তন্ত্র এক অসাধারণ সাধনা। অথচ সাধারণের কাছে তন্ত্র মানে বেশ একটা ভয়ের ব্যাপার। যা কি না প্রকৃতই তন্ত্রের পরিপন্থী। তান্ত্রিক মানে সাংঘাতিক জীব, তিনি পারেন না হেন কাজ নেই, এঁদের থেকে দূরে থাকা ভালো। সত্য হল, তন্ত্রের মাধ্যমে সংসারী মানুষের প্রভূত উপকার করা সম্ভব। মন্ত্রের সাহায্যে নিমেষের মধ্যে রাগ কমিয়ে প্রসন্নতা বৃদ্ধি করা, উদ্বেগ থেকে রেহাই পাওয়া, শরীরের পরিপাক ক্ষমতা বাড়ানো যায়। সৃজন শক্তিতে প্রাণ সঞ্চার করে এর দ্বারা গীত-বাদ্য-বাচিক-পাঠ্যজ্ঞান ইত্যাদি বহুল পরিমাণে বিকশিত করা। ব্যাধি ও দৈহিক প্রকৃতির বদল ঘটানো। যে কোনও ভয় থেকে মুক্তি। এমনকী মৃত্যু ভয় পর্যন্ত জয় করা যায়। কীভাবে? লিখেছেন সোমব্রত সরকার।
তন্ত্র মন্ত্র যন্ত্র
যা বর্ধনশীল, ক্রমশই বেড়ে চলেছে তাই হল তনু। মানুষের শরীর রোজ একটু একটু করে বেড়ে চলেছে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত শরীরের বাড়বৃদ্ধি ঘটে — এই সময়সীমায় মানুষের বর্ধনশীল দশা প্রাপ্তিটাই হল তনু। চল্লিশ পেরিয়ে যাওয়ার পর মানুষের শরীর অল্প অল্প করে অগোচরে শীর্ণ ও জীর্ণ হতে থাকে।
মানুষের শরীরের মধ্যে রয়েছে জড়তার বীজ। এই বীজকে মুক্ত করতে হয় নানান আধ্যাত্মিক ক্রিয়াচারে। শরীরকে জড়তা থেকে ত্রাণ করার, মুক্ত করার সাধন পদ্ধতিটিরই নাম হল তন্ত্র।
জড়তা কথার অর্থ স্থূলতা। তিন ধরনের আবরণ থাকে আমাদের শরীরে— স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণ। স্থূলশরীরে থাকে মোহ-মায়া, সূক্ষ্মশরীরে থাকে চেতনা — যা আমাদের বলে দেয়, আমরা কেউই আদতে শরীর নই, আমরাই পরমাত্মার স্বরূপ— জন্ম-মৃত্যুর সংসারবন্ধনে আটকে আছি বলেই আমাদের রয়েছে অনাত্মবন্ধন। অর্থাৎ আমরা কেবল রক্ত-মাংসের একটি শরীর— এ ভাবনাটাই জড়তা। মানুষের স্থূলশরীরের লক্ষণ এটাই। যখন এই জড়তা কাটতে থাকে গুরুর দেওয়া মন্ত্র সাধনায় তখনই একটু একটু করে প্রকাশ পায় আমাদের হৃদয়ে জ্যোতিস্বরূপ ব্রহ্মশক্তি।
শরীরে সূক্ষ্মতেজাত্মক অনুভূতিগুলো আসতে থাকে মন্ত্রে। তন্ত্র তাই মন্ত্রস্বরূপ। মন্ত্রের মধ্যে যখন কোনও দেবী-দেবতাকে প্রতিষ্ঠা করা হয় তখন তার মধ্যে দুটি শক্তি কার্যকরী হয়। একটা শক্তি বাচকশক্তি। মন্ত্র জপ করতে করতে যখন বাচকশক্তির বাইরে চলে যাওয়া যায় তখনই মানুষের মধ্যে জেগে ওঠে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কারণশরীর। এখানে পৌঁছলেই মন্ত্রের স্বরূপে প্রকট হন বাচ্যশক্তি। তন্ত্রশাস্ত্রে একেই বলা হয় কুলকুণ্ডলিনী। শরীরের জড়তা কাটলেই বাচ্যশক্তির স্বরূপটা প্রকাশ পায়।
