রাহুল চক্রবর্তী, কলকাতা: কাক আর কোকিলের গল্পটা প্রায় সকলেরই জানা। স্মৃতির পাতায় একবার উল্টে দেখা যাক— কোকিল কাকের বাসায় গিয়ে ডিম পাড়ে। কাক সেটাকে নিজের ডিম মনে করে ছানাকে বড় করে তোলে। তারপর একটা সময় কোকিলের ছানা বড় হয়ে উড়ে চলে যায়, কাক সেটা বুঝতেও পারে না। অন্যদিকে আবার কোকিল সুমধুর কণ্ঠের অধিকারী, তাকে নিয়ে সবাই গর্ব করে। আবার কোনও ব্যক্তির কণ্ঠস্বরের নমুনা নিতে গেলেও কোকিলের প্রসঙ্গই টেনে আনা হয়। কাক কালো রঙের, দেখতে খারাপ, কর্কশ কণ্ঠস্বর। কিন্তু সে নোংরা-আবর্জনা পরিষ্কার করে।
এতসবের ঘটনার পরেও কাক আর কোকিলের মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। ঝগড়া, মারামারি তো নৈব নৈব চ। কাক আর কোকিলের সম্পর্কের এই বন্ধনটাই এবার দুর্গাপুজোর প্রাঙ্গণে উপস্থাপন করেছে দক্ষিণ কলকাতা সর্বজনীন (ঐকতান)। তারা উপস্থাপনার নাম দিয়েছে, ‘সম্পর্ক’। যেখানে তাদের বার্তা— সম্পর্ক তখনই সুন্দর হয়, যখন একে অপরকে বোঝার চেষ্টা করে, দোষারোপ করার নয়।
দক্ষিণ কলকাতা অঞ্চলে যে কটি দুর্গাপুজো আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে, তাদের মধ্যে অন্যতম হল ঐকতান। ৬০ বছরে এবারে তাদের পদার্পণ। কাকের বাসা, ঝুড়ি, গাছ দিয়ে গোটা মণ্ডপ সাজিয়ে তোলা হয়েছে। যেখানে গেলে মনে হবে— ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়!’ আসলে পুজো কমিটি বলতে চেয়েছে, যে যেখানে থাকুক, কারও রাজপ্রাসাদ হোক বা কারও একচালার ঘর, কিংবা দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ হোক কিংবা দেশের সব থেকে ধনী ব্যক্তি, তিনি যে ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়ের হোক না কেন— দিনের শেষে একটাই শব্দ থাকুক সম্পর্ক। সেটাই চিরকাল অক্ষয় থাকুক। সেই সূত্র ধরেই পুজো কমিটি তাদের উপস্থাপনায় বলেছে, কাক ও কোকিলের সম্পর্কে কোনও ফাটল নেই, এই সম্পর্ক চিরন্তন!
এই পুজো কমিটির প্রধান উপদেষ্টা সুব্রত বক্সি। পুজো কমিটির সভাপতি সন্দীপরঞ্জন বক্সি বলেন, কাক আর কোকিলের গল্প তুলে ধরে আমরা এই বার্তা দিয়েছি, সম্পর্ক যেন নষ্ট না হয়। প্রত্যেক মানুষেরই মৃত্যু আছে। কিন্তু তার আগে চলমান জীবন পথে সম্পর্ক থাকুক ছেদহীন। প্রত্যেকের প্রতি ভালোবাসা, সম্মান বজায় থাকুক। হোক না কেউ চালাক বা কেউ বোকা। কিন্তু এ সমাজে আমরা সকলেই বন্ধু। প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।
শিল্পী দেবতোষ কর বলেন, আমাদের পুজো ভাবনার সঙ্গে গল্প হলেও সত্যিটা মিলে যাচ্ছে। আর্টিফিশিয়াল বাসা তৈরি করলে পাখি আসবেই, তার প্রমাণ পেলাম আমাদের পুজো মণ্ডপে। আমাদের পুজো প্রাঙ্গণে আর্টিফিশিয়াল ৩৫০টি কাক, অজস্র ঝুড়ি, কোকিলের ডাক রয়েছে। কিন্তু দেখতে পেলাম বাসা তৈরি হতেই সতিকারের কাকের দল এসে হাজির পুজো প্রাঙ্গণে। এটাই আমাদের উপস্থাপনার সাফল্য!