


অভিষেক পাল, বহরমপুর: রাজ্যে পালা বদলের সময়ই মুর্শিদাবাদে প্রথম জোড়াফুল ফোটে সাগরদিঘিতে। প্রয়াত মন্ত্রী সুব্রত সাহা জয়লাভ করেন। একুশেও তিনি জিতলেন বিরাট ব্যবধানে। দ্বিতীয় স্থানে চলে আসে বিজেপি। বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী নেমে যান তৃতীয় স্থানে। সুব্রত সাহার অকালপ্রয়াণে উপনির্বাচন। সময়টা ২০২৩ সাল। শাসকদলের প্রার্থীকে হারিয়ে দেন তৎকালীন বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী বায়রন বিশ্বাস। তাঁর এই জয় শুধু যে ব্যতিক্রম ছিল তাই নয়, বাম-কংগ্রেস জোট রাজনীতিতে বায়রন হয়ে উঠেছিলেন একটি মাইল ফলক। কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে বায়রন যোগ দিলেন ঘাসফুল শিবিরে।
এহেন বায়রন কংগ্রেস সমর্থকদের কাছে রাতারাতি মিরজাফরে পরিণত হন। এবার আবার সাগরদিঘির নিচু তলার কংগ্রেস কর্মীরা পাল্টা ‘বিশ্বাসঘাতক’বলছেন অধীর চৌধুরীকেও। অভিযোগ, অধীরবাবু নাকি টাকার বিনিময়ে আসনটি তৃণমূলকে উপহার দিয়েছেন। সাগরদিঘির কোনো ভূমিপুত্রকে প্রার্থী না করে বহরমপুরের বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা মনোজ চক্রবর্তীকে টিকিট দেওয়া হয়েছে। ফলত, কংগ্রেসের নিচুতলায় ক্ষোভ বইছে চোরাস্রোতের মতো। এদিকে, মশিউর রহমানের গায়েও লেগেছে ‘বেইমান’ তকমা। তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি তৃণমূলের বদান্যতায়। হয়েছিলেন সাগারদিঘি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতিও। সেই মশিউর রাতারাতি জার্সি বদলে হয়ে গিয়েছেন বাম-আইএসএফ জোট প্রার্থী। তৃণমূল কর্মীরা বলছেন, ‘দুধকলা দিয়ে আসলে সাপ পোষা হয়েছিল।’
মশিউর আদৌ ছোবল মারতে পারবে কিনা কিংবা মারলেও কতটা, তা বোঝা যাবে ৪ মে। তার আগে ভোট সমীকরণে একটু চোখ রাখা যাক। সাগরদিঘিতে মোট ভোটারের মধ্যে মুসলিম ভোটার ৬৩.৫ শতাংশ। হিন্দু ভোটার ৩৬.৫ শতাংশ। এর মধ্যে আবার বেশিরভাগটাই আদিবাসী। এসআইআরে বহু সংখ্যক নাম বাদ পড়েছে। তালিকায় সংখ্যালঘুদের আধিক্য। তারপরেও মশিউর কতখানি ভোট নিজের ঝুলিতে ঢোকাতে পারবেন, তার উপর নির্ভর করছে সাগরদিঘির পাঁচ বছরের ভবিষ্যৎ।
ভোটের অঙ্ক বলছে,সাগরদিঘি পদ্মচাষে উর্বর জমি নয়। তবুও লড়াইয়ে রয়েছেন দলের প্রার্থী তাপস চক্রবর্তী। কিন্তু, তাঁর এই লড়াইয়ের সুফল লুকিয়ে রয়েছে ভোট কাটাকুটির খেলায়। বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ভোটার প্রায় ২ লক্ষ ৩৭ হাজার। এসআইআরে বাদ পড়েছে ১৩ হাজার ৫০০ জনের নাম। এর বেশিরভাগই মৃত এবং স্থানান্তরিত ভোটার। এখনও পর্যন্ত বিচারাধীন ভোটার ৭২ হাজার! যার মধ্যে ৫০ হাজার ভোটার যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছে। বাকি ২১ হাজার ৪৭৪ জন ভোটারের নাম আপাতত বাদ।
একুশের বিধানসভা ভোটে ৫০ হাজারেরও বেশি ভোটে জয়ী হয়েছিলেন সুব্রত সাহা। তেইশের উপনির্বাচনে প্রায় ২৩ হাজার ভোটে জয়লাভ করেছিলেন বায়রন। লোকসভা ভোটের নিরিখে তৃণমূল ৩১ হাজারের বেশি ভোটে এগিয়ে। জেলা পরিষদের তিনটি আসন তৃণমূলের দখলে। পঞ্চায়েত সমিতির মোট ৩৩ টি আসনের মধ্যে তৃণমূলের দখলে ২৩টি, কংগ্রেস নটি এবং বিজেপি একটি। মোট ১১টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে তৃণমূলের দখলে দশটি। এই তথ্য আপাতভাবে তৃণমূলের কাছে যথেষ্ট স্বস্তির। আর অস্বস্তির যেটা তা হল, গোষ্ঠীকোন্দল চরমে। সেই ক্ষত সারাতে পারে একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উন্নয়ন।বায়রনের দাবি, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা মানুষ পেয়েছে। বিধায়ক তহবিলের টাকার পাশাপাশি নিজের অর্থ দিয়েও অনেক কাজ করেছি। আশাকরি, মানুষ পাশে থাকবেন।
বাইরনের এই আশার পিছনে অনুঘটকের কাজ করছে কংগ্রেসের ঝগড়া। দলের সাগরদিঘির নেতা সাইদুর রহমান, হাসানুজ্জামান বাপ্পারা বলছিলেন‘স্থানীয় সংখ্যালঘু কাউকে প্রার্থী করা হলে সাগরদিঘিতে এবার বায়রনের হার নিশ্চিত ছিল। কিন্তু অধীর’দা এমন একজনকে প্রার্থী করেছেন তাঁকে নিয়ে লড়াই করতে পারছি না।’মনোজবাবু অবশ্য বলেন, ‘সাগরদিঘি কংগ্রেসের মাটি।’