হারাধন চৌধুরী: মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদে দ্বিতীয়বার বিজয়ী হয়েই ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমি যুদ্ধ শুরু করতে নয়, যুদ্ধ বন্ধ করতে যাচ্ছি।’ অতএব বিশ্বজুড়ে ধন্য ধন্য রব উঠল। আমেরিকার মুখে ‘যুদ্ধ নয় শান্তি চাই’ বার্তা! বিশ্বজুড়ে রকমারি যুদ্ধ অব্যাহত থাকলেই যাদের লাভ, সেই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের হঠাৎ হলটা কী? গুঞ্জন উঠল, ট্রাম্প কি নোবেল পুরস্কার প্রত্যাশী—শেষ জীবনে কি একটি ‘শান্তি’ পুরস্কারে ভূষিত হতে মরিয়া? ধন্যবাদ ট্রাম্প সাহেবকে, আমাদের এমন ঘোর কাটাতে বেশি সময় তিনি নেননি।
বন্ধুর ঐতিহাসিক জয়
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দ্বিতীয় দফায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ঐতিহাসিক জয়’ নিয়ে সবচেয়ে বিশেষ উল্লসিত ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। ট্রাম্পের সাফল্যের জন্য যেসব বিশ্বনেতা দ্রুত অভিনন্দন জানিয়েছিলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাঁদেরই অন্যতম। ২০১৬-২০ পর্বে সাগরপারে ‘ট্রাম্প প্রেসিডেন্সির সাফল্যের’ কথা মনে করিয়ে দিয়ে মোদি মন্তব্য করেন যে, দুই বন্ধু দেশের সেই সহযোগিতা পুনর্নবীকরণের জন্য তিনি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। দুই দোস্তের কোলাকুলি দৃশ্যের একটি ছবিও এক্স-এ পোস্ট করেন বেজায় খুশি মোদি। পরে সন্ধ্যায় ফোনেও কথা হয় তাঁদের মধ্যে। তার প্রেক্ষিতে এক্স পোস্টে মোদি লেখেন, ‘আমার বন্ধু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দারুণ কথা হয়েছে। প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, মহাকাশ এবং অন্যান্য নানা ক্ষেত্রে ভারত-মার্কিন সম্পর্ক আরও মজবুত করার জন্য আবারও একত্রে একাত্ম হয়ে কাজ করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।’ এই সচিত্র কাহিনি ৫ নভেম্বর, ২০২৪ তারিখের। তারপর অতিক্রান্ত মাত্র চারমাস। এই সামান্য সময়ের ভিতরে ট্রাম্প সাহেব যে খেল দেখিয়ে ফেলেছেন তার মধ্যে কোনও ‘ভারতবন্ধু’র চিহ্নমাত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি। ট্রাম্প নির্বাচিত হয়েছেন চার বছরের জন্য। তাই এই দীর্ঘ জমানায় দুই বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সম্পর্ক ঠিক কোথায় গিয়ে ঠেকবে সেটাই আজকের সবচেয়ে বড় জল্পনা।
অনুদান ও অন্যান্য অস্বস্তি
হাউডি মোদি থেকে নমস্তে ট্রাম্প। বন্ধুত্বের বাহারি বিজ্ঞাপন দেখেছে গোটা দুনিয়া। কিন্তু ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনমাত্রই বন্ধুত্বের সব রংই ফিকে! বরং, বেআইনি অভিবাসী এবং শুল্ক ইস্যুতে ভারতকে লাগাতার হুঁশিয়ারি দিয়েছে আমেরিকা। মোদির গতমাসের সফর এবং ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকেও তার অন্যথা হয়নি। বৈঠক চলাকালীন পাল্টা শুল্ক আরোপের ইস্যুতে তাঁদের মধ্যে বিস্তর তর্কাতর্কিও হয়। বলা বাহুল্য, সেই বাগযুদ্ধ ভারতের পক্ষে মোটেই সম্মানজনক ছিল না। শুধু শুল্ক-যুদ্ধ নয়, এসেছে ‘অবাঞ্ছিত’ অনুদান অস্বস্তিও। ১৩ ফেব্রুয়ারি মোদির সঙ্গে বৈঠকের ঠিক আগেই ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ভারতের উপরও সমহারে পাল্টা শুল্ক চাপানো হচ্ছে। এক টিভি সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এসেছিলেন। ওঁকে আমি সাফ জানিয়ে দিই, আমরাও পাল্টা শুল্ক চাপাব। আপনারা যে হারে শুল্ক নেবেন, আমরাও সেই হারে নেব। সব দেশের ক্ষেত্রে নিয়ম এক।’ মোদির ওই সফরেই ৫০ হাজার কোটি ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে। কিন্তু বরফ গলেনি তাতেও। ২ এপ্রিল থেকেই ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ চাপতে চলেছে। এক মার্কিন সংস্থার মতে, ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে ভারতের বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৭০০ কোটি ডলার! তবে ভিন্ন মতও রয়েছে, একদল অর্থনীতিবিদের মতে, ট্রাম্পের উদ্ভট শুল্কনীতি উল্টে ভারতের জন্য আশীর্বাদই হতে চলেছে। ব্যালান্স অফ ট্রেডের পাল্লা নাকি ভারতের পক্ষেই ভারী হবে, ট্রাম্প অবশ্যই তা চান না।
