তন্ময় মল্লিক: আজ বাংলার জনগণের ভাগ্য ও নির্বাচন কমিশনের অগ্নিপরীক্ষা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে প্রকাশিত হচ্ছে প্রথম দফার চূড়ান্ত ভোটার তালিকা। শুনানির লাইনে যাঁরা ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছিলেন, তাঁরা দেশের নাগরিক কি না জানার জন্য প্রহর গুনছেন। উৎকণ্ঠায় আছেন খসড়া তালিকার বহু ‘মৃত’ ভোটারও। এই উদ্বেগ থাকত না যদি টিম জ্ঞানেশ কুমার পূর্বসূরিদের মতো এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করত। কিন্তু কমিশনের অধিকাংশ সিদ্ধান্তই বিজেপির স্বার্থে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। তাই উঠছে প্রশ্ন, কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলির মতো নির্বাচন কমিশনও কি ‘খাঁচায় বন্দি তোতাপাখি’ হয়ে যাচ্ছে?
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির ক্ষোভ নতুন কিছু নয়। এর আগেও কমিশনের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের শাসক দলের হয়ে পক্ষপাতিত্ব করার অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু, এই প্রথম কমিশনের কাজে সাধারণ মানুষ তিতিবিরক্ত। কারণ কমিশন পছন্দের ভোটার তালিকা তৈরি করতে গিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে অযথা হয়রান করেছে। নির্বাচন কমিশন যে নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে না, সেটা কেবল বিরোধী দলগুলির বা সাধারণ মানুষের অভিযোগ নয়। একই কথা মনে করছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতও। সেই কারণে কমিশনের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষমতা দিয়েছে বিচারকদের।
কমিশনের ক্ষমতা খর্ব হওয়ায় প্রচণ্ড চটেছে বঙ্গ বিজেপি। তবে, সুপ্রিম কোর্টকে আক্রমণ করতে পারছে না। ঝাল ঝাড়ছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল কংগ্রেসের উপর। বিজেপি নেতারা বলছেন, ‘অন্য সব রাজ্যে এসআইআর নিয়ে হইচই হচ্ছে না। কেবল অশান্তি হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে। এরজন্য দায়ী তৃণমূল কংগ্রেস।’ বিজেপি নেতারা ভুল কিছু বলছেন না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করে কমিশনের মুখোশ খুলে দিয়েছেন। তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন কমিশন কীভাবে বিজেপির তাঁবেদারি করছে। তাই আদালতের কাজ ব্যাহত হবে জেনেও মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য এই সিদ্ধান্ত নিতে একপ্রকার বাধ্য হয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
তবে, এই পরিস্থিতিরও সুযোগ নিতে চাইছে গেরুয়া শিবির। ভোটার তালিকায় ত্রুটি থাকলে তার দায় কমিশনের নয় বলে বিজেপি প্রচার শুরু করেছে। বিজেপি বলছে, ‘এখন সবটাই নিয়ন্ত্রণ করছে আদালত। তাই নাম বাদ গেলেও কমিশনের কিছু করার নেই।’ কিন্তু সত্যিই কি তাই?
বিচারকরা কত ভোটারের নথি যাচাই করছেন? ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ। কিন্তু ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’ ও ‘আন ম্যাপড’ মিলিয়ে কত ভোটারের নাম এসেছিল? প্রায় দেড় কোটি। এর অর্থ, প্রায় এক কোটি ‘সন্দেহজনক’ ভোটারের ভাগ্য ইতিমধ্যেই ঠিক করে ফেলেছে কমিশন। তাই ভোটার তালিকার ভুলের দায় কোনোভাবেই বিচারকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে কমিশন বা বিজেপি হাত ধুয়ে ফেলতে পারে না।
সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন, আজ বাংলায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হল কেন? এর জন্য দায়ী কে? এসআইআর পর্বের শুরুতে কমিশন ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম
বাদ দিয়েছিল। মৃত, স্থানান্তরিত এবং দু’জায়গায়
নাম থাকা ভোটারদের নাম সেই তালিকায় ছিল।
যদিও ওই তালিকায় বহু জীবিত ভোটারকে ‘মৃত’ বলে দেখানো হয়েছিল। তারপর তৈরি হল ‘আন ম্যাপড’ ভোটারের তালিকা। সংখ্যাটা প্রায় ৩১ লক্ষ। তাঁদের শুনানিতে ডাকা নিয়ে কারও আপত্তি ছিল না। কমিশন একটা কথা বলেছিল, ২০০২ সালের তালিকায় যাঁদের নাম আছে, বা যাঁদের পিতৃপুরুষের নাম আছে, তাঁরা ভোটার তালিকায় জায়গা
পাবেন। সেই সিদ্ধান্তে কমিশন অনড় থাকলে
কোনো সমস্যাই হত না। কিন্তু, সেটা হলে বিজেপির এক, দেড় কোটি নাম বাতিলের টার্গেট পূরণ
হত না। তাই তৈরি হল ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’র তালিকা। গণ্ডগোলের সূত্রপাত সেখান থেকেই। কমিশন এমন একটি অ্যাপ তৈরি করল যাতে
লক্ষ লক্ষ প্রকৃত ভোটারের নাম ‘সন্দেহজনকে’র তালিকায় ঢুকে যায়।
একটা কথা মনে রাখা দরকার, যে কোনো
কাজে প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়াটা অন্যায় নয়। কিন্তু, তাকে ‘প্রভু’ বানাতে গেলেই ঘটে বিপদ। এক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। অ্যাপের সাহায্য নিয়ে ভোটারের
নাম বাংলা থেকে ইংরেজিতে করার সময় লক্ষ
লক্ষ প্রকৃত ভোটারকে ‘সন্দেহজনক’ বানিয়ে দেওয়া হল। সেই সব নাম বাদ দিলে বিপর্যয় ছিল অনিবার্য। কারণ ভোটার কার্ড শুধু ভোটদানের ছাড়পত্র নয়, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে বিভিন্ন প্রকল্পে আবেদন করতেও লাগে এই কার্ডটি। সেকথা মাথায় রেখেই কেউ স্যালাইনের সুচ হাতে নিয়ে, কেউ অক্সিজেনের নল নাকে জড়িয়ে শুনানির লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
বাংলা দখলের জন্য এবার বহুমুখী পরিকল্পনা নিয়েছে বিজেপি। গেরুয়া শিবির মনে করছে,
৫ শতাংশ ভোট কেটে দিতে পারলেই তারা
রাজ্যের ক্ষমতা পেয়ে যাবে। তারজন্য কলকাতা
থেকে ৭ নম্বর ফর্ম পূরণ করে বিভিন্ন জেলার
বিজেপি নেতাদের পাঠানো হয়। সবচেয়ে বেশি
ফর্ম জমা দেওয়া হয়েছিল মুসলিম অধ্যুষিত
মুর্শিদাবাদ জেলায়। কারণ সংখ্যালঘুরাই টার্গেট। বিজেপি ভেবেছিল, ফর্ম জমা দিলেই লিস্ট থেকে
সেই সব নাম মুছে দেবে কমিশন। তবে, সেই
কৌশল কাজে লাগেনি। কারণ নাম বাতিলের শুনানিতে অভিযুক্ত এবং অভিযোগকারী উভয়কেই হাজির থাকতে হয়। রাজ্য নেতৃত্বের নির্দেশে
বিজেপি নেতারা ৭ নম্বর ফর্ম জমা দিলেও সশরীরে হাজির হওয়ার সাহস দেখাননি। কারণ তাঁরা খুব ভালো করেই জানেন, অভিযোগ মিথ্যে। আর অভিযোগ মিথ্যে প্রমাণ হলে অভিযোগকারীর জেলযাত্রা একপ্রকার নিশ্চিত।
অনেকে বলছেন, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো অফিসারদের বদলির ক্ষেত্রেও কমিশনের পদক্ষেপের উপর ‘সুপ্রিম নজরদারি’ দরকার। নির্বাচন ঘোষণামাত্র প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় কমিশনের হাতে। তখন কমিশনের কর্তাদের মর্জিতে হয় অফিসারদের বদলি ও শাস্তি। সেই সুযোগে বিজেপির নেতারাই বকলমে খবরদারি চালাবেন।
এই আশঙ্কা অমূলক নয়। অতীতে দেখা গিয়েছে, প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই কমিশন রাজ্য সরকারের বহু পদস্থ অফিসারকে পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্রেফ অভিযোগের ভিত্তিতেই অফিসারদের ‘গ্যারেজ’ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। অভিযোগের সত্যাসত্য বিচারের সময়টুকুও নেয়নি। কমিশনকে তার কাজের জন্য কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। আর জ্ঞানেশ কুমার বা তাঁর টিমের সদস্যদের তো নয়ই। তারজন্য আইন সংশোধন করে নির্বাচন কমিশনকে ‘রক্ষাকবচ’ দিয়ে রেখেছে নরেন্দ্র মোদির সরকার।
এর আগে নির্বাচন ঘোষণামাত্র রাজ্য পুলিশের ডিজি এবং মুখ্যসচিবকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনা এরাজ্যে ঘটেছে। এছাড়াও বহু জেলার ডিএম, এসপি, এমনকি ওসিকে নির্বাচনের যাবতীয় কাজ থেকে দূরে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও নির্বাচনে জেতার পর তাঁদের প্রায় প্রত্যেককেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুরানো পদে ফিরিয়ে এনেছেন। কিন্তু, কমিশন ‘শাস্তিমূলক’ ব্যবস্থা নিলে অফিসারদের উপর যে তাৎক্ষণিক চাপ সৃষ্টি হয়, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এবার কমিশন রাজনৈতিক প্রভুকে খুশি করতে যেভাবে একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছে তাতে রাজ্যের অফিসাররা আরও বেশি ‘হেনস্তা’ হবেন বলে আশঙ্কা রাজনৈতিক মহলের।
সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই বঙ্গ বিজেপি থেকে তাদের অপছন্দের অফিসারদের নামের একটি তালিকা কেন্দ্রের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে। তাতে কোন কোন ডিএম, এসপি এবং রাজ্যের শীর্ষ কর্তাকে নির্বাচনের আগে সরাতে হবে এবং সেখানে কাদের বসালে লাভ হবে, সেই নামও নাকি আছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নির্বাচন ঘোষণা হলেই কোন কোন এসপি, ডিএম বদলি হবেন, তার ঈঙ্গিত বঙ্গ বিজেপির নেতাদের ভাষণেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। তাঁরা প্রকাশ্য সভায় কিছু অফিসারের বিরুদ্ধে তোপ দাগছেন। লক্ষণীয় বিষয় হল, ভিডিয়ো কনফারেন্সের সময় সেই সব জেলার ডিএমকেই ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হয়েছে। ফলে মিলে যাচ্ছে অঙ্ক। তাতেই স্পষ্ট, নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি একই মুদ্রার দু’টি পিঠ।
গণতন্ত্রের ভিত্তি হল ‘অব দা পিপল, বাই দা পিপল, ফর দা পিপল’। কিন্তু, টিম জ্ঞানেশ কুমারের পদক্ষেপ দেখে অনেকেই বলছেন, জনগণের সরকার নয়, বাংলায় বিজেপির সরকার প্রতিষ্ঠাই লক্ষ্য! সেকথা মাথায় রেখেই কমিশন বাংলার জন্য নতুন নতুন নিয়ম আমদানি করছে। তারজন্য সুপ্রিম কোর্টের ধমকও খাচ্ছে। তবুও সংবিৎ ফিরছে না। কারণ এই কমিশনের কাছে গণতন্ত্র হল, ‘অব দা বিজেপি, বাই দা বিজেপি, ফর দা বিজেপি’।