গত প্রায় এগারো বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে গিয়ে কখনও বলেছেন, ‘মানুষ মোদির গ্যারান্টিতে আস্থা রাখে, কারণ অন্যান্য রাজনৈতিক দল মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়।’ নিজের ঢাক পেটাতে গিয়ে কখনও বলেছেন, ‘আমার গ্যারান্টি হল আমার কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও অধ্যাবসায়ের প্রতিফলন।’ কখনও বা বলেছেন, ‘যেখানে সব আশা হতাশায় শেষ হয়, সেখান থেকে মোদির গ্যারান্টি শুরু হয়।’ আবার এও বলেছেন, ‘মোদির গ্যারান্টি মানেই তা বাস্তবায়িত(ফুলফিল) হওয়া।’ এসব কারণেই তাঁর গ্যারান্টি ‘সুপারহিট’— দাবি মোদির। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, মোদি জমানায় এমন ‘গ্যারান্টি’ দেওয়া প্রকল্প বা যোজনার সংখ্যা কম-বেশি ১৪৫টি। যেমন, দেশের আড়াই লক্ষ পঞ্চায়েতকে বিশেষভাবে সজ্জিত ১৫০০টি যানবাহন প্রদান করা, গঙ্গা পরিচ্ছন্নতার জন্য ‘জীবনের মিশন’ প্রকল্প, দেশে ১০০টি ‘স্মার্ট’ শহর গড়ে তোলা, প্রত্যেক নাগরিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা জমা দেওয়া, ২০২২ সালের মধ্যে কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করা, প্রতিবছর ২ কোটি চাকরি, দেশের সমস্ত গ্রাম বিদ্যুতায়িত করা, উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবদের জন্য ‘স্কিল ইন্ডিয়া’ প্রকল্প ইত্যাদি। মোদির অন্যতম সাড়া জাগানো প্রকল্প আয়ুষ্মান ভারত, যে প্রকল্প নিয়ে খোদ সিএজি বড়মাপের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছে। বিস্ময়ের কথা হল, এই প্রকল্প নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তোলায় ক্যাগের একাধিক আধিকারিককে তিরস্কার করে বদলি করে দেওয়া হয়েছে। শুধু আয়ুষ্মান ভারত নয়, প্রায় সব প্রকল্পেরই এমন হাঁড়ির হাল।
Advertisement
এমনই এক গ্যারান্টি দেওয়া ‘শো-পিস’ প্রকল্প উজ্জ্বলা যোজনা। এটি গরিব পরিবারকে বিনা খরচে গ্যাসের সংযোগ পাইয়ে দেওয়ার প্রকল্প। অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে ২০১৬ সালে প্রকল্পটি যাত্রা শুরু করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল খুবই মহৎ। গ্রামাঞ্চলে কাঠ, কয়লা, গাছের পাতা-ছাল-বাকল দিয়ে উনুন জ্বালিয়ে রান্না করেন গৃহিণীরা। কিন্তু এসব উপাদান সংগ্রহ করা অনেকসময় যেমন কঠিন, তেমনই উনুনের ধোঁয়ায় মহিলাদের কষ্ট, শরীরে নানাবিধ রোগের উপসর্গ দেখা দেওয়াও যেন এক নিত্য ঘটনা। অতএব মোদির গ্যারান্টি ছিল, এই হতদরিদ্র পরিবারগুলির হেঁশেলে উজ্জ্বলার হাত ধরে পৌঁছে দেওয়া হবে দূষণহীন চুল্লি। তথ্য বলছে, সূচনাকাল থেকে এ পর্যন্ত ১০ কোটি ৩৩ লক্ষ পরিবারের কাছে পৌঁছে গিয়েছে বিনা পয়সায় গ্যাসের সংযোগ। সঙ্গে কিস্তিতে ওভেন বা চুল্লি কেনার সুযোগ। সরকার এও জানাতে ভোলে না, উজ্জ্বলা যোজনার সুবিধা পাওয়া গ্রাহকদের ৩০০ টাকা করে ভর্তুকিতে বছরে ১২টি সিলিন্ডার দেওয়া হবে। তার মানে, একটি সিলিন্ডার নিতে খরচ হবে ‘মাত্র’ ৫০০ টাকা। ১২টি সিলিন্ডারের জন্য বছরে ৬ হাজার