সৌরাংশু দেবনাথ, কলকাতা: বাঁ পায়ে গোলাপি, ডান পায়ে আকাশি রঙের জুতো। গোলগাল, নাদুসনুদুস ছেলেটার চোখেমুখে অদ্ভুত সারল্য। গাল টিপে আদর করতে মন চাইবে। তবে ব্যাট হাতে তুললেই উধাও নিষ্পাপ চাহনি। চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞাই তখন নজর কাড়ছে। পলকে কৈশোরের সীমানা পেরিয়ে অসম্ভব প্রতিভাধরে পরিণত হচ্ছে বৈভব সূর্যবংশী। শনিবার দুপুরের গনগনে গরমে যেমন ‘টং টং’ আওয়াজে অনসাইডে ক্রমাগত উড়ে গেল বল। ডিফেন্সের বালাই নেই, ব্যাট থেকে ছিটকে বেরনো বল যেন আকাশ ছুঁতে চায়। নাইটদের মুখোমুখি হওয়ার আগে রাহুল দ্রাবিড়ও ‘ফাইন টিউন’ করে দিলেন বৈভবকে। কোনও সন্দেহ নেই, রবিবারের ছুটির বিকালে ইডেনমুখী ক্রিকেটপ্রেমীর চৌম্বকীয় আকর্ষণ রাজস্থানের রয়্যালসের ১৪ বছর বয়সিই!
অথচ, কলকাতা নাইট রাইডার্সের কাছে এই ম্যাচটার অসীম গুরুত্ব। প্লে-অফের আশা পলকা দড়ির উপর ঝুলছে। পকেটে মাত্র ৯ পয়েন্ট, বাকি ৪টি ম্যাচই জিততে হবে। তার মধ্যে শেষ দুটো অ্যাওয়ে। তাই ঘরের মাঠে রাজস্থানের পর বুধবারের চেন্নাই, দুটো ম্যাচই জেতা দরকার। প্রথম চারে থাকার দৌড় থেকে ছিটকে যাওয়া বিপক্ষকে পাওয়া আপাতভাবে অবশ্যই অ্যাডভান্টেজ। কিন্তু হারানোর কিছু নেই বলেই মরণকামড় দিতে চাইবে প্রতিপক্ষ। তাছাড়া ইডেন এবার কোনওভাবেই নাইটদের দুর্গ নয়। পাঁচ ম্যাচে জয় মাত্র একটিতে। পিচ-বির্তকের আগুনও দাউদাউ করে জ্বলেছে। সুনীল নারিন ও বরুণ চক্রবর্তী, বেগুন জার্সির দুই তুরুপের তাসকে ভোঁতা দেখিয়েছে এখানেই। ‘হোম ম্যাচ’ শব্দটা সেজন্য অজিঙ্কা রাহানে ব্রিগেডের কাছে বিভ্রান্তিরই!
ডান হাতে লিউকোপ্লাস্ট আটকানো খোদ নাইট ক্যাপ্টেনকে নিয়েও থাকছে সংশয়। একা একা পিচ দেখতে যাওয়া ও কোচ চন্দ্রকান্ত পণ্ডিতের সঙ্গে আলোচনার পর গুটি গুটি পায়ে একেবারে ডানদিকের নেটে গেলেন মুম্বইকর। কিন্তু মিনিট পাঁচেকও থাকলেন না। কয়েকটা বল নকিংয়ের পরই বেরিয়ে এলেন। ব্যথার জায়গায় লাগছিল কিনা, বোঝার উপায় নেই। তবে আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। উল্টোদিকের ক্যাপ্টেনকে নিয়ে অবশ্য কোনও ধোঁয়াশা নেই। সঞ্জু স্যামসন খেলছেন না কোনওভাবেই। পেসার সন্দীপ শর্মাও নেই। রিয়ান পরাগরা যদিও ঘাম ঝরালেন। মহারণের চব্বিশ ঘণ্টা আগে রাজস্থানের যশস্বী জয়সওয়াল, জোফ্রা আর্চার থেকে শুরু করে কলকাতার আন্দ্রে রাসেল, রিঙ্কু সিং— তারকারা হোটেলে বিশ্রাম নিলেন। এই গরমে যতটা সম্ভব তরতাজা থাকার চেষ্টা আর কী!
তবে কৈশোরের তেজে বৈভব গা ঘামাল। সাইড নেটে বাঁ-হাতি স্পিনার, লেগ স্পিনারদের দুরমুশ করে প্রধান পিচের বাঁ দিকের নেটে গেল সে। সেখানে বেশ খানিকক্ষণ ওড়ানো চলল। নজর কাড়তে বাধ্য অবিশ্বাস্য পাওয়ার। একপায়ে বাঁধা ব্যান্ডেজ, দ্রাবিড় কখনও পিছনে দাঁড়িয়ে, কখনও আবার জলের ট্রে’র উপর বসে কড়া নজরদারিতে থাকলেন। বার দুয়েক আলাদা করে মিনিট দশেকের ক্লাসও নিলেন। বৈভব তখন মনোযোগী ছাত্র। পাঠশালাতে যেন আত্মস্থ করছে গুরুর বাণী। ক্রিকেট শিক্ষার্থীর যে কোনও কাঁটাতার থাকে না, সেই বার্তাও রইল। নাহলে নাইট কোচ পণ্ডিতের পায়ে হাত দিয়ে বার দুয়েক প্রণাম করবেই বা কেন!
নন্দনকানন অতীতে সাক্ষী থেকেছে অজস্র রোমাঞ্চকর ক্রিকেটীয় ফ্রেমের। কিন্তু চোদ্দ বছরের কারও ব্যাটে বিশ্বসেরাদের নতজানু হওয়া দেখেনি। সুনীল নারিন বনাম বৈভব সূর্যবংশী— ইডেনে নয়া রোমাঞ্চের প্রেক্ষাপট তৈরি! আর আপনি?