


সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: বনসরাড্ডি মাজি পাড়া। ঢালাই রাস্তার উপর কয়েকটি চেয়ার পাতা। পাড়ায় ঘুরতে ঘুরতে একটি চেয়ার টেনে বসলেন বিদায়ী শ্রমমন্ত্রী তথা আসনসোল উত্তরের তৃণমূল প্রার্থী মলয় ঘটক।
খর চৈত্রে টানা প্রচার। খানিক ক্লান্ত মলয়বাবু। চেয়ারে বসে একটু জিরোতে না জিরোতেই হাজির আদিবাসী মেয়েরা। একজনের হাতে ঘটিভর্তি জল। মলয়বাবুর সামনে সেটি রেখে প্রণাম করলেন একে একে। যেন বাড়িতে কোনও আত্মীয় এসেছেন।
আদিবাসীদের সংস্কৃতি এটাই। বাড়িতে কোনো নিকট আত্মীয় এলে এভাবেই বরণ করে নেওয়ার রেওয়াজ। যাকে বলে ‘কুটুম্ব আতিথেয়তা’। তা হলে কি মলয়বাবু আদীবাসীদের কুটুম্ব? আদিবাসী মেয়েদের জবাব, ‘কুটুম্ব কিনা জানি না। তবে, উনি আমাদের আপনজন।’
‘আপনজন’ বলেই হয়তো মলয়বাবুকে তৃণমূল প্রার্থী হিসেবে মঙ্গলবার মাজিপাড়ায় ঢুকতে আলাদা কোনও পরিচয় তুলে ধরতে হয়নি। হাতে গোণা কয়েকজন দলীয় কর্মী। কারও হাতে পতাকা নেই। কোনও স্লোগান নেই। একেবারে সাদামাটাভাবে আতিথেয়তা গ্রহণ। মলয়বাবুকে ঘিরে তখন উৎফুল্ল আদিবাসী মহিলারা।
আপনজন বাড়িতে এলে ঘরোয়া কিছু সমস্যা ভাগাভাগি করেন সকলেই। আদিবাসী মহিলারাও তাই করলেন। মনযোগ দিয়ে মানসী টুডুর কথা শুনলেন মলয়বাবু। মানসি বলছিলেন, ‘আমাদের পাড়া লাগোয়া একটি পরিত্যক্ত কয়লা খাদ রয়েছে। দেখুন, ওই যে দেখা যাচ্ছে...।’ মলয়বাবু ইশারা বরাবর তাকাতে মানসীর আবদার, ‘খাদের পাড়ের রাস্তাটা একটু ঠিক করে দিন। সামনে বর্ষাকাল। সবার যাতায়াত করতে খুব অসুবিধা হয়।’ মলয়বাবু বললেন, ‘আমি তো চেষ্টা করেছিলাম। ইসিএলের জমি। ওরা বাধা দিয়ে বসল।’ হাসিখুশি মানসী মুখ শুকনো তাকিয়ে রইলেন খাদের দিকে! শুরু করলেন মঙ্গলী মাড্ডি। মলয়বাবুর কাছে তাঁর আর্জি—‘আমাদের অনুষ্ঠান হলে লোক খাওয়ানোর জায়গা পাওয়া যায় না। ক্লাব ঘরটা যদি একটু ভালো করে দেন।’
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন মলয়বাবু। উপস্থিত বাসিন্দাদের বললেন, ‘চলো গিয়ে দেখা যাক।’ ক্লাবঘর থেকে আদিবাসী পাড়া চক্কর কাটলেন তৃণমূল প্রার্থী। অলি গলিতে পথবাতি বসেছে। ঘুরতে ঘুরতে একটা ভাঙাচোরা রাস্তা এল সামনে। মলয়বাবুর গলায় আক্ষেপ, ‘রাস্তাটা হচ্ছিল। তোমরা বাধা দিলে বলে আর হল না।’ স্থানীয়দের দাবি, ‘ভালো সামগ্রী দিয়ে কাজ হচ্ছিল না।’ মলয়বাবুর পরামর্শ, ‘লিখিত অভিযোগ করতে পারতে। তা হলে রাস্তাটাও হতো। ঠিকাদারের বিলও আটকে থাকত।’
মাজিপাড়ায় আতিথেয়তা গ্রহণ করে মলয়বাবু চললেন সোজা বনসরাড্ডি বাউরি পাড়ায়। বসলেন গিয়ে আমগাছের তলায়। তাঁকে দেখে ভিড় বাড়তে শুরু করে। ভিড়ের মধ্য থেকে আশা বাউরি নামে এক মহিলা এগিয়ে এসে বলেন, ‘টাইম কলে মাঝ রাতে জল আসছে। শীতকালে অত রাতে জল নিয়ে যেতে কষ্ট হয়।’ আর এক মহিলার অভিযোগ, ‘আমাদের এখানে একটাও সরকারি বাড়ি হচ্ছে না।’ মলয়বাবু বলেন, ‘আপনাদের নিজের জমি নেই। এখানকার সব জমি তো ইসিএলের।’
এবার গন্তব্য পলাশডিহা শিবানী পাড়া। মলয়বাবুর হাতে ডায়েরি। চেয়ারে বসে মানুষের সমস্যা তাতে লিখতে শুরু করলেন। বৃদ্ধা সপ্তমী বাউরিকে ডেকে নিলেন পাশের চেয়ারে। মলয়বাবুর সামনে এগিয়ে এসে রেনুকা বাউরি বললেন, ‘আগের সমস্যাই তো মেটেনি! রেনুকার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে অন্যান্যরা বলেন, ‘এই দেখুন না, ডাস্টবিন আছে। পরিস্কার করা হয় না।’ শুনেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কাউন্সিলার শ্যাম সোরেনকে ধমক মলয়বাবুর। বললেন, এসব তো ধারাবাহিক কাজ। তোমাকেই নজর রাখতে হবে।’ রেনুকা ঠোঁটের কোণে চিলতে হাসি ঝুলিয়ে ফের শুরু করলেন, ‘সাত বছর ধরে সরকারি বাড়ি তৈরি হচ্ছে! আর টাকাই পাচ্ছি না।’