প্রীতম দাশগুপ্ত: আজ বঙ্গে শেষ পর্বের ভোট। এই ভোট শুধু বাংলার নয়, ঠিক করে দেবে দেশের অভিমুখও। নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহরা, দেশকে প্রায় গেরুয়া বানিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু এই বাংলার দুর্জয় ঘাঁটিতে যে দুর্বত্তের ঠাঁই নেই— তা প্রতিদিন প্রমাণিত হয়েছে। লোকসভা আর বিধানসভা ভোট ধরলে, টানা পাঁচ বার রাজ্যে গোহারা হয়েছেন মোদি-শাহরা। ২৯ এপ্রিল আবারও এমন একটা দিন। বিজেপির পরাজয়ের ডবল হ্যাটট্রিকের হাতছানি। তাই ভোট দিন নির্ভয়ে। মনে রাখবেন, এই লড়াই কিন্তু বাঁচার লড়াই।
কেন বাঁচার লড়াই? কারণ এটা বাংলার অস্মিতার লড়াই। আমাদের সংস্কৃতি, কৃষ্টি, খাদ্যাভ্যাস—সবকিছুর লড়াই। আমরা কী খাব, কেমন পোশাক পরব, সেটা ঠিক করব আমরাই। বহিরাগত কেউ ঠিক করে দিতে পারে না আমাদের এতদিনের ভাবনাকে। আজ কেউ এসে বলবে, দেখুন আপনি যে মাছ বা মাংসটা খেতে ভালোবাসেন, সেটা না আমাদের সনাতনী ধর্মে নেই। আপনাকে নিরামিষ খেতে হবে। আপনি কী করবেন? মুখ বুঝে মেনে নেবেন? নাকি বলবেন, আমার এতদিনের অভ্যাস আমি কেন বদলাব? তাই এটা আপনার বাঁচার লড়াই। আপনি বাংলা ভাষায় কথা বলেন। সে আবার কী? ওটা তো বাংলাই নয়, ‘বাংলাদেশি’ ভাষা। বলেছেন, বিজেপি নেতারাই। ভিনরাজ্যে বাংলা ভাষায় কথা বললে জুটছে লাঞ্ছনা, অপমান, মার। ভালো লাগছে? নিজের ভাষায় কথা বললে বাংলাদেশি তকমা জুটবে? সেটা মেনে নিতে হবে? তাই এই ভোট আপনার নিজের ভাষা বাঁচানোর লড়াইয়েরও।
আপনার বাড়ির মেয়ে। আপনি তাঁকে শিক্ষিত করে তুলেছেন। বলেননি, বাড়ির বাইরে বেরনো যাবে না। চাকরি করা যাবে না। এই পোশাক পরা যাবে না। কিন্তু এখন কেউ এসে বলবে, না না এসব চলবে না। আমাদের সনাতনী ধর্ম এসব অ্যালাউ করে না। আমরা মনুবাদী। আমরা মনে করি, নারীদের স্থান বাড়ির অন্দরেই। বাইরে বেরনোর কী দরকার? সেখানে ঘোমটা দিয়ে অন্তঃপুরে পুরুষের সেবা করুন। মানতে পারবেন? আর আপনি যদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের হন, তাহলে তো কোনো কথাই নেই। আপনি যে ভারতের নাগরিক, সেটাই তো মানা যাবে না। তারপর তো পোশাক। আপনাকে এমনভাবে দেখা হবে যেন আপনি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। দেশজুড়ে ধর্মীয় হানাহানি ও বিভাজনের রাজনীতি। তাই ভোট দেওয়ার আগে ভাবতে হবে। এটা আমাদের বাঁচার লড়াই।
আমরা তো হিটলারে কথা সবাই শুনেছি। জানি। কীভাবে নাৎসিবাদ ধীরে ধীরে গোটা জার্মানিকে গ্রাস করেছিল। সেদিন যখন ওরা কমিউনিস্টদের মারতে এসেছিল, আপনি প্রতিবাদ করেননি। ভেবেছিলেন আপনি তো কমিউনিস্ট নন। এরপর একে সোশ্যালিস্ট, ইহুদিদের মারার সময়ও আপনি নীরব ছিলেন। ভেবেছিলেন, আপনার গায়ে আঁচ তো লাগবে না। কিন্তু যেদিন আপনার গায়ে সত্যিই আঁচ লাগল, সেদিন প্রতিবাদ করার কেউ ছিল না। মার্টিন নিমোলারের সেই কবিতার ভাষ্যটাই আমার প্রাসঙ্গিক মনে হল। চুপ করে থাকাটা আসলে আত্মহননেরই শামিল। আজকের বঙ্গের চেহারাটাও তেমন। আমি মুসলিমও নই। আমি নাস্তিকও তেমন একটা নই। তাহলে আমার বিপদ কী? এমন ভুলটাই করেছিলেন খ্রিস্টান ধর্মযাজক স্বয়ং নিমোলারও। তাই তাঁর আত্মোপলব্ধিও তিনি লিপিবদ্ধ করেছিলেন। মনে রাখবেন, পাশের বাড়িতে আগুন লাগলে, তার লেলিহান শিখা আপনার বাড়িকেও গ্রাস করবে। তাই ওর বাড়িতে আগুন লেগেছে, আমার কী— ভাবনাটা বিপদেরই। সেই কারণে এটা আমাদের বাঁচার লড়াই।