টাকা খরচ পড়বে। সমাজের অন্তজ শ্রেণির জন্য এমন এক ধামাকাধার প্রকল্প ঘোষণা করে মোদি বাহিনী শোরগোল ফেলে দেয়। মোদির ‘সাফল্যের’ তালিকায় সামনের দিকে জায়গা দেওয়া হয় উজ্জ্বলা প্রকল্পটিকে। এমনকী অযোধ্যায় রামমন্দির উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রকল্পের এক গ্রাহকের বাড়িতেও পৌঁছে যান প্রধানমন্ত্রী। গরিবের সেই আস্তানায় চা-ও পান করেন তিনি। কিন্তু শুরু থেকেই যে রূঢ় বাস্তবটা পর্দার আড়ালে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা হয়েছে তাতেই মোদির গ্যারান্টির ফানুস ফুটো হয়ে গিয়েছে। দেখা যাচ্ছে, গ্যাস সংযোগ নেওয়া মোট গ্রাহকের মধ্যে ২০২৩-’২৪-এর অর্থবর্ষে একটিও সিলিন্ডার না কেনা পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৪০ লক্ষ ৪৮ হাজার। তার আগের অর্থবর্ষে সংখ্যাটি ছিল ১ কোটি ১৮ লক্ষ ৮৪ হাজার। আবার বছরে মাত্র একটি সিলিন্ডার কিনেছে ২০২৩-২৪-এ এমন পরিবারের সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৬৬ লক্ষ ৫২ হাজার। তার আগের দু’বছরে এই সংখ্যাটি ছিল যথাক্রমে ১ কোটি ৫৫ লক্ষ এবং ১ কোটি ৮ লক্ষ।
কারণটা জলের মতো সহজ। আসলে মোদি জমানায় এই প্রান্তিক পরিবারগুলির একটি বা একটিও সিলিন্ডার কেনার আর্থিক সঙ্গতি নেই। উজ্জ্বল প্রকল্পের এই অনুজ্জ্বল, লজ্জার ছবিটা চোখের সামনে থাকার পরও ‘মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’, মোদির গ্যারান্টি, মোদির সাফল্য বলে নির্লজ্জ প্রচার চলছে! আসলে এটাই মোদির ‘বিকশিত’ ভারতের আসল চেহারা। গরিব-মধ্যবিত্তদের জন্য আর্থিক-সামাজিক উন্নয়নের কথা বলে হরির লুটের মতো প্রকল্প চালু করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার অধিকাংশই মুখ থুবড়ে পড়েছে। অনেক প্রকল্পের কার্যত কোনও অস্তিত্বই নেই। বেশিরভাগ প্রকল্পের অবস্থাই প্রদীপের নীচে অন্ধকারের মতো। উজ্জ্বলা প্রকল্পে হয়তো আগামী দিনে গ্রাহকের সংখ্যা আরও বাড়বে। প্রচারের ঘনঘটা চললেও তাতে কিন্তু আসল উদ্দেশ্য সফল হবে না। উনুনের ধোঁয়ায় চোখের জলই হয়তো ওই গরিব মহিলাদের ভবিতব্য।
কারণটা জলের মতো সহজ। আসলে মোদি জমানায় এই প্রান্তিক পরিবারগুলির একটি বা একটিও সিলিন্ডার কেনার আর্থিক সঙ্গতি নেই। উজ্জ্বল প্রকল্পের এই অনুজ্জ্বল, লজ্জার ছবিটা চোখের সামনে থাকার পরও ‘মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’, মোদির গ্যারান্টি, মোদির সাফল্য বলে নির্লজ্জ প্রচার চলছে! আসলে এটাই মোদির ‘বিকশিত’ ভারতের আসল চেহারা। গরিব-মধ্যবিত্তদের জন্য আর্থিক-সামাজিক উন্নয়নের কথা বলে হরির লুটের মতো প্রকল্প চালু করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার অধিকাংশই মুখ থুবড়ে পড়েছে। অনেক প্রকল্পের কার্যত কোনও অস্তিত্বই নেই। বেশিরভাগ প্রকল্পের অবস্থাই প্রদীপের নীচে অন্ধকারের মতো। উজ্জ্বলা প্রকল্পে হয়তো আগামী দিনে গ্রাহকের সংখ্যা আরও বাড়বে। প্রচারের ঘনঘটা চললেও তাতে কিন্তু আসল উদ্দেশ্য সফল হবে না। উনুনের ধোঁয়ায় চোখের জলই হয়তো ওই গরিব মহিলাদের ভবিতব্য।



