বীরেশ্বর বেরা, হরিণঘাটা: চারদিকে ধান আর হরেক সবজির খেত। সবুজের বুক চিরে ছুটে গিয়েছে কালো পিচের রাস্তা। শিমুরালি স্টেশন থেকে সেই রাস্তা ধরে ১০-১২ কিলোমিটার যাওয়ার পর ব্যস্ত জনপদ রসুল্লাপুর। সেখানে চায়ের দোকানে বসে কথা হচ্ছিল স্থানীয় কয়েকজন যুবকের সঙ্গে। একজন নাজির, একজন কমল, আরেকজন প্রিয়ব্রত। প্রত্যেকের বয়স কমবেশি ৩০-এর কোঠায়। এঁদের মধ্যে নাজির আর প্রিয়ব্রত কর্মসূত্রে একজন কেরলে, একজন মহারাষ্ট্রে। কমল চাষাবাদ করেন। একই স্কুলে তাঁদের পড়াশোনা। বাল্যবন্ধুদের দেখা অনেকদিন পর। কর্মসূত্রে বিদেশ-বিভুঁইয়ে পড়ে থাকা, পেশার সংকট আর তার সঙ্গে বঙ্গের ভোট—এসব নিয়েই কথাবার্তা চলছিল। কমল বললেন, ‘তৃণমূল তো বলছে, হাইরোডের দু’ধারে শিল্প হবে। সেখানে হরিণঘাটার লোকের জন্য থাকবে ৩০ শতাংশ সংরক্ষণ।’ নাজির আর প্রিয়ব্রতর বক্তব্য, ‘এরকম কিছু হলে তো ভালোই। তবে প্রশ্ন তো একটাই, শুধুই ভোটের প্রতিশ্রুতি হয়ে থেকে যাবে না তো এই ঘোষণা?’
নদীয়া জেলার তফসিলি জাতি সংরক্ষিত হরিণঘাটা বিধানসভা কেন্দ্র এক সময় ছিল বামেদের শক্ত ঘাঁটি। তবে সিপিএম, সিপিআই ছাড়াও বিভিন্ন সময় এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছেন কংগ্রেস, তৃণমূলের প্রার্থীরা। ২০২১ সালের ভোটে এখানে প্রথমবার জয়ী হয় বিজেপি। বিধায়ক হন অসীম সরকার। এবারও পদ্ম-প্রতীকের প্রার্থী তিনি। তাঁকে রুখতে তৃণমূলের বাজি তরুণ তুর্কি চিকিৎসক রাজীব বিশ্বাস। হরিণঘাটার জোড়াফুল শিবির এবার এই আসন পুনরুদ্ধার করতে বদ্ধপরিকর। আর সেই লড়াইয়ে নানা প্রতিশ্রুতির মধ্যে হরিণঘাটার বেকার যুবকদের আকৃষ্ট করছে কর্মসংস্থান নিয়ে তৃণমূল প্রার্থীর ‘ভিশন’। রসুল্লাপুরে চায়ের আড্ডায় অনেকটা যেন তারই প্রতিফলন!
কী বলছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সেবাশ্রয়’ শিবিরের অন্যতম চিকিৎসক রাজীব? ‘৬ ও ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়ায় হরিণঘাটা এখন দ্রুতগামী ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অংশ। আমি বলছি, আমাদের জেতালে এখানে জাতীয় সড়কের দু’ধারে ভারী শিল্প আনব। সেসব কোম্পানির মালিকের সঙ্গে চুক্তি থাকবে, এখানে যত কর্মসংস্থান হবে, তার অন্তত ৩০ শতাংশ পাবে হরিণঘাটার মানুষই। যুবক-যুবতীদের দক্ষ শ্রমিক হিসাবে গড়ে তুলতে হরিণঘাটায় আইটি কলেজ, পলিটেকনিক, হোটেল ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ নেব।’ কর্মসংস্থানের এই দিশা কি ভোটবাক্সে কোনো ফারাক গড়ে দেবে? ৪ মে’র আগে এই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর জানার উপায় নেই। তবে রসুল্লাপুর, বল্লভুপুর, হরিআঁখি বাজার, দরাপপুর, হিংনাড়ার মতো একাধিক গ্রামে ঘুরে কমবয়সিদের সঙ্গে কথা বলে একটা বিষয় স্পষ্ট, এসআইআর আছে, তা নিয়ে দাবি-পালটা দাবি আছে, কিছু কিছু জায়গায় রাস্তাঘাটের বেহাল দশা নিয়ে শাসক-বিরোধী তুমুল দায় ঠেলাঠেলি আছে, যমুনা নদীর হাল ফেরানো নিয়ে প্রতিশ্রুতির বন্যা আছে, কিন্তু স্থানীয় বেকারদের চাকরিবাকরির প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অস্বীকার করতে পারছেন না কোনো প্রার্থীই।
তাই বিজেপির বর্তমান বিধায়ক অসীম সরকার, বামফ্রন্ট ও আই এস এফ সমর্থিত সিপিএম প্রার্থী স্বপন কুমার সরকার প্রচারে এই ইস্যুকে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছেন। অসীমবাবু বলেন, ‘তৃণমূলের আমলে শিক্ষা দুর্নীতি তো আছেই, সব মিলিয়ে চাকরিবাকরির অবস্থা কী হয়েছে, মানুষ সব জানে। আমি বিজেপির বিধায়ক বলে পদে পদে আমাকে সমস্যায় ফেলা হয়েছে। কোনো কাজ করতে দেওয়া হয়নি। আমাদের পরিচালিত পঞ্চায়েতকে বঞ্চনা করা হয়েছে। আমাকে জেতানোর পাশাপাশি রাজ্যের মানুষ এবার বিজেপিকে সরকার গড়ার সুযোগ দিলে হরিণঘাটাকে বদলে দেব। যমুনা নদীর বেহাল অবস্থার জন্য কৃষকরা পাট জাঁক দিতে পারেন না। এর হাল যেমন ফিরবে, তেমন ফিরবে বিখ্যাত হরিণঘাটা ফার্মের সুদিন। বহু কর্মসংস্থান হবে।’ সিপিএম প্রার্থী স্বপন কুমার সরকারও কর্মসংস্থানের দাবি ও বর্তমান সরকারের নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে সোচ্চার। হরিণঘাটা ফার্মের পুনরুজ্জীবনের পাশাপাশি যমুনা নদী সংস্কারের কথা গুরুত্ব সহকারে বলছেন তিনি। সেই সঙ্গে প্রচারে তিনি দাবি করছেন, এসআইআরের নামে হরিণঘাটার মানুষকে ভুল বুঝিয়েছে তৃণমূল-বিজেপি দু’পক্ষই।
তিন পক্ষই প্রচারে ভালো সাড়া এবং নিশ্চিত জয়ের দাবি করছেন। এই প্রেক্ষাপটে ওপার বাংলা থেকে আসা লক্ষাধিক মতুয়া, নমঃশূদ্র, বাস্তুহারা মানুষ অধ্যুষিত হরিণঘাটার গণদেবতা কার মাথায় আশীর্বাদের হাত রাখেন, সেটাই দেখার।