সংবাদদাতা, মানকর: মানকর ও সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি প্রাচীন কালীপুজো। বুদবুদের কোটার ভট্টাচার্য পরিবার ৩২৫ বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে কালীপুজোর আয়োজন করে চলেছে। এখানে মায়ের মূর্তির উচ্চতা ১৯ ফুট।
কথিত আছে, ভট্টাচার্য পরিবারের পূর্বপুরুষ মনোহর ভট্টাচার্য একটি দলের সঙ্গে গঙ্গাস্নানে কাটোয়ায় গিয়েছিলেন। পথে সেই দল একটি কালীমন্দিরে আশ্রয় নেয়। মনোহর ভট্টাচার্য স্বপ্নাদেশ পান দেবীকে পূজো করার। স্বপ্নে তিনি দেখেন, মা কালীর রূপ ধরে এসে একটি মেয়ে তাঁর বাড়ি যাওয়ার বায়না ধরেছে। তখন তিনি বলেন, তাঁরা গরিব ব্রাহ্মণ। পুজোর জোগাড় করার সামর্থ্য তাঁর নেই। মা অভয় দিয়ে বলেন, পুজোর উদ্যোগ নিলেই সব হয়ে যাবে। এরপর তিনি গ্রামে ফিরে আসেন। তাঁর বাড়ির পাশে শিবমন্দিরে বসে একদিন তিনি তামাক খাচ্ছিলেন। সেই সময় পার্শ্ববর্তী খান্ডারি গ্রাম থেকে রমকানু পান্ডে নামে এক মিস্ত্রি তাঁকে জানান, দেবী আপনাকে স্বপ্নাদেশ দিয়েছেন মা এখানে আসবেন। সেকথা শুনে অবাক হন মনোহর। কিন্তু মায়ের রূপ কী হবে? রামকানু জানান, তিনি স্বপ্নে দেবীর আদেশ পেয়েছেন। এরপর মূর্তি তৈরি করতে শুরু করেন তিনি। রামকানুর মূর্তি দেখে মনে হয় স্বপ্নাদেশের সেই মূর্তিটির মিল খুঁজে পান মনোহর। তারপর থেকেই শুরু হয় পুজো। পরিবারের সদস্যরা জানান, এখানে দেবীর পুজোর যাবতীয় আয়োজন পুরুষ ব্রাহ্মণ দিয়েই করাতে হয়। কোনো মহিলা পুজোর জোগাড়ে অংশ নিতে পারেন না। পরিবারের সদস্য সুমন ভট্টাচার্যর কথায়, মায়ের পুজোয় ২১ কেজি চালের নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। প্রাচীন রীতি মেনে দেবীকে এখানে চাল ভাজা ও বাড়ির তৈরি মালপোয়া নিবেদন করতে হয়।
মানকরের অন্যতম প্রাচীন পঞ্চকালী মায়ের পুজো। আনুমানিক ৩০০ বছরের পুরানো এই পুজো। পুজোর দায়িত্বে রয়েছেন রজক পরিবার। কথিত আছে, বহুকাল আগে এক তন্ত্রসাধক মানকরে আসেন। বর্তমানে যেখানে মন্দির সেখানে তিনি পঞ্চমুণ্ডির আসন নির্মাণ করে মাতৃসাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। মনে করা হয় মন্দিরের ডানদিকে ভৈরব তলায় রয়েছে সেই সিদ্ধাসন। সিদ্ধিলাভের পর সাধু চলে যান। বিগ্রহের দায়িত্ব দিয়ে যান তাঁর শিষ্যা পঞ্চার মাকে। মনে করা হয় পঞ্চার মা নাম থেকেই পঞ্চকালী নাম এসেছে। পঞ্চারা ছিলেন সিং উপাধিধারী। পরবর্তীকালে রজক পরিবারের পূর্বপুরুষ ভোলানাথ রজককে পঞ্চার মা বিগ্রহ দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়ে যান। সেই থেকে নিষ্ঠার সঙ্গেই রজক পরিবার দেবীর দেখাশোনা করছেন।
মানকরের বড়ো বাড়ির কালীপুজো ৫০০ বছরেরও বেশি প্রাচীন। কথিত আছে, মন্দিরের নিচেই আছে পঞ্চমুণ্ডির আসন। মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের পদধূলি ধন্য বড়ো বাড়ির কালীপুজোয় রয়েছে একাধিক ঐতিহ্য। একসময় পুজোয় মহিষ, মেষ ও ছাগ বলি হত। যদিও বর্তমানে প্রাণী বলি হয় না এখানে। বর্তমানে আখ ও চালকুমড়ো বলি হয়। পরিবারের দুই পূর্বপুরুষের কালাজ্বরে মৃত্যুর পরে এই বলি বন্ধ হয়। মৃত দুই সন্তানের মা রেনুবালা দেবী বলি বন্ধ করেন। কথিত আছে, নীলাচলে যাওয়ার সময় শ্রীচৈতন্যদেবের পায়ে কাঁটা ফোটে। শারীরিক অসুস্থতা বোধ করলে তিনি বিশ্রামের প্রয়োজন মনে করেন। সেই সময় তিনি খোঁজ পেয়েছিলেন এই মন্দিরের। যার নিচে পঞ্চমুণ্ডির আসন রয়েছে। এখানে এসেই তিনি বিশ্রাম নিয়েছিলেন।