শরীরের জড়তা নাশ করার একমাত্র উপায় মনন করা, চিন্তা করা। গাড়ি-বাড়ি, টাকা-পয়সার চিন্তা নয়, চিন্তা রাখতে হবে আমাদের অস্থি-মাংস ভরা লাবণ্যময় শরীরটার মধ্যে রয়েছেন শিবস্বরূপ পরমসত্তা। ওই সত্তাটিকেই কেবলমাত্র সংসারবন্ধন, ইন্দ্রিয়বন্ধন থেকে মুক্ত করতে হবে। যার মননমাত্র, চিন্তামাত্র সংসারবন্ধন, ইন্দ্রিয়বন্ধন আলগা হচ্ছে সেটিই হল মন্ত্র। তন্ত্রের সঙ্গে এই কারণেই মন্ত্র কথাটিও জড়িত।
মানুষের শরীর একটি যন্ত্রও বটে। যন্ত্রকেই মানা হচ্ছে দেবী-দেবতার প্রতীক। শাস্ত্রকারেরা বলছেন, ‘যন্ত্রে পুজো মূর্তির থেকেও বেশি প্রশস্ত। শুধু তা-ই নয়, যন্ত্র ছাড়া পুজো করলে সেখান থেকে প্রাপ্ত ফলাফল কিছু আসে না।’ তান্ত্রিকেরা এ কারণেই বললেন, ‘শরীরটাই যন্ত্রম্। গোটা বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড একটা মহাযন্ত্র। মহাযন্ত্রের রূপভেদ মানুষের শরীর। মরমিয়া সাধুগুরুরা বলে থাকেন, ‘যা নেই ব্রহ্মাণ্ডে, তা নেই (দেহ)ভাণ্ডে।’
ফুলকেও সাধকেরা বলেন, ‘যন্ত্রপুষ্প।’ তৈত্তিয়ারণ্যের খিলকাণ্ডে বলা হয়েছে, মায়ের গায়ের রং আগুনের মতো। অতসী ফুলকে সাধকেরা বলেন, ‘মায়ের ফুল। ফুলের মধ্যে শিবশক্তির একত্রবাস।’ নীলবর্ণা ফুলকেও অনেক সাধক বলে থাকেন, ‘দেবীর যন্ত্রপুষ্প।’ ফুলেও দেবীর পুজো করা চলে। ফুলের মধ্যে দিয়ে বিশেষ রকমের কিছু চেতনা দ্রুত প্রেরণ করা যায় বলেই উচ্চকোটির তান্ত্রিকগুরুরা অনেককেই সমস্যার সমাধানে মায়ের নির্মাল্যদি প্রদান করে থাকেন।
ফুলের সঙ্গে দেওয়া হয় বেলপাতা। বিল্বপত্র মানুষের তৃতীয় নয়নের প্রতীক। যাকে বলা হয়, জ্ঞানচক্ষু। জ্ঞানচক্ষুর উন্মোচন করে দেন গুরু, মন্ত্রের মধ্যেই থাকে উন্মোচনের বীজ। তন্ত্র সাধনায় বীজমন্ত্র এই কারণেই এতখানি গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের পুজোর যে ফুল— প্রতিটি ফুলের রং, গন্ধ ও রূপের মধ্যে তার অভিব্যক্তি ফুটে আছে। তন্ত্রের এ অতি গুহ্যসাধনা— ফুলের মাধ্যমে শক্তিপ্রেরণ। ফুল এ কারণেই যন্ত্রম্। ফুলের মধ্যে রয়েছে শক্তিলেখা। যন্ত্রে যখন পুজো করা হয়— এই তামার টাটে, ভূর্জপত্রে, প্রস্তর ইত্যাদিতে, সেই রেখাচিত্রের মধ্যে শক্তিকে পুটিত করেই যন্ত্রম্ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ অতি শক্তিশালী একটি মাধ্যম— যার সাহায্যে মন্ত্রময়ী দেবীর শরীরকে সাধকের আত্মার সঙ্গে এক করে দেওয়া চলে। তবে এসব ক্ষেত্রে যন্ত্রম্ কোনও বিশেষ মহাত্মার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এমনই এক ত্রিপুরসুন্দরী দেবীর যন্ত্রম্ নিত্যানন্দ প্রভু নিজের সঙ্গে কিন্তু সব সময়ের জন্য রাখতেন। যন্ত্রকে এসব কারণেই তন্ত্রশাস্ত্রে দেবতার দেহ বলা হয়েছে।
যার সাহায্যে কার্য সাধন হচ্ছে সেটি যন্ত্র। ব্যবহারিক নানান কাজে আমরা অনেক রকমের যন্ত্রাদির প্রয়োগ করে থাকি। শরীরের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ যে চালনা হয় সেগুলোও ঠিকঠাক ঘটে সেখানকার নাড়ি ও বায়ুর প্রবাহ স্বাভাবিক থাকলে। যে ব্যক্তি তাঁর শরীরের সমস্ত বৃত্তান্ত সম্পর্কে অবগত আছেন তিনিই যোগী, সাধক, তপস্বী ও তান্ত্রিক। শরীরকে ত্রাণ করা, রক্ষা করাটাই তন্ত্রের প্রধান কাজ।
তন্ত্রের সাধনা বায়ুঘটিত। বাতাস ছাড়া কিছুই করা যাবে না। প্রাণায়াম না করে কেউ যদি তীব্রভাবে ধ্যান করেন সেখানেও বায়ুর ক্রিয়াটা দরকারি।
৪৯টি বায়ু ৪৯ প্রকার গতিবিশিষ্ট। এদের পরস্পর মিশ্রণ ও মাখামাখিতে অসংখ্য প্রকার গতি বায়ুমণ্ডলে বয়ে চলেছে। তান্ত্রিক সাধুগুরুরা বাতাসের এই শব্দতরঙ্গকেই বলছেন, ‘মাতৃকার লহর।’
যখন কারও মন সাধনায় বসে এই লহরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে তখনই তরঙ্গ তুলতে থাকে। আমাদের মনে নানান ধরনের তরঙ্গ ওঠে তখনই যখন আমরা স্থির হয়ে বসতে চেষ্টা করি — জপধ্যানে ডুবতে সচেষ্ট হই। সমস্ত বায়ুর তরঙ্গের সঙ্গে আমাদের জাগতিক জীবনের নানান ওঠা-পড়া সজাগ হয়ে ওঠে বলে সুখ, দুঃখ, চিন্তা, অশ্রুর অজস্র বিকারে একটু চুপ করে দু’দণ্ড আসনেও বসতে পারি না।
মন স্থির করতে গেলেই বায়ুমণ্ডলের কম্পন সাংসারিক অনুভূতিগুলোকে আরও বেশি বেশি করে প্রকট করে দেয়। এগুলোকে তান্ত্রিক সাধক বললেন, বর্ণমালা। জপধ্যান করতে বসলেই এইসব বর্ণ সব সময়ের জন্যে মনের মধ্যে উঠে বৃত্তিরূপে আমাদের সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়া ইত্যাদি হরেক রকমের অনুভূতি দান করছে।
জপ করার মূল উদ্দেশ্য কিন্তু এটাই। বাতাসের মধ্যে যে এত বক্রগতি, বিপরীত স্রোত বইছে সেগুলোকে দূর করার জন্যেই জপ। এই জপ করতে করতেই মন্ত্র একটা সময় নিজের মধ্যে আপনিই ধ্বনিত হতে থাকে। তখন আর জপ করতে হয় না। আসনে বসলে ভেতরে নিজে থেকে জপের তরঙ্গ ওঠে। ধ্বনিটা বোঝা যায়।
অনেকদিনের অনুশীলনের ফলে এটা হয়। তান্ত্রিকেরা একেই বলছেন, ‘গুরুর দেওয়া মন্ত্র এতদিন পর এসে নাদে পরিণত হল।’ জপ করার মূল উদ্দেশ্য দেবতাকে আমন্ত্রণপূর্বক ডেকে নিয়ে আসা। জপমন্ত্রের মধ্যে নাম বা বীজ যাই থাক না কেন সেটা একটি সিদ্ধ শব্দের অন্তর্গত। গুরু এই মন্ত্র পেয়েছেন তাঁর গুরুর কাছ থেকে — গুরুর গুরু আবার পেয়েছেন তাঁর গুরুর কাছ থেকে। এভাবেই তন্ত্রের মন্ত্র প্রাচীন পরম্পরার মধ্যে দিয়ে বাচক ও বাচ্য বলে গণ্য হয়ে আসছে।
স্বভাবতই ওই মন্ত্রে যদি বিশ্বাস থাকে আর জপ করবার সঠিক পদ্ধতি যদি জানা থাকে তাহলে শব্দাত্মক ওই নাম বা বীজ কুণ্ডলিনী শক্তি থেকে উত্থিত হবেই। কুণ্ডলিনী শক্তিকেই তান্ত্রিকগুরুরা দেখছেন, মহামায়ার নামান্তর হিসেবে। কুণ্ডলিনী যখন গুরুর শেখানো পদ্ধতিতে স্পন্দিত হচ্ছে, ক্ষুব্ধ হচ্ছে, রেগে উঠছে তখনই নাদের আবির্ভাব ঘটছে।
আমাদের শরীরে মূলাধার থেকে আজ্ঞাচক্র পর্যন্ত যে ছ’টি চক্র আছে সবকটিই হল তন্ত্রের যন্ত্রম্। এই যন্ত্রগুলোকে যদি বহির্মুখ গতি দেওয়া হয় তাহলে সেগুলোই কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ-অহংকার স্বরূপ পাঁচটি বৃত্তি সৃষ্টি করবে মানুষের মধ্যে।
প্রাচীন তান্ত্রিকেরা ষড়রিপুর কথা না বলে বলতেন, ‘পঞ্চরিপু।’ কেননা ক্রোধ ও দ্বেষ বা হিংসাকে তাঁরা সমার্থক মনে করতেন। প্রাচীন তান্ত্রিকেরা বলতেন, ‘মানুষের পাঁচটি রিপু আছে যন্ত্রস্বরূপ পাঁচটি চক্রে।’ যখন এই চক্রের গতিকে আমরা অন্তর্মুখ করে নিতে পারব তখনই এগুলো তাদের সৃষ্টি ক্ষমতা হারিয়ে বসবে।
কামের জায়গায় জেগে উঠবে প্রেম, ক্রোধ সরে মাথা তুলবে স্নেহ, লোভ সরে গিয়ে সেখানে জাগবে সংযত প্রয়োজনটুকুর প্রতি লক্ষ্য, মোহ কেটে পাপড়ি মেলবে ত্যাগ, অহংকাররূপ সূর্যের অস্ত গিয়ে সেখানে জাগবে নমনীয়তার আলো। এই সমস্ত অভিপ্রায় তখনই সিদ্ধ হবে যখন আমরা জপমন্ত্রের চালনাটি ঠিকমতো শিখতে পারব।
আমাদের মেরুদণ্ডের ভেতর দু’ধারে দুটি নাড়ি আছে। বাঁ ধারের নাড়িটি স্নিগ্ধ ও শীতল বলে একে বলা হয় চন্দ্র নাড়ি, ডান ধারের নাড়িটি তপ্ত এবং উত্তেজক বলে ওটি সূর্য নাড়ি।
আমরা যখন খুব রেগেটেগে যাই তখন কিন্তু ওই ডান দিকের নাড়িতে শ্বাস চলে যায়। আমাদের নরম ও কোমল স্বভাব থাকে — যতক্ষণ পর্যন্ত শ্বাস চন্দ্র নাড়িতে বইতে থাকে।
শরীরের মধ্যে মানুষের বৃত্তির প্রবাহ এভাবেই ঘটে। এগুলো আমরা খেয়াল করি না। যোগী, তান্ত্রিকেরা দিনের বেলায় প্রখর সূর্যের তেজ যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত চন্দ্র নাড়িকে ব্যবহার করেন বলে তাঁরা অত শান্ত, সমাহিত, নির্মোহ থাকতে পারেন। সূর্যের তাপ কমে গেলে সন্ধ্যার পর থেকে তাঁরা সূর্য নাড়ির ব্যবহার করেন। জপধ্যানের প্রক্রিয়াতেও দিনে ও রাতে এই বিপরীত ধারা বজায় থাকে।
বীজমন্ত্র জপ করতে করতে যখন চন্দ্র নাড়ি ও সূর্য নাড়ির বাযু অর্থাৎ বাঁ নাক ও ডান নাক থেকে বেরনো বাতাসে একটা সমতা চলে আসে তখনই মেরুদণ্ডের মাঝখানে সুষুম্না নামে যে নাড়িটি থাকে তার মুখে একটু হলেও ধাক্কা লাগে। এই ঘটনা ঘটা মানেই শরীরে কুণ্ডলিনী চক্রের জাগরণ ঘটল। যন্ত্রম্-এ মায়ের পুজো সম্পন্ন হয়ে গেল।
এ হল তন্ত্রের একেবারে গুহ্য গোপন বিষয়। এই সাধনায় সিদ্ধ সাধকেরাই একমাত্র মানুষের হিত করতে পারেন। তাঁরা ভালো করার ক্ষমতাধারী হন। তাঁদের কথা ও সান্নিধ্যে এলেই আমাদের শরীরে শুভবোধের চিহ্নাদি ফুটে ওঠে। এজন্যই তো মরমিয়ারা বলছেন, ‘সাধু সঙ্গ বড় সঙ্গ, সঙ্গ আমার হল কই!’
গুরু ও সিদ্ধি
তন্ত্রের অতি পুরনো এক বিদ্যা স্বরোদয় শিক্ষা। এখনও অনেক পরম্পরার সাধনায় শিক্ষাক্রমটি চালু রয়েছে। নর্মদার সিদ্ধ সাধক বালানন্দ ব্রহ্মচারীজির স্বরোদয় শিক্ষাটি সম্পন্ন হয়েছিল প্রয়াগে থাকার সময়ে গৌরীশঙ্কর মহারাজের কাছে। তাঁর দীক্ষা হয়েছিল গঙ্গোনাথ পাহাড়ে স্বামী ব্রহ্মানন্দজির কাছে। বালানন্দজি দেওঘরের তপোবন পাহাড়ে যাঁদের স্বরোদয় শিক্ষা ক্রমে সাধনা শিখিয়েছিলেন তাঁদের অন্যতম হলেন পার্ষদ পূর্ণানন্দ মহারাজ। পূর্ণানন্দজিকে নেপালের রাজা একখানি অষ্টধাতুর বালা ত্রিপুরসুন্দরী মূর্তি দান করেছিলেন। ওই মূর্তিই পরবর্তী সময়ে বালানন্দ আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানকার প্রধান বিগ্রহ হয়ে ওঠে।
আশ্রমে ত্রিপুরসুন্দরী মায়ের মন্ত্রে সাধনরত ছিলেন বালানন্দজির আরেক সাক্ষাৎ শিষ্য তারানন্দ ব্রহ্মচারী। তিনি পরে রিষড়াতে প্রেম মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তারানন্দজি স্বরোদয় শাস্ত্র প্রয়োগ করে চলতেন তাঁর সাধনার ক্ষেত্রে ও দৈনন্দিন জীবনে।
শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর লক্ষ্য ও সংযম রেখে জীবন অতিবাহিত করাটাই হল স্বরোদয়ের শিক্ষা। কোথাও যাওয়ার সময়ে, শুভকাজ শুরুর আগে যদি ডান নাকে শ্বাসকে প্রবাহিত রাখা যায় তাহলে যাত্রা ও কর্ম দুটোই শুভ হবে।
যোগীরা শ্বাসের গতি অনুসারে অর্থাৎ বাম দিক না দক্ষিণ দিকে শ্বাস প্রভাবিত হচ্ছে দেখে নিয়ে সেইমতো দক্ষিণ চরণ— ডান পা বা বাঁ পা আগে রেখে চলাফেরা করেন।
স্বরোদয় সিদ্ধ তান্ত্রিকেরা সর্বসিদ্ধিদায়ক ত্রাতার ভূমিকা নিতে পারেন। এঁরা সাধারণত অল্পনিদ্রা বা নিদ্রাহীন ও অল্পাহারী বা একাহারী হয়ে থাকেন।
বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর নিদ্রা চলে গিয়েছিল ১৮৯৪ সালের কুম্ভমেলার সময় থেকে। এর পর থেকে তিনি কোনওদিন রাত্তিরে ঘুমোতেন না। প্রয়োজনও পড়ত না।
পণ্ডিচেরীর শ্রীমা গোটা রাতটা কাটিয়ে দিতেন সোফাতে বসে। এ সময়ে তিনি সাধনরত যোগীদের সাহায্য ও সহযোগিতা করতেন। অনেক সাধকই সে সময়টায় সূক্ষ্মদেহী মায়ের অস্তিত্ব টের পেতেন।
মহাত্মা রাম ঠাকুরের দীক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল কামাখ্যা মন্দিরে। তাঁর বাবা রাধামাধব বিদ্যালঙ্কার ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ তান্ত্রিক। তাঁর সাধনক্ষেত্র ফরিদপুরের ডিঙ্গামানিক গ্রামে আজও বিদ্যমান রয়েছে।
রাধামাধব বিদ্যালঙ্কারের আশ্চর্য তন্ত্রসিদ্ধি ছিল। তিনি মাঘ মাসের ভয়ানক শীতের রাত্তিরে একগলা জলে দাঁড়িয়ে বীজমন্ত্র জপ করতেন। রাধামাধব বিদ্যালঙ্কারের গুরুদেব ছিলেন কায়াকল্পী সাধু মৃত্যুঞ্জয় ন্যায়পঞ্চানন। তিনি জপসা গ্রামে দেহ রাখার সময় বালক রামকে বলে গিয়েছিলেন, ‘আমিই তোমাকে দীক্ষা দেব।’
একজন মৃত ব্যক্তি কী করে দীক্ষা দিতে পারেন — এই ভেবে ভেবেই প্রবল বৈরাগ্যে কিশোর রাম যখন ঘর ছাড়লেন তখন কামাখ্যা মায়ের মন্দিরে একদিন হঠাৎ শুনলেন সেই চেনা কণ্ঠ, ‘রাম... রাম।’
এ যে বাবার গুরুদেবের গলা! মন্দির থেকে বেরিয়ে এসে রাম দেখলেন তাঁর চেনা মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন— মৃত্যুঞ্জয় ন্যায়পঞ্চানন।
রাম ঠাকুর তাঁর কাছেই দীক্ষিত হয়ে গুরