঘোড়ায় চেপে বর বেশে বিয়ে করতে গিয়েছিলেন রাজেশ। সেই সন্ধ্যায় গোটা বম্বে ভেঙে পড়েছিল রাজেশকে দেখতে। অনেক মহিলা সেদিন রাস্তাতেই কেঁদে ভাসিয়েছিলেন। আর কাকা, তিনি সেই শোভাযাত্রার রুট ঘুরিয়ে অঞ্জু মহেন্দ্রুর বাড়ির সামনে দিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। অনেকেই সেদিন রাজেশের এই ব্যবহারকে ‘নিষ্ঠুরতা’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু রাজেশের সঙ্গে ডিম্পলের সেই অসম বয়সের বিয়ে টিকল না। সে কথা সবাই জানেন। দুই সন্তান জন্ম দেওয়ার পর ডিম্পল রাজেশের থেকে আলাদা হয়ে গেলেও কোনওদিন রাজেশকে ডিভোর্স দেননি। রাজেশ তাঁর প্রতি ডিম্পলের ভালোবাসা হিসেবেই একে ব্যাখ্যা করেছেন প্রকাশ্যে। অঞ্জুর সঙ্গে ফের রাজেশের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল ১৯৮৮ সালে। আর জীবনের একেবারে শেষপ্রান্তে রাজেশের সঙ্গিনী ছিলেন অভিনেত্রী অনিতা আদবানি। শোনা যায়, অনিতাকে রাজেশ লুকিয়ে বিয়েও নাকি করেছিলেন।
রাজেশের বিষয়ে মহেশ ভাটের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। ‘দো রাস্তে’ সিনেমার ডাবিং হবে। মহেশ তখন রাজ খোসলার অ্যাসিস্ট্যান্ট। তাঁর উপর দায়িত্ব রাজেশকে নিয়ে ডাবিং করানোর। রাজেশ সময় দিলেন মধ্যরাতে। মহেশ হাজির, রাজেশও। ডাবিং শুরু হল। কিছু জায়গায় ডাবিং ঠিক মনে হল না মহেশের। তিনি রাজেশকে অনুরোধ করলেন, ফের ওই জায়গাগুলো ডাব করার জন্য। উদ্ধত রাজেশ মহেশকে বলেছিলেন, যাও এসব ওই দিলীপ কুমারকে গিয়ে বল। আমি দ্বিতীয়বার ডাবিং করতে পারব না। এই ঘটনার বহু বছর বাদে রাজেশ যখন অতীতের ছায়া মাত্র, তখন মহেশ গিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। রাজেশ সেদিন মহেশের কাছে স্বীকার করেছিলেন তাঁর ‘চামচা’-দের জন্যই তাঁর কেরিয়ারের সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে। রাজেশকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, কবে বুঝলেন যে আপনার স্টারডম শেষ হয়ে গিয়েছে? জবাবে রাজেশ বলেছিলেন, যেদিন থেকে বাড়ির দরজায় মেয়েদের পাঠানো ফুল আসা বন্ধ হল। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিঃসঙ্গ রাজেশ তাঁর বাংলোকে আঁকড়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন। রাজেশ জীবিত থাকতেই ‘আশীর্বাদ’ নামের সেই বাংলোর দাম উঠেছিল ১৫০ কোটি টাকা। কিন্তু রাজেশ তা বেচতে চাননি। তিনি চেয়েছিলেন তাঁর বাংলোকে একটি মিউজিয়ম করতে। তাঁর মৃত্যুর পরও যেখানে লোক আসবে। তাঁকে মনে করে হয়তো একটি ফুল রেখে যাবে। কিন্তু কাকার সেই ইচ্ছে পূরণ হয়নি। তাঁর মৃত্যুর পর ভেঙে ফেলা হয় বাংলোটি। রাজেশের ইচ্ছে পূরণ হয়নি ঠিকই, কিন্তু শিল্পী তো বেঁচে থাকেন তাঁর কাজে। রাজেশও সিনেমাপ্রেমীদের মনে বেঁচে আছেন তাঁর সৃষ্টি করা অবিস্মরণীয় চরিত্রগুলোর মধ্যে দিয়ে। এখনও ‘অমর প্রেম’, ‘খামোশি’ কিংবা ‘আনন্দ’ টিভিতে দিলে আট থেকে আশি পুরোটা না দেখে উঠতে পারেন না। তাঁর ম্যানারিজম, ঘাড় কাত করে তাকানো, গালে টোল ফেলা হাসি আধুনিক মেয়েদের বুকে আলোড়ন তোলে। এখনও ‘আনন্দ’-এর সেই সংলাপ ঘোরে লোকের মুখে মুখে— বাবুমশাই... জিন্দেগি লম্বি নেহি বড়ি হোনি চাহিয়ে।’ রাজেশের জীবন এবং কেরিয়ার দীর্ঘায়িত হয়নি ঠিকই, কিন্তু তা বড় হয়েছে অবশ্যই।