ভারত বিরোধী শক্তি
আমেরিকার মাটিতে তৎপর ভারতবিরোধী শক্তিগুলির বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু গত চারমাসে ভারত দেখছে উল্টো ছবি। শিখস ফর জাস্টিস (এসএফজে) এবং তার যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষনেতা গুরপতবন্ত সিং পান্নুনের ভারতকে হুমকি উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গিয়েছে। এর থেকে মার্কিন মুলুকে এসএফজের দাপট বৃদ্ধির বাস্তবই স্পষ্ট হয়। ২০২৩ সালে পান্নুন মাত্র তিনটি হুমকিমূলক ইমেল পাঠিয়েছিলেন। সংখ্যাটি ২০২৪ সালে বেড়ে হয় ১৬। ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার চলতি কয়েকমাসের ভিতরে তা পৌঁছেছে ৩০-এ! ভারতের ইউএপিএ আইন মতে, পান্নুনের তরফে সন্ত্রাসবাদী প্রচারও গতি পেয়েছে। বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠানগুলিকে মার্কিন মাটি থেকেই সরাসরি হুমকি দিচ্ছেন তাঁরা। ভারতের প্রত্যাশা ছিল যে, ট্রাম্প জমানায় এসএফজের বিরুদ্ধে দ্রুত এবং সিদ্ধান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এফবিআই পান্নুনের কার্যকলাপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করার পর এই প্রত্যাশা বেড়েছিল। সেইমতো ভারতের তরফে কূটনৈতিক আবেদন এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করা হয়। পান্নুনের মতো ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণ করারও দাবি রয়েছে। কিন্তু ভারত এখনও পর্যন্ত হতাশই, বরং গণভোটেরও আওয়াজ তুলেছে এসএফজে। ট্রাম্প প্রশাসনের তরফে কঠোর প্রতিক্রিয়ার অভাব এই জল্পনাই উস্কে দিচ্ছে যে, এসএফজের ভারত বিরোধী ভূমিকাকে
ওয়াশিংটন গুরুত্ব দিতে চাইছে না। আমেরিকা বোধহয় এটাই মনে করছে, আর যাই হোক, এসএফজে সরাসরি মার্কিন স্বার্থের সামনে কোনও হুমকি নয়। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, খালিস্তানি চরমপন্থা সম্পর্কে ভারতের উদ্বেগ ট্রাম্প প্রশাসন সত্যিই কি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে?
শুধুই আমেরিকা
সারা পৃথিবী জানে, ডোনাল্ড ট্রাম্প হলেন একজন ‘মার্কেন্টিলিস্ট’। আর তিনিই এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বেসর্বা। ‘মার্কেন্টিলিজম’ কাকে বলে? এটা হল সেই বিশেষ অর্থনৈতিক তত্ত্ব, যেটা শুধু নিজ দেশের উদ্বৃত্ত বাণিজ্যেই মোক্ষলাভের শিক্ষা দেয়। বাণিজ্যে বাকি সব দেশকে দশ গোল দিয়ে নিজ দেশের সম্পদ এবং শক্তি বৃদ্ধিই এই তত্ত্বের নিহিত দর্শন। ষোড়শ-অষ্টাদশ শতকে গোটা ইউরোপ এই তত্ত্বের নিবিড় অনুশীলন করেছিল। মার্কেন্টিলিস্ট নেতারা বিশ্বাস করেন যে, ‘ফেভারেবল ব্যালান্স অফ ট্রেড’ থেকে দেশের স্বর্ণ ও রৌপ্য ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে। তাঁদের কাছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাহাত্ম্য হল ‘জিরো সাম গেম’—অর্থাৎ আমার মুনাফা মানে প্রতিদ্বন্দ্বীদের লোকসান—সোজা কথায় অন্যের ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়েও আমাকে লাভবান হতে হবে। এই তত্ত্বে বিশ্বাসীদের আরও বক্তব্য, অভ্যন্তরীণ শিল্প-বাণিজ্য রক্ষার স্বার্থে সরকারি ‘রেগুলেশন’ জারি থাকবে এবং আমদানির সামনে খাড়া করে রাখতে হবে ‘রেস্ট্রিকশন’। মার্কেন্টিলিস্ট পলিসিতে বৈদেশিক পণ্যের উপর অধিক শুল্ক এবং দেশীয় পণ্যের জন্য ভর্তুকি বরাদ্দ হয়। মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং বিদেশি শ্রমিকের অভিবাসন সংকোচনও এই নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। একসময় ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, ব্রিটেন, জার্মানি এবং নেদারল্যান্ডস এই নীতির চূড়ান্ত অনুশীলন করেছে। মার্কেন্টিলিজম যে সবক্ষেত্রে সুফলদায়ক হয় না তার দৃষ্টান্ত স্পেন। এজন্য সে-দেশের বস্ত্রবয়ন শিল্পকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল, এমনকী মন্বন্তরও নেমে এসেছিল একটা সময়। বহু বছর বাদে, মার্কিন মুলুকে এই অর্থনৈতিক জাতীয়বাদের চাষ চান ট্রাম্প। রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করতে ট্রাম্প তাঁর দেশবাসীকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, ‘মেক আমেরিকা গ্রেট আগেইন’! কীভাবে? তাঁদের শিল্প-কারখানাগুলিকে আমেরিকাতেই ফেরাবেন। এজন্য দেবেন লোভনীয় ইনসেনটিভ। তাতে চীন, ভারতসহ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলিতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমে যাবে। যদি কোম্পানিগুলি এখনও বিদেশে তাদের কারখানা গড়তে চায় তবে ট্রাম্প প্রশাসন প্রযুক্তি রপ্তানির উপরও বিধিনিষেধ আরোপ করবে। তেল এবং ওষুধ শিল্পের উপরেও একচ্ছত্র রাশ চায় নয়া যুক্তরাষ্ট্র। ‘অবৈধ’ অভিবাসন নিয়েও ট্রাম্প বরাবরই খড়্গহস্ত। আমেরিকায় ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব থেকে অপরাধ, মাদকের উৎপাতসহ যাবতীয় খারাপ ব্যাপারের জন্য তিনি এই সমস্যাকেই দায়ী করে থাকেন। দেশশাসনের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই ১০ লক্ষ ‘অবৈধ’ অভিবাসীকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে খেদানোও ছিল তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ! প্রাথমিক আঁচ ভারতের গায়েই বেশি পড়েছে। ‘ম্যাগা’ নীতি এই গ্রহের ভালো করবে না কোনোভাবেই। এ কেবলই আমেরিকার স্বার্থে। বড়োর পিরিতি বরাবরই বালির বাঁধ মাত্র—এই সত্য এখনই বুঝে নেওয়া দরকার।
আক্রান্ত অন্যরাও
রুশ-মার্কিন ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’ অতীত, কিন্তু তার মানে ‘যুদ্ধ’ অতীত নয়। বরং শুল্ক বা বাণিজ্য যুদ্ধের পথে ট্রাম্প তথা আমেরিকার নয়া কিছু প্রতিপক্ষ সামনে এসেছে। তার মধ্যে পয়লা নম্বর হল চীন। এছাড়া মুখে ‘বন্ধু মোদি’ বললেও ভারতের নামে দু’বেলা দুটো করে রুটি বেশিই খাচ্ছেন ট্রাম্প। প্রতিপক্ষের পংক্তিতে অবশ্যই রয়েছে ভারত, কানাডা, মেক্সিকো এবং ইউক্রেনকে সামনে রেখে গোটা ইউরোপ। জেলেনেস্কির সঙ্গে ট্রাম্পের দুর্ব্যবহার তো কূটনৈতিক অসৌজন্যের যাবতীয় সীমা অতিক্রম করে গিয়েছে। বস্তুত গোটা বিশ্বকে নতুন দুই মেরুতে বিভক্ত করে দেওয়ার কীর্তিস্থাপন করেছেন বাইডেনের উত্তরসূরি! ট্রাম্প প্রকারান্তরে একা ভালো থাকার নীতিই ঘোষণা করে দিয়েছেন যখন, তখন ভারতসহ অন্যদেরও ভালো থাকার উপায় সন্ধান করার পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। রপ্তানি বাণিজ্যে ভারতকে অন্যপথ নিতেই হবে। আরবসহ এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং আফ্রিকা ও ইউরোপের নানা অংশে নতুন বাজার খুঁজতে হবে অথবা ঘটাতে হবে পুরনোর
বাজারের সম্প্রসারণ। বাণিজ্যে আনতে হবে অন্যবিধ বৈচিত্র্যও। আঞ্চলিক বাণিজ্য সহযোগিতা বৃদ্ধির
জন্য গড়ে তুলতে হবে রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি)। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থায় গতি আনতে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’কে অর্থবহ করে তোলা দরকার। ভারত ট্রেড নেটের (বিটিএন) মাধ্যমে বাণিজ্য পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করে তোলা প্রয়োজন। অর্থবহ করে তোলা চাই ব্রিকস (ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না, সাউথ আফ্রিকা) সহযোগিতাকে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের দাপট কমাবার এটাই মাহেন্দ্রক্ষণ। ব্রিকস নেতৃত্ব আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হলে ‘ডি-ডলারাইজেশন’ অসম্ভব নয়। ডলার দুর্বল হলে আমেরিকার দাদাগিরি চুপসে যেতে বাধ্য।