নিজস্ব প্রতিনিধি, মেদিনীপুর: পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ায় বজ্রপাত রোজকার ঘটনা। খেত, জঙ্গল, বাড়ির উঠোন, কোথাও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই। একের পর এক প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে বজ্রপাত। বাড়ছে সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি। এই পরিস্থিতির মধ্যেই মেদিনীপুরের রাজা নরেন্দ্রলাল খান মহিলা মহাবিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। গবেষকদের মতে, গত এক দশকে জঙ্গলমহলে বনভূমি উজাড় হয়েছে। আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দেদার গাছ কাটা চলেছে। এর ফলে গত ১০ বছরে বায়ুমণ্ডলের গড় তাপমাত্রা প্রায় ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণেই বজ্রপাত বেড়েছে বলে দাবি গবেষকদের। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করার খেসারত প্রাণ দিয়ে দিচ্ছে মানুষ। গত সপ্তাহে পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনী থানা এলাকায় বজ্রাঘাতে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। একই দিনে ঝাড়গ্রামেও প্রাণ হারান আরও এক ব্যক্তি। জঙ্গলমহলের মতোই গোটা রাজ্যে ছবিটা একই। কলেজের গবেষকরা জানাচ্ছেন, চলতি বছরে বজ্রাঘাতে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রায় ৯০ জন জখম হয়েছেন। তার মধ্যে পশ্চিম মেদিনীপুরে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
গবেষকদের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে পশ্চিমবঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মোট ১৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল। তার মধ্যে ১৪৩ জনেরই মৃত্যু বজ্রপাতে। জাতীয় স্তরেও ছবিটা উদ্বেগজনক। এনসিবিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। দেশে হাজারের কাছাকাছি মানুষ বজ্রপাতে মারা যায়।
রাজা নরেন্দ্রলাল খান মহিলা মহাবিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক প্রভাতকুমার শীট জানিয়েছেন, বজ্রপাত মূলত বায়ুমণ্ডলে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক বৈদ্যুতিক চার্জের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ফল। আকাশে কিউমুলোনিম্বাস বা বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হলে তার ভিতরে জলীয় বাষ্প, বরফকণা ও শিলাবৃষ্টির কণার সংঘর্ষে বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক চার্জ জমা হয়। মেঘের নীচের অংশের ঋণাত্মক চার্জ এবং ভূমিতে থাকা ধনাত্মক চার্জের আকর্ষণ যখন চরমে পৌঁছয়, তখনই ঘটে বজ্রপাত। তিনি জানান, বজ্রপাতের মুহূর্তে বাতাসের তাপমাত্রা প্রায় ২৭ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। গবেষকদের মতে, শুধু প্রাকৃতিক কারণ নয়, জলবায়ুর পরিবর্তনও বজ্রপাত বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। অধ্যাপক শীটের দাবি, বায়ুমণ্ডলের গড় তাপমাত্রা প্রতি এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেলে বজ্রপাতের সংখ্যা ৮ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। জঙ্গলমহলে গত এক দশকে গাছ কাটা, বনভূমি সংকোচন এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির মধ্যে এই যোগসূত্রই এখন গবেষণায় উঠে আসছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাতাসে ধূলিকণা, নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড, সালফার ডাই অক্সাইড, ওজোনের মাত্রা বৃদ্ধি পেলেও বজ্রপাত বেড়ে যায়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শুধু ওজোন গ্যাসই বজ্রপাতের সংখ্যা ও তীব্রতা ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পাঞ্চলের দূষণ এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নির্গত দূষিত কণাগুলি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অন্যদিকে, দ্রুত নগরায়নের ফলে কংক্রিট ও কাচের আধিক্যে তৈরি হচ্ছে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা তাপদ্বীপ প্রভাব। অতিরিক্ত তাপ এবং দূষণের কারণে কিউমুলোনিম্বাস মেঘ তৈরির অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে বজ্রঝড় এবং বজ্রপাতের সম্ভাবনাও বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের বজ্রপাতপ্রবণ জেলার তালিকায় রয়েছে মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, পূর্ব বর্ধমান, মালদা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, বাঁকুড়া এবং পশ্চিম মেদিনীপুর। তবে জঙ্গলমহলের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল, লালমাটির ভূপ্রকৃতি এবং ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার কারণে পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রামের পরিস্থিতি এখন বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।দীর্ঘমেয়াদি গবেষণাও আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। ১৯৭০ থেকে ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, ভারতে ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও তাপপ্রবাহ ও বজ্রপাতজনিত মৃত্যুর হার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাতকে এখন আর শুধুমাত্র একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অন্যতম বড় দুর্যোগে পরিণত হয়েছে।