একেই বোধহয় বলে সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কে স্থায়ী মিত্র বা শত্রু বলে কিছু হয় না। রবিবার ড্রাগনের দেশে ঘণ্টাখানেকের বৈঠকে মুখোমুখি বসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং একযোগে বন্ধুত্বের বার্তা দিয়ে যেন সেকথাই বুঝিয়ে দিলেন। কারণ, শুল্ক ইস্যুতে আপাতত দু’পক্ষের ‘কমন শত্রু’র নাম আমেরিকা। অতএব অতীতের তিক্ততা ও ভুল বোঝাবুঝি ভুলে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুই দেশের শীর্ষ নেতারা পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা করে একসঙ্গে পথচলার ইঙ্গিত দিলেন। বৈঠকে মোদির বার্তা ছিল, দু’দেশের ২৮০ কোটির বেশি জনগণের স্বার্থে ভারত ও চীনের মধ্যে স্থিতিশীল সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহায়তার পরিবেশ থাকা প্রয়োজন। আর জিনপিং বলেছেন, দু’দেশের বন্ধুত্ব সঠিক সিদ্ধান্ত। সীমান্তে শান্তি বজায় রাখতে দু’ দেশ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে। সীমান্ত সমস্যার উপর আর ভারত-চীনের সম্পর্ক নির্ভর করবে না। দুই শীর্ষ নেতার আলোচনায় ঠিক হয়েছে, দু’পক্ষ আন্তরিকভাবে সীমান্ত সমস্যা সমাধানে ব্রতী হবে। বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে বিনিয়োগের দরজা খুলবে দু’দেশ। দু’দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চালানোর বিষয়টাও আলোচনায় এসেছে। সন্দেহ নেই, এই বৈঠক ভারতের জন্য খুবই ইতিবাচক পদক্ষেপ। কারণ, আমেরিকার সঙ্গে চীনের ‘মধুর’(পড়ুন সাপে-নেউলে) সম্পর্কের কথা সকলেরই জানা। আক্ষরিক অর্থেই আমেরিকা যে দেশটিকে তাদের প্রধান ‘চ্যালেঞ্জ’ বলে মনে করে, তার নাম চীন। বরাবর আমেরিকার সঙ্গে ‘চোখে চোখ’ রেখে কথা বলা চীনও চাইছিল, ‘মিত্র শক্তি’র সংখ্যা বাড়িয়ে আমেরিকার গুমর ভেঙে দিতে। এই প্রেক্ষিতে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব তাদের মনোবল আরও বাড়াবে সন্দেহ নেই। অন্যদিকে, শুল্ক-হুমকিকে সামনে রেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কার্যত ‘যুদ্ধ’ ঘোষণায় ‘বিপদগ্রস্ত’ ভারতের কাছে চীনের হাত ধরা ছাড়া অন্য কোনও বিকল্প ছিল না। তাই চীনের প্রস্তাব পেতেই বন্ধুত্বের বার্তা দিতে দেরি করেননি নরেন্দ্র মোদি।
কিন্তু অতীত ভুলে সামনে এগনোর বার্তা দিলেই কি সব সন্দেহের অবসান ঘটে? বিশ্বাস ও আস্থা অটুট থাকে? এই উপমহাদেশে ভারতের ঘোষিত এক নম্বর ‘শত্রু’ হল পাকিস্তান। অথচ সেই পাকিস্তানকেই ভারতের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিতে যাবতীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, প্রযুক্তি ও পরামর্শ দিয়ে চলেছিল চীন। ভারতের সঙ্গে নতুন সমীকরণ তৈরি হলে পাকিস্তানের উপর থেকে চীনের আশীর্বাদের হাত সরে যাবে কি না— সেই প্রশ্ন সঙ্গত। খবরে প্রকাশ, লাদাখের একটা বিরাট অংশ এখনও চীনের দখলে। ‘বন্ধুত্ব’ দীর্ঘস্থায়ী করতে চীন সেই এলাকা ভারতকে ফিরিয়ে দেবে বলে জিনপিং কি মোদিকে আশ্বস্ত করেছেন? আবার উত্তর-পূর্বে ব্রহ্মপুত্রে বড় বাঁধ তৈরি করছে চীন। এ সম্পর্কে ভারত সম্পূর্ণ অন্ধকারে। চীন এই নির্মাণকাজ থেকে সরে আসবে কি না, তা কোটি টাকার প্রশ্ন। ভারত মনে করে, পাকিস্তান সরকারিভাবে জঙ্গিদের পরামর্শ ও আশ্রয়দাতা। চীন কি এই প্রশ্নে সহমত হয়ে গোটা বিশ্বকে কোনও বার্তা দিতে প্রস্তুত? নাকি আমেরিকা-বিরোধী স্বার্থের বন্ধনে একযোগে কাজ করতে গিয়ে এই জ্বলন্ত সমস্যাগুলিকে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হবে? অথবা ধামাচাপা দেওয়া হবে। আমেরিকার ‘দাদাগিরি’ ঠেকাতে ভারত-চীনের মতো দু’দেশের কাছাকাছি আসার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। কিন্তু অতীত ও বাস্তবকে ঠান্ডাঘরে পাঠিয়ে দিলে পারস্পরিক ভরসা ও শ্রদ্ধায় যে চিড় ধরতে পারে, সে কথাও স্মরণে রাখা উচিত।
চীনের তিয়ানজিন শহরে সোমবার থেকে শুরু হয়েছে ‘সাংহাই’ কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের বৈঠক। সেই বৈঠকে মোদি-জিনপিংয়ের সঙ্গে থাকবেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বৈঠক শুরুর আগে এই তিন রাষ্ট্রনেতার হাস্যোজ্জ্বল একটি ছবি পোস্ট করেছেন মোদি। আন্তর্জাতিক মহল এই ত্রিশক্তির একটি নতুন অক্ষ তৈরির সম্ভাবনা দেখছে। কূটনৈতিক বিশ্বে আমেরিকা-রাশিয়ার বৈরিতা নতুন নয়। ট্রাম্প জমানায় সেই সম্পর্ক আরও তলানিতে ঠেকেছে। ফলে প্রবল শক্তিধর আমেরিকার চোখ-রাঙানির মোকাবিলায় পুতিন-জিনপিং-মোদির নতুন অবতারে অবতীর্ণ হওয়া সময়ের অপেক্ষা হতে পারে। এমনিতেই রাশিয়ার সঙ্গে চীন ও ভারতের সম্পর্ক ভালো। এখন চীন-ভারতের সম্পর্ক দানা বাঁধলে ট্রাম্পের আমেরিকাকে যে প্রভূত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তাই যাবতীয় প্রশ্ন, সংশয় সত্ত্বেও নতুন গাঁটছড়াকে স্বাগত জানাতেই হবে।