ছেড়ে দিন জার্মানির কথা। ওসব তো সেই তিনের দশকের কথা। আসুন সাম্প্রতিক সময়ের হাঙ্গেরির কথায়। ২০১০ থেকে সেদেশে ক্ষমতায় ছিলেন ভিক্টর অর্ব্যান। দারুন জনসমর্থন। মানুষ তাঁকে প্রায় ভগবানের জায়গাতেই বসিয়ে দিল। দীর্ঘ ১৬ বছরে তিনি কী করলেন? প্রথমে দেশের বিচার ব্যবস্থার দিকে হাত বাড়ালেন। এমন সব বিচারপতি নিয়োগ করলেন, যাঁরা আসলে তাঁর তাঁবেদার। শেষে দেশের নির্বাচন কমিশনকে হাতের পুতুলে পরিণত করলেন। কিন্তু এত কিছু করেও কি ক্ষমতা দখলে রাখা গেল? যায়নি। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদে গদি হারালেন অর্ব্যান। ভাবছেন তো! আরে এ তো আমাদের দেশের মতো কেস। আমাদের দেশেও বহু বিচারপতিকে দেখা গিয়েছে, অবসরের পর কেউ হয়েছেন রাজ্যসভার সাংসদ, কেউ বা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় কোনো কমিশনের চেয়ারম্যান। আর বর্তমান নির্বাচন কমিশনারের কথা বলার তো দরকারই নেই। জ্ঞানেশবাবু যেন পণ করেই নেমেছেন, প্রাণ যায়, পর সেবা না যায়। মানুষই কিন্তু এই অশুভ আঁতাঁত ভেঙেছে। আমাদের দেশেও সেটা সম্ভব। আর সেটা বঙ্গের ভোট থেকেই শুরু হতে পারে। তাই এই লড়াই বাঁচার লড়াই।
গোটা দেশ তাকিয়ে রয়েছে বাংলার দিকে। মোদির বিজয় রথ গ্রাস করেছে গোটা ভারতকেই। গত লোকসভা ভোটেই বিরোধীরা জোট বেঁধে তৈরি করেছিল ইন্ডিয়া। নামটাও দিয়েছিলেন তৃণমূল নেত্রী। সেই জোটের নেতাদের দিকে তাকান। তেজস্বী, অখিলেশ, কেজরিওয়াল, উদ্ধব—প্রায় সব আঞ্চলিক দলের নেতা গদিছাড়া। আর রাহুল তো লোকসভা ভোটেই ভোকাট্টা। হেমন্ত সোরেন বিজেপিকে ঠেকাতে পেরেছেন ঠিকই। কিন্তু বিরোধিতার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। লোকসভা হোক বা পঞ্চায়েত-পুরসভা অথবা বিধানসভা, কোনোবারই ট্যাঁফো করতে পারেনি বিজেপি। লোকসভা-বিধানসভা ধরলে, টানা পাঁচবার। মোদি-শাহ এই একটা জায়গাতেই বারবার গোত্তা খাচ্ছেন। তাই এবার মরিয়া তাঁরা। অনেকটাই বাপুর ‘ডু অর ডাই’ মনোভাব। বিরোধীরাও জানেন, পারলে মমতাই পারবেন। তাই তাঁরাও একজোট হয়েছেন মমতার পিছনে। প্রত্যেকেই বলেছেন, জিতবেন মমতাদি। দলের সমর্থকদের তৃণমূলের পক্ষে দাঁড়াতে আহ্বানও জানিয়েছেন। এমনকি বেশ কয়েকজন নেতা তো সরাসরি প্রচারও করেছেন। এ লড়াই তো তাঁদেরও বাঁচারও। মোদির দর্পচূর্ণ করার। আগামী লোকসভা ভোটে বাঁচার রসদ পাওয়ার। আর মোদিজি? তিনি জানেন, ২০১৪ সালের মিথ এখন আর তাঁর নেই। তবু তিনিই দলের সেরা ভোট ক্যাচার। কিন্তু বারবার চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ বাংলায়। তাঁর গায়ে পরাজয়ের স্থায়ী দাগটা তিনি মোছার চেষ্টা করছেন। সামনের বছর আবার উত্তরপ্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ ভোট। এই বাংলার ফল বিগত সময়ের মতো হলেই দ্বিগুণ উৎসাহে ঝাঁপাবেন অখিলেশ। কারণ উত্তরপ্রদেশে যোগী এমনিতেই আগের মতো নিরাপদে নেই। তাই বঙ্গ ভোট দেশের অভিমুখ ঠিক করার ভোট।
