


নিজস্ব প্রতিনিধি, গঙ্গাসাগর: রাত পোহালেই মকর সংক্রান্তি। আজ বুধবার দুপুরে ১টা ১৯ মিনিট থেকে পরদিন বৃহস্পতিবার ১টা ১৯ মিনিট পর্যন্ত থাকবে মাহেন্দ্রক্ষণ। পুণ্যলাভের আশায় অসংখ্য মানুষ ভিড় জমাতে শুরু করেছেন সাগরে। রাতের ঠান্ডা উপেক্ষা করে সমুদ্র সৈকত ছাড়া, যেসব স্থান খালি ছিল সেখানেও ঘাঁটি গেড়েছেন ভিন রাজ্যের তীর্থযাত্রীরা। রাতেই শুরু হয়ে গিয়েছে নিজ নিজ ধর্মীয় গান। কম্বল ঢেকে কাঁপতে কাঁপতে বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা এক টুকরো জায়গা পেতে হন্যে হয়ে ঘুরেছেন। তবে বাড়তি ভিড় এড়াতে পুণ্যলগ্নের আগেই স্নান সেরে বাড়ি ফিরতে চাইছেন অনেকে। ভোর হতেই নেমে পড়বেন তাঁরা সাগরে। তাই মঙ্গলবার বিকেলেই সকলে চলে এসেছেন এখানে। সোমবার পর্যন্ত এসেছেন ৪৫ লক্ষ মানুষ। দাবি বিদ্যুৎমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের। এদিন এক সাংবাদিক বৈঠকে তিনি জানান, মঙ্গলবার আরও ১৫ লক্ষ মানুষ এসেছেন। অর্থাৎ, সাগর মেলায় মঙ্গলবার পর্যন্ত ৬০ লক্ষ পুণ্যার্থীর সমাবেশ ঘটে গিয়েছে।
ভিড় সামলাতে আয়োজনের খামতি নেই। নিরাপত্তাও আঁটসাঁট। তবুও ঠগ ও দুষ্কৃতীদের দৌরাত্ম্যে টাকা, মোবাইলসহ গোটা ব্যাগ খোওয়াচ্ছেন অনেক পুণ্যার্থী। গঙ্গাসাগর মেলা চত্বরে এই অপরাধে জেরবার অনেকেই। কেউ পুলিশের কাছে অভিযোগ করছেন, কেউ-বা অসহায় ও নিরুপায় হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। মঙ্গলবার সকালে যেমন মধ্যপ্রদেশ থেকে একটি দল এসেছিল সাগর মেলায়। সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে থাকা এক পুরোহিতকে দেখে গোদান করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন তাঁরা। পুরোহিতের এক সঙ্গীও ছিলেন সেখানে। ওই পুণ্যার্থীরা সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে মন্ত্র জপসহ পুজো করছিলেন। তাঁরা ওইসময়ের জন্য তাঁদের ব্যাগ রেখেছিলেন নীচে। পুজো শেষে তাঁরা দেখেন, ব্যাগ নেই! উধাও পুরোহিতের সঙ্গীটিও। এরপরই পুরোহিতকে ঘিরে ধরেন পুণ্যার্থীরা। পুরোহিত বাবাজি যথারীতি পালাবার চেষ্টা করেন। তবে পুণ্যার্থীরাও নাছোড়, ধরে ফেলেন তাঁকে। যদিও পুণ্যার্থীদের ব্যাগের ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন।
এরপর ওই পুণ্যার্থীর দল এই ব্যাপারে থানায় অভিযোগ করেন। আর পকেটমারি চলছেই। পুণ্যার্থীদের অসাবধানতার সুযোগে দুষ্কৃতীরা টাকা, মোবাইল ফোন নিয়ে চম্পট দিচ্ছে। এই প্রসঙ্গে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, এখনও পর্যন্ত মেলায় ২৫টি পকেটমারির ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত ১১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এছাড়া অতিরিক্ত ভিড়ে ৮৮৯ জন হারিয়ে গিয়েছিলেন। পুলিশ ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবকের তৎপরতায় ৮৩৫ জনকে খুঁজে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, মেলায় দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। মৃত অবস্থাতেই তাঁদের হাসপাতালে আনা হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে। একজনের বাড়ি অসমে। তাঁর নাম মিঠু মণ্ডল (৫০)। তাঁর ছেলে সাগর মণ্ডল বলেন, বাবা একাই মেলায় এসেছিলেন। পুলিশ ও হ্যাম রেডিয়ো মৃত্যুসংবাদ দিয়েছে। এদিকে হাসপাতাল সূত্রের খবর, মিঠুবাবু হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এই ব্যাপারে ময়নাতদন্তও করা হবে। মঙ্গলবার আরও এখন রোগীকে এয়ার লিফট করে হাসপাতালে পাঠানো হল। উত্তরপ্রদেশের আগ্রার বাসিন্দা রণেশ চন্দ্র শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে সাগরের অস্থায়ী হাসপাতালে ভরতি হন। তাঁকে কিছুটা সুস্থ করে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে এম আর বাঙ্গুর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এবার এই নিয়ে তৃতীয় রোগীকে এয়ার লিফট করা হল।
প্রতিবছরের মতো এবারও মেলায় এসে সাংবাদিক বৈঠক করেছেন পুরীর শংকরাচার্য স্বামী শ্রীনিশ্চলানন্দ সরস্বতী। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর বক্তব্য রাখেন তিনি। এসআইআর নিয়েও তিনি নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন। শংকরাচার্য বলেন, প্রকৃত বাসিন্দারা যাতে তাঁদের অধিকার থেকে বঞ্চিত না-হন সেদিকে নির্বাচন কমিশনকে খেয়াল রাখতে হবে। অন্যদিকে, এদিন পুণ্যস্নান করেন কেন্দ্রীয় শিক্ষা বিভাগের রাষ্ট্রমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। গঙ্গাসাগর মেলাকে ‘জাতীয় মেলা’ ঘোষণা করার ব্যাপারে কেন্দ্রের কাছে কোনও প্রস্তাব রাজ্য দেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। কেন্দ্রের সঙ্গে এই ব্যাপারে আলোচনা করারও পরামর্শ দিয়েছেন সুকান্তবাবু। তৃণমূল সাংসদ বাপি হালদার পালটা বলেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারকে অনেকবার চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু মোদি সরকার কোনও পদক্ষেপ করেনি।