আমাদের এই পৃথিবী সত্যিই এক বিচিত্র জায়গা। এখানে এমন অনেক কিছুই রয়েছে যার ব্যাখ্যা মেলা কঠিন। তেমনই কিছু জায়গার সঙ্গে তোমাদের পরিচয় করাচ্ছেন কমলিনী চক্রবর্তী।
আমাদের এই পৃথিবী সত্যিই এক বিচিত্র জায়গা। এখানে এমন অনেক কিছুই রয়েছে যার ব্যাখ্যা মেলা কঠিন। তেমনই কিছু জায়গার সঙ্গে তোমাদের পরিচয় করাচ্ছেন কমলিনী চক্রবর্তী।
জকের বিষয় নিউ ইয়র্কের সাইরাকুসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের একটি গাছ। এমনিতে তো সাধারণ গাছের মতোই তার গড়ন। শীতকালে ডালপালা বেরিয়ে থাকে। কাণ্ড জুড়ে জমে থাকে বরফের আস্তরণ। কিন্তু ম্যাজিক ঘটে বসন্তের শুরুতেই। গাছে কচি পাতা গজায় প্রথমে আর তারপর তা হরেক রঙের ফুলে ভরে যায়। হরেক রঙের ফুল! তাজ্জব হয়ে গেলে তো শুনে? ভাবছ ভুল পড়লে বুঝি। কিন্তু না, এটাই ঠিক, লাল, হলুদ, সবুজ, নীল নানা রঙের ফুল ফোটে এই গাছে বসন্তের শুরুতেই। এই পর্যন্ত পড়েই যদি নিজের চোখকে বিশ্বাস না হয়, তবে বলি শোন, চমকের আরও খানিক বাকি আছে। বসন্ত পেরিয়ে গ্রীষ্ম এলে ফুল থেকে ফল ধরে এই গাছে। আর সেই ফলের ধরন এক বা দুই নয়, একেবারে চল্লিশ রকমের! হ্যাঁ, ঠিক ধরেছ, একই গাছে একই সঙ্গে চল্লিশ রকমের ফুল ফোটে। অসম্ভব বা অবাস্তব মনে হলেও এটাই সত্যি।
কীভাবে এমনটা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তরটা দেব। কিন্তু তার আগে বলি কী কী ফল হয় এই গাছে। চেরি, পিচ, নেক্টারিন, প্লাম, আমন্ড সহ বিভিন্ন ধরনের ফল পাওয়া যায় এই গাছে। তবে এই ফলগুলোর একটা বৈশিষ্ট্য আছে। এগুলো সবই বেরি জাতীয় ফল অর্থাৎ এক বা একের বেশি বীজ রয়েছে ফলে। এবার শোনো এমন ম্যাজিক ঘটল কেমন করে? গাছটা প্রাকৃতিক হলেও তার বীজ রোপণ হয়েছিল কিন্তু গবেষণাগারে। সিরাকুসে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে চর্চারত এক অধ্যাপক, ভ্যান অ্যাকেন একটি ফলের বাগানের সন্ধান পান। পরিচর্যার অভাবে সেখানে গাছগুলো তখন মৃতপ্রায়। বন্ধ হতে বসেছিল বাগনটি। এমন সময় গাছের ডাক্তার হিসেবে ভ্যান সাহেবের ডাক পড়ে এই বাগান পরিদর্শন করার জন্য।
তিনি বাগানের গাছগুলো সব খুঁটিয়ে দেখে এবং তার উপর নানারকম পরীক্ষা করে বুঝেছিলেন এর মধ্যে থেকে ৪০টি গাছ বাঁচানো সম্ভব। বাকিগুলোর আশা ত্যাগ করতে হবে। এমন অবস্থায় এই চল্লিশটি গাছের চারা সংগ্রহ করে তিনি গবেষণাগারে নিয়ে আসেন। মাইক্রস্কোপের তলায় রেখে নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু হয় বীজ ও চারাগুলোর উপর। ২০০৮ সালে বেশ খানিকটা গবেষণার পর তাঁর মনে হয়, সব চারা মিলিয়ে একটা গাছ বানালে কেমন হয়? যেমন ভাবনা তেমনই কাজ। নতুন উদ্যমে শুরু করলেন তিনি পরীক্ষা। অবশেষে ২০১১ সালে চল্লিশ ধরমের চারা সহ একটা গাছের কাণ্ড তৈরি হল এবং তা পুঁতে দেওয়া হল সিরাকুসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। তার পরেও বেশ কয়েক বছরের প্রতীক্ষা। অবশেষে বসন্তের এক সকালে গাছে ফুল এল। গোলাপি, লাল, কমলা, হলুদ, নীল ফুলে ভরে গেল গাছ। আশায় বুক বাঁধলেন অধ্যাপকমশায়। বসন্ত শেষে গ্রীষ্মকালে যখন ফলে ফলে ভরে উঠল গাছ তখন তাঁর আনন্দ দেখে কে? অবশেষে তাঁর গবেষণা এক বিশেষ উচ্চতায় পৌঁছল, গাছটি এক বিস্ময় হয়ে রয়ে গিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে।