পরামর্শে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে ফিজিওলজির চিকিৎসক ডাঃ শুভেন্দু বাগ এবং অ্যাপোলো সুপারস্পেশালিটি কনসালটেন্ট নিউনোলজিস্ট ডাঃ মনোজ মাহাত।
পরামর্শে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে ফিজিওলজির চিকিৎসক ডাঃ শুভেন্দু বাগ এবং অ্যাপোলো সুপারস্পেশালিটি কনসালটেন্ট নিউনোলজিস্ট ডাঃ মনোজ মাহাত।
পাহাড় ও ভার্টিগো
পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়া আমাদের সকলের কম-বেশি পছন্দ। কিন্তু পাহাড়েই আমাদের শারীরিক সমস্যা হয় সবচেয়ে বেশি। কারণ উঁচুতে উঠলে বায়ুর চাপ কমে যায়। তাই শরীর মানিয়ে নিতে সময় নেয়। যাদের উঁচু জায়গায় উঠলে মাথা ঘোরে, অর্থাৎ ভার্টিগোর সমস্যা আছে, তাঁরা অনেকেই পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়া নিয়ে চিন্তায় ভোগেন বা যেতে ভয় পান। কিন্তু তাঁরা যদি চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে স্টেমিটিল জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করেন, তাহলে নিশ্চিন্তে পাহাড়ে ঘুরতে পারেন। এছাড়া পাহাড়ে যাওয়ার পর অনেকেই মোশন সিকনেসের শিকার হন। এক্ষেত্রে ডাইমিনহাইড্রিনেট বা প্রোক্লোরপেরাজিন জাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। লাদাখ বা বোমডিলার মতো আর উঁচু জায়গায় ঘুরতে গেলে শ্বাসকষ্ট বা বমি বমি ভাব লাগে। এই ধরনের সমস্যা এড়ানোর জন্য ওইসব উঁচু জায়গায় পৌঁছেই ঘুরতে শুরু করা উচিত নয়। প্রথমে একদিন ওই এলাকায় থেকে হালকা হাঁটাচলা করা প্রয়োজন। তাতে শরীর কম বায়ুচাপের সঙ্গে মানিয়ে নেবে। বেশি উচ্চতায় গেলে ঘুম পায়। কিন্তু পৌঁছেই ঘুমিয়ে পড়লে তাই মারাত্মক হতে পারে। তাই জেগে থাকা প্রয়োজন। সঙ্গে অক্সিজেন ক্যান ও অ্যাসিটাজোলামাইড জাতীয় ওষুধ রাখতে হবে। খুব বেশি সমস্যা হলে নীচে নেমে আসাই উচিত।
জঙ্গল আর আল্যার্জি
অনেকেই চান পুজোর কদিন শহুরে কোলাহল থেকে দূরে নির্জন জঙ্গলে সময় কাটাতে। বাংলার জঙ্গলে ইউক্যালিপটাস, সোনাঝুরি বা ছাতিমগাছের রেণু থেকে অ্যালার্জির আশঙ্কা থাকে। কিছু বুনো ফুল ও ধুলো থেকেও একই সমস্যা হতে পারে। অ্যালার্জির সমস্যা থাকলে আগাম লিভোসেট্রিজিন জাতীয় ওষুধের কোর্স শুরু করে দেওয়া উচিত। এই বছর পুজো এগিয়ে আসায় জঙ্গলে বর্ষার প্রভাব থাকবে। পোকামাকড়ের সংখ্যাও বাড়বে। তাই কোনও পোকামাকড়, বিশেষত ভীমরুল জাতীয় পোকা কামড়ালে ক্ষতস্থানটি ভালো করে ধুয়ে সেখানে বরফের সেক দিতে হবে। সঙ্গে অ্যান্টি হিস্টামিনিক (লিভোসেট্রিজিন জাতীয়) ওষুধ খেয়ে নেওয়া প্রয়োজন। এ সময় মশা ও সাপের ভয়ও থাকে। মশা তাড়ানোর ক্রিম ব্যবহার করা যেতে পারে। জঙ্গলের স্থানীয় খাবার চেখে দেখার আগে হাইজিনে কিন্তু নজর রাখবেন। ঘুরতে গিয়ে সংযম না মানায় শরীর খারাপ হলে ইচ্ছামতো ওষুধ খাওয়া বিপজ্জনক। যেমন অতিরিক্ত মদ্যপানের পর পেটব্যথা হলে মেট্রোনিডাজোল জাতীয় ওষুধ সেবনে মারাত্মক বিপদ হতে পারে।
সমুদ্র ও খাদ্যে সংক্রমণ
সমুদ্র সৈকতে থরে থরে সাজানো নানা ধরনের মাছ, কাঁকড়া বা স্কুইড। দেখে যে কারও জিভে জল আসা স্বাভাবিক। কিন্তু সামুদ্রিক খাবার থেকে দু’ধরনের সমস্যা হয়। এক, অ্যালার্জির সমস্যা। দুই, খাবারে বিষক্রিয়া থেকে পেটে সংক্রমণ। যারা আগে থেকেই জানেন, সামুদ্রিক খাবার খেলে অ্যালার্জি হয়, তাদের সে সব খাবার এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। আর নাহলে ডাক্তারের পরামর্শ মেনে আগে লিভোসেট্রিজিন জাতীয় ওষুধ খেয়ে এই ধরনের খাবার খান। যাদের হার্টের সমস্যা আছে, তারা অতি অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন। আর বিষক্রিয়া এড়ানোর জন্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন দোকান থেকে খান। বিচে ঘুরতে গিয়ে সমুদ্র স্নান তো মাস্ট। কিন্তু এক্ষেত্রেও একটা বিষয় মাথায় রাখা উচিত। নোনা জলে স্নান করলে আমাদের শরীরের ভিতরের জল বেরিয়ে যায়। তাই ডি-হাইড্রেশনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই সমুদ্রে স্নান করে এসে ওআরএসের জল বা ডাবের জল খাওয়া প্রয়োজন। এতে শরীর রি-হাইড্রেট হবে।
ভিড়ে দমবন্ধ লাগলে
ভয়- ক্লস্ট্রোফোবিয়া। শব্দটার সঙ্গে অনেকে পরিচিত, আবার অনেকে নন। এটি এক ধরনের মানসিক সমস্যা। এই সমস্যা থাকলে ভিড়ের মধ্যে, ছোট জায়গায়, গাড়ির ভিতরে, লিফটে দমবন্ধ লাগে। এর সঙ্গেই অনেকের থাকে অ্যাংজাইটি নিউরোসিস। ভিড়ের মধ্যে প্রচন্ড ভয় পেয়ে যান তারা। প্রতি বছর পুজোর সময় এই ধরনের সমস্যার শিকার অনেককেই হয়ত আমরা দেখে থাকি। কিন্তু দুর্গাপুজো তো বছরে একবারই আসবে। ভিড় বলে কি ঠাকুর দেখার মজা মিস করা যায়? এমন সমস্যা থাকলে ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসা তো করাই যায়। এছাড়া যদি ধাপে ধাপে ‘সোশ্যালাইজ’ প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গেলে ক্লস্ট্রোফোবিয়া বা অ্যাংজাইটি নিউরোসিসের সমস্যা কেটে যায়। এর অর্থ, একবারে প্রচুর ভিড়ের মধ্যে না গিয়ে অল্প অল্প করে কম ভিড়ের মধ্যে যাওয়া। এছাড়া পুজোয় একা না বেরিয়ে বন্ধু-বান্ধব বা পরিজনের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বের হন। তাদের সঙ্গে কথা বলুন। পরিচিতদের সঙ্গে হাসি-মজায় থাকলে ভয়ের কথা মন থেকে সরে যাবেই যাবে।
লিখছেন শুভজিৎ অধিকারী