অনিমেষ মণ্ডল, কাটোয়া: একদা ঢাকাই মসলিনের কদর ছিল বিশ্বজুড়ে। বাংলা থেকে আরব দুনিয়া হয়ে সেসব কাপড় রপ্তানি হতো ইওরোপে। ঢাকাই মসলিন শাড়ি এতটাই মসৃণ এবং নরম ছিল যে, একটি গোটা শাড়ি নাকি দেশলাই বাক্সে ঢুকে যেত। সেসব দিন গিয়েছে। দেশভাগের পর ঢাকাই মসলিনের সেই ঐতিহ্য এখন টিমটিম করে টিকে রয়েছে পূর্বস্থলীর মিসবাপুরে। এবং তার মূলে রয়েছেন এই গ্রামের মহিলারা। মৃতপ্রায় ঢাকাই মসলিন জামদানিতে প্রাণ সঞ্চার করছেন তাঁরা। ইদানিং মসলিন জামদানি ফের তার পুরনো জনপ্রিয়তা ফিরে পাচ্ছে। কিন্তু যাঁরা এই শাড়ি বুনছেন, তাঁদের ভাগ্যে না জুটছে সম্মান, না হচ্ছে অর্থপ্রাপ্তি।
মিসবাপুরের মহিলারা যে ঢাকাই মসলিন জামদানি সৃষ্টি করছেন, তা অনায়াসে একটি আঙটির মধ্যে দিয়ে গলে যায়। কিন্তু শিল্পীরা চান, যথাযোগ্য মজুরি। বিশ্ববিখ্যাত এই শাড়ি বোনার খরচই তুলতে পারছেন না তাঁরা। সেই সুযোগটাই নিচ্ছে নদীয়া জেলার ফুলিয়ার এক শ্রেণির মহাজনরা। তারা শিল্পীদের হাতে অল্প টাকা গুঁজে দিয়ে শাড়ি নিয়ে চলে যাচ্ছে, আর মোটা টাকায় তা দোকানে বিক্রি করছে। এইভাবে ঢাকাই মসলিন জামদানির ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। একটি শাড়িটি বুনতে যথেষ্ট ধকল পোহাতে হয় শিল্পীদের। হস্তচালিত তাঁতে বোনা হয় এই শাড়ি। আর হাতেই নকশা তুলতে হয়। একটা গোটা ঢাকাই মসলিনের কাপড় বুনতে দু’ মাস লাগে।
মিসবাপুরের শিল্পী রহিম শেখ বলেন, লক্ষ্মীপুরে আগে প্রতিটি ঘরে তাঁত ছিল। করোনা পর্বে সেসব প্রায় শেষ হতে বসেছিল। পুরুষদের অধিকাংশই কেরলে পাড়ি জমান পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে। তাঁদের ঘরনিরা এখন তাঁত বুনছেন। তবে আমাদের মতো ঢাকাই আর বেশি কেউ বোনে না। আমরা বাপ-ঠাকুরদার মুখে ঢাকার মসলিন শাড়ির গল্প শুনেছি। সেই ধারা এখনও টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছি।
পূর্ব বর্ধমান জেলায় প্রায় ৭৪ হাজার তাঁতশিল্পী রয়েছেন। যারমধ্যে কাটোয়া ও কালনা মহকুমাতেই সবচেয়ে বেশি। তবে জেলার তাঁতবলয় বলে পরিচিত পূর্বস্থলী। তাঁতিরা বলছেন, আমরা এখন আর তাঁত বুনি না। সুরাতের শাড়ি ফেরি করি। সুরাতের শাড়ি এ রাজ্যের তাঁতশিল্প ধ্বংস করে দিচ্ছে। তবুও পূর্বস্থলীর তাঁতবলয়ে ঢুঁ মারলেই এখনও পুরানো ঐতিহ্যর নির্দশন মেলে। মিসবাপুরের বধূ জাহিদা বিবি, ফরিদা বিবি, আজিদা বিবিরা বলছেন, তাঁত শিল্প শেষ হয়ে গিয়েছে। আমাদের স্বামীরা পেটের দায়ে ভিন রাজ্যে কাজ করতে গিয়েছেন। বাড়িতে শুধু শুধু বসে থাকব, তাই আমরা তাঁতঘরে আসি। এখন রেশম সূতোর দাম অত্যধিক বেড়ে গিয়েছে। আগে এক কেজি রেশম সূতোর দাম ছিল ৪৫০০-৪৬০০ টাকার মধ্যে। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮০০ টাকায়। তা সত্ত্বেও মহাজনদের ঢাকাই মসলিন জামদানি শাড়ি বিক্রি করতে হচ্ছে ২৫০০-২৮০০ টাকায়। বাজারে যা অনায়াসে পঞ্চাশ থেকে ষাট হাজার টাকায় বিক্রি হয়। আমাদের এটা বলতেও লজ্জা লাগে, কী করব! ঢাকাই বুনে সপ্তাহে পাঁচশ টাকা মজুরি পাই।
মিসবাপুরে তাঁতঘরে বসে সালেমা বিবি, নাজিলা বিবি বলেন, আমরা পুরানো ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছি, চাই রাজ্য সরকার এবার অন্তত তাঁতশিল্পে মহাজনি কারবার বন্ধ করুক। আমাদের মার্কেটিংয়ের ব্যবস্থা করে দিক। আগে আমরা সমবায়গুলির মাধ্যমে বিক্রি করার সুযোগ পেতাম। এখন সমবায়গুলি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। একটা সময় যে শাড়ি পরার জন্য রানিরা মুখিয়ে থাকতেন, সেই ঢাকাই মসলিন জামদানির পুনর্জন্ম ঘটাচ্ছেন মিসবাপুরের বধূরা।