ভোট হচ্ছে চার রাজ্য ও এক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে। মনে হচ্ছে? আমার তো মনে হচ্ছে, একটা রাজ্যেই ভোট হচ্ছে। মন্ত্রী-সান্ত্রি তো বটেই, এভাবে সাঁজোয়া গাড়ির সমাবেশ কোনোদিন কেউ দেখেছে অন্য রাজ্যে। এত বাহিনী! মনে হচ্ছে ভারতের পূর্ব সীমান্তে কোনো বিদেশি শক্তি আক্রমণ করেছে। নাকি রাজ্যের মানুষ জঙ্গি! বাহিনীর সর্বাধিনায়করা বৈঠক করছেন। চলে এসেছে আড়াই লক্ষ বাহিনী। ভোট নির্বিঘ্নে হোক, এতে কোনো আপত্তি নেই। কারও নেই। কিন্তু ভাবখানা এমন দেখানো হচ্ছে যেন এতদিন ধরে যে রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জিতছেন, তার পিছনে কোনো জনসমর্থন নেই। সবটাই কারসাজি। গুজরাতে লাগাতার ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি। কারসাজি ছিল? সেখানে এভাবে বাহিনী পাঠানোর সাহস রয়েছে কমিশনের। যোগী আদিত্যনাথ পরপর জিতেছেন। রেকর্ড আসনও পেয়েছিলেন। সেখানে পাঠাতে পারবেন? মধ্যপ্রদেশে টানা ক্ষমতায় বিজেপি। কমিশনের বাড়বাড়ন্ত দেখেছেন? তাহলে শুধু এখানে কেন? পহেলগাঁও হামলার আগে এর সামান্য অংশও সেখানে পাহারা দিলে তো ওই ঘটনা ঘটত না। একজনকে হারাতে গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে এভাবে মাঠে নামতে কবে দেখেছে ভারতবাসী? তাই এই লড়াই বাঁচার। রাষ্ট্রযন্ত্রকে মুখের মতো জবাব দেওয়ার।
ভোট দিতে যাওয়ার আগে আমরা কি মনে রাখব না এসআইআরের নামে নির্যাতনের কথা? এসআইআর হোক, কে আপত্তি করেছিল? কেউ না। সকলেই বলেছিল, এত তাড়া কেন? সবকিছুরই তো একটা নিয়ম আছে। এত বড়ো কাজ করতে সময় তো লাগবে। সেটা হিসাব কষে কাজটা করুন। মোদি শোনেননি। কমিশন চালু করে দিল এসআইআর। হয়রানির একশেষ। আপনি জন্মেছেন এদেশে।
বড়ো হয়েছেন। ভোট দিয়েছেন। অথচ আপনি এখানকার ভোটার এখন নন! ভোটার প্রমাণ
করতে আপনার কালঘাম ছুটে যাচ্ছে। কেউ সফল হয়েছেন, কেউ পারেননি। মহিলা সংরক্ষণ বিল নিয়েও এমন অযথা গা-জোয়ারি করতে চেয়েছিল বিজেপি। জোর ধাক্কা খেয়েছে। এবার অহেতুক হয়রানির প্রতিবাদের ভোট। আপনার নিজের পরিচয় বজায় রাখার লড়াই।
১০০ দিনের কাজই হোক বা জল জীবন মিশন। রাজ্যের বকেয়া হাজার হাজার কোটি টাকা। টাকা না দেওয়ার পিছনে যে তেমন যুক্তিগ্রাহ্য কারণ নেই, সেটা ঠারেঠোরে মানছেও কেন্দ্র। এমনকি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত বলছে, টাকা দিন। তারপরও বাংলাকে বঞ্চনা করার টার্গেট মোদি-শাহের। রাজ্যে বন্যা হলে ফক্কা, বিহারে হলে টাকার বন্যা। বাজেটে রাজ্যের জন্য লবডঙ্কা। কিন্তু চন্দ্রবাবু নাইডু, নীতীশ কুমারের জন্য হাত একেবারে খোলা। একদিকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রীর মতো রাজ্যের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প, অন্যদিকে ধাপ্পাবাজি-জুমলা। কখনো দেব বলে না দেওয়া। কখনো টাকা ফেরত চেয়ে নেওয়া। আবার কখনো বা নাম বাদ। সবটাই আমরা দেখেছি। মনে রেখেছি। বাংলার বঞ্চনা রোখার লড়াইয়ের অন্তিম পর্ব তাই আমরা মিস করব না।