Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দেশ দখলের কৌশল শেখাচ্ছেন ট্রাম্প!

মধ্যপ্রাচ্যের ভূখণ্ডের উপর ইহুদি জনগণের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় অধিকার রয়েছে। সেই সীমানা বাইবেলে নির্ধারিত। —যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহ আগে এমনই বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন ইজরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি।

দেশ দখলের কৌশল শেখাচ্ছেন ট্রাম্প!
  • ৫ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

মৃণালকান্তি দাস: মধ্যপ্রাচ্যের ভূখণ্ডের উপর ইহুদি জনগণের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় অধিকার রয়েছে। সেই সীমানা বাইবেলে নির্ধারিত। —যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহ আগে এমনই বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন ইজরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি।

Advertisement

কট্টর ট্রাম্প ভক্ত এবং মার্কিন সাংবাদিক টুকার কার্লসেন হাকাবিকে উসকে দিয়ে বলেছিলেন, বাইবেলে ইব্রাহিমের বংশধরদের জন্য যে ভূখণ্ড নির্ধারিত হয়েছে, তা ইরাকের ফোরাত নদী থেকে মিশরের নীল নদের মধ্যবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। আধুনিক লেবানন, সিরিয়া, জর্ডন এবং সৌদি আরবের কিছু অংশও তার অন্তর্ভুক্ত। জবাবে মাইক হাকাবি বলেন, ইজরায়েল যদি গোটা মধ্যপ্রাচ্য দখল করে নেয়, তবে সেটাই হবে সবচেয়ে ভালো! মধ্যপ্রাচ্যের উপর ইহুদি জনগণের ‘ন্যায্য অধিকারের’ কথা বলতে গিয়ে ওল্ড টেস্টামেন্টের উদাহরণও টেনেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির একদা প্রথম সারির নেতা হাকাবি। বিতর্কিত সাক্ষাৎকারটি এমন সময়ে সম্প্রচার হয়েছিল, যখন ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ঘিরে সংঘাতের আবহে মধ্যপ্রাচ্য তথা পশ্চিম এশিয়ায় নৌবহর মোতায়েন শুরু করে দিয়েছে আমেরিকা। বোঝাই যাচ্ছিল, যে কোনো দিন শুরু হবে আরও একটি যুদ্ধ। তবে সেটা যে এত ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে, তা টের পায়নি কেউই! 
আধুনিক যুগে শত্রুপক্ষের উপর বোমা হামলা সাধারণত রাতে শুরু হয়, যাতে লক্ষ্যবস্তুকে বেশি বিভ্রান্ত করা যায় এবং শত্রুপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দিশাহীন করে দেওয়া যায়। তবে এবারের মার্কিন-ইজরায়েলি হামলার কৌশল ছিল ভিন্ন। টার্গেট ছিল একটাই— খোদ আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে খতম করা। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপর নজরদারি চালাতে ট্রাফিক ক্যামেরা এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক হ্যাক করেছিল ইজরায়েল। খামেনেইয়ের গতিবিধি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাইছিল মোসাদ-সিআইএ। তেহরানের পাস্তুর স্ট্রিটে খামেনেইয়ের দপ্তরের কাছে একটি ট্রাফিক ক্যামেরা গোয়েন্দাদের কাছে ‘বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ’ ছিল। ওই ক্যামেরায় নজর রেখেই ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার দেহরক্ষীদের গতিবিধি, তাঁদের গাড়ি রাখার জায়গা, এমনকি দৈনন্দিন কাজ সম্পর্কে জেনে গিয়েছিল মোসাদ-সিআইএ। তেহরানের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের ফোন-কথোপকথন জানতে সে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কও হ্যাক করা হয়েছিল।
২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল প্রায় সোয়া ১০টার দিকে দিনের আলোয় তেহরানের উপর বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র পড়তে শুরু করে। ইরানের রাজধানীর রাস্তাগুলি একে যায় ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে। পরে ইজরায়েলি অফিসাররা নিশ্চিত করেন, এই প্রাথমিক হামলাটি ছিল ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করা এবং একইসঙ্গে যতটা সম্ভব সরকারি পরিকাঠামো ধ্বংস করা। শুধু খামেনেইয়ের ঠিকানা লক্ষ্য করে সেদিন ৩০টি বোমাবর্ষণ করা হয়। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে এমনই দাবি করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইজরায়েল এবং মার্কিন গোয়েন্দারা জানতেন, ওই ঠিকানায় রাজনৈতিক নেতা এবং সেনাকর্তাদের নিয়ে বৈঠকে বসেছেন খামেনেই। দীর্ঘ দিন ধরে সেই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল মোসাদ-সিআইএ। অবশেষে সেই সুযোগ আসে। আর তারপরই খামেনেইয়ের ঠিকানা লক্ষ্য করে হামলা চালায়। হামলায় নিহত হন খামেনেই সহ প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসেরজাদা, কমান্ডার ইন চিফ মহম্মদ পাকপোর, খামেনেইয়ের কন্যা, জামাতা এবং নাতনি। ধ্বংস হয় তেহরানে প্রাক্তন ইরানি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের বাসভবনও। আরও ভয়ঙ্কর খবর, দক্ষিণ ইরানের হরমোজগান প্রদেশের মিনাবে একটি মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইজরায়েলি হামলায় ১৫৩ জন নিহত হয়। একদিনে ১২০০-র বেশি বোমা ফেলে ইরানকে তছনছ করার আসল উদ্দেশ্য ছিল— রেজিম চেঞ্জ (সরকার পরিবর্তন)! ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ৪৭ বছরের ইতিহাসে এটাই ছিল সম্ভবত সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জের মুহূর্ত।
ঘটনার পরেই ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ফারসি ভাষায় টুইট করে ইরানে সরকার পরিবর্তনের আহ্বান জানায়। বার্তায় বলা হয়, ‘আমাদের ইরানি ভাই ও বোনেরা, আপনারা একা নন! আমরা আপনাদের জন্য একটি বিশেষ, অতি সুরক্ষিত টেলিগ্রাম চ্যানেল চালু করেছি। আমরা একসঙ্গে ইরানকে তার গৌরবময় দিনে ফিরিয়ে নিয়ে যাব। সরকারের বিরুদ্ধে আপনাদের ন্যায্য সংগ্রামের ছবি ও ভিডিও আমাদের সঙ্গে শেয়ার করুন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নিজেদের খেয়াল রাখুন! আমরা আপনাদের পাশে আছি।’ 
সরকার উৎখাতে ইরানিদের আহ্বান জানানো মোসাদের ভাষা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখেও শোনা যায়। তবে সেটা সরাসরি নয়, ওয়াশিংটনে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে একটি রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে। সেটা ওয়াশিংটনের সময় রাত আড়াইটে নাগাদ (তেহরান সময় আনুমানিক বেলা ১১টা) ট্রাম্পের নিজস্ব ট্রুথ সোশ্যাল চ্যানেলে প্রচারিত হয়। যেখানে সাদা ‘ইউএসএ’ বেজবল ক্যাপ পরে একটি পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প ‘ইরানে বড়ো ধরনের সামরিক অভিযান’ শুরুর কথা ঘোষণা করেন। আট মিনিটের ভাষণটি শুরু হয় এই দাবিতে যে, হামলাটি করা হয়েছে ‘ইরানি শাসনের বিপদ’ থেকে আমেরিকান জনগণকে রক্ষার জন্য, যাদের তিনি বলেন ‘অত্যন্ত নিষ্ঠুর, ভয়ঙ্কর মানুষের একটি দল’। ভাষণটি শেষ হয় ইরানি জনগণকে উঠে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে, ‘এখনই সময়, নইলে আর কখনও নয়।’ ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আজ রাতে বলছি, আপনাদের স্বাধীনতার সময় এসে গিয়েছে। ঘর থেকে বের হবেন না। বাইরে খুব বিপজ্জনক। চারদিকে বোমা পড়বে। আমরা শেষ করলে আপনারা সরকার দখল করুন। সম্ভবত বহু প্রজন্মের মধ্যে এটাই হবে আপনাদের একমাত্র সুযোগ।’
অল্প সময়ের মধ্যেই পেন্টাগন জানায়, ইরানের উপর হামলার সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছে ‘এপিক ফিউরি’। ইজরায়েলও নতুন এই যুদ্ধের জন্য নিজস্ব নাম ঘোষণা করে ‘অপারেশন রোরিং লায়ন’। তারা এর জন্য একটি লোগোও তৈরি করে, যেখানে নীল-সাদা ডেভিডের তারকাখচিত পতাকার সামনে গর্জন করা সিংহ দাঁড়িয়ে। ওয়াশিংটনে কংগ্রেস সদস্যরা যখন পরদিন ঘুম থেকে ওঠেন, ততক্ষণে উপসাগরীয় অঞ্চল জ্বলছে— এমন এক যুদ্ধের কারণে, যার বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনাই করা হয়নি। সিনেটের সশস্ত্র বাহিনী কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট জ্যাক রিড বলেন, ‘আমেরিকান জনগণের স্পষ্ট ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের দেশকে ইরানের সঙ্গে এক বড়ো যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছেন। এর পক্ষে তিনি কখনও যুক্তি তুলে ধরেননি, কংগ্রেসের অনুমোদন চাননি এবং যার কোনো শেষ লক্ষ্যও নির্ধারণ করেননি।’
ব্রিটিশ সংবাদসংস্থা দ্য গার্ডিয়ান-এর কূটনৈতিক সম্পাদক প্যাট্রিক উইন্টুর লিখছেন, ইজরায়েল ও আমেরিকার যৌথ উদ্যোগে ইরানের উপর যে হামলা চালানো হয়েছে, তার পরিকল্পনা বহু মাস ধরেই চলছিল। আমেরিকা-ইরান আলোচনার মাঝপথে এই আঘাত হানার সময় বেছে নেওয়াটা আবারও প্রশ্ন তুলবে— ওয়াশিংটন আদৌ কি তেহরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে আন্তরিক ছিল? দ্বিতীয় দফা আলোচনার মাঝখানে এই হামলা কার্যত ইরানি শাসকদের কাছে ভবিষ্যতে কোনো মার্কিন আলোচনার প্রস্তাবকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার সম্ভাবনাই ভেঙে দিল। তারা ইতিমধ্যে দু’বার ‘দগ্ধ’ হয়েছে। একটি ইরানি টেলিগ্রাম চ্যানেলে যেমন লেখা হয়েছে, আবারও কূটনীতির পথে এগতে গিয়েই আমেরিকার হামলার মুখে পড়ল ইরান। আবারও প্রমাণিত হল, সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র আমেরিকার সঙ্গে কূটনীতি সম্ভব নয়।
অথচ, ২৭ ফেব্রুয়ারি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী ওমানের বিদেশমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি হঠাৎ করে ওয়াশিংটনে ছুটে গিয়েছিলেন। আলোচনার অগ্রগতি ইতিবাচক বলে তুলে ধরতে মরিয়া প্রচেষ্টা চালান তিনি। এমনকি চুক্তির বহু গোপন দিকও প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, শান্তিচুক্তি হাতের নাগালে। কিন্তু আলবুসাইদিকে কেবল মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া হয়। তিনি ভ্যান্সকেও বোঝানোর চেষ্টা করেন, আলোচনা সাফল্যের দোরগোড়ায়। কিন্তু এই আলোচনা কোনোটাই ট্রাম্পের পছন্দ ছিল না। তাঁর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন— ট্রাম্প আসলে চেয়েছিলেন ইরান দ্রুত নতি স্বীকার করুক। ইরান তা না করায় তিনি নাকি অবাক হয়েছিলেন। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, হামলার আগে ট্রাম্প ঠিক কী করতে চাইছেন এবং কেন করতে চাইছেন, সেই বিষয়ে সাধারণ মানুষ, কংগ্রেস বা মিত্রদেশগুলির সঙ্গে আলোচনার করার কোনো চেষ্টা করেননি। এর ফলে ট্রাম্প ক্রমশ একঘরে হয়ে যাচ্ছেন। মার্কিন সিনেটে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা চাক শুমার বলেছেন, ‘এটা ট্রাম্পের যুদ্ধ। এই যুদ্ধ বেছে নেওয়া হয়েছে। তাঁর কোনো কৌশল নেই, কীভাবে যুদ্ধ শেষ হবে তারও কোনো পরিকল্পনা নেই।’ অন্যদিকে পশ্চিমি সামরিক জোট ন্যাটোর প্রধান মার্ক রুতে জানিয়ে দিয়েছেন, এই সংঘাতে একক জোট হিসেবে জড়িয়ে পড়ার কোনো পরিকল্পনা নেই ন্যাটোর। একই কথা শুনিয়ে দিয়েছে স্পেন, ফ্রান্স, ব্রিটেনও।
এই যুদ্ধ আসলে মার্কিন সামরিক শক্তির উন্মুক্ত প্রদর্শন। আর এই শক্তি প্রদর্শনের নেতৃত্বে আছেন এমন একজন প্রেসিডেন্ট, যিনি দেশীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এপস্টাইন ফাইল কেলেঙ্কারি ট্রাম্পকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। আমেরিকান বিশেষজ্ঞরাও বলা শুরু করেছেন, ইরানের সঙ্গে ভুয়ো আলোচনার নাটক সাজিয়ে ‘যুদ্ধবাজ’ ট্রাম্প আসলে সময় নষ্ট করছিলেন। তাঁর আসল উদ্দেশ্য ছিল সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করে আঘাত হানার সুযোগ তৈরি করা। ট্রাম্পের দাবি, ‘এটি জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। আমরা ওদের ক্ষেপণাস্ত্র ধুলোয় মিশিয়ে দেব। আমরা নিশ্চিত করব যে ওদের মদতপুষ্ট গোষ্ঠীগুলি যেন পশ্চিম এশিয়াকে আর অশান্ত করতে না পারে। ওদের হাতে যেন কোনোভাবেই পরমাণু অস্ত্র না থাকে।’
প্রশ্ন একটাই, ইরানকে রক্তাক্ত করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কি এপস্টাইন ফাইল কেলেঙ্কারি থেকে মুক্তি পাবেন? এখনও ওই বিতর্কিত ফাইলের অনেক কিছু ‘ক্লাসিফাইয়েড’ রয়ে গিয়েছে। ফাইল খুললে অনেকেরই বিপদ!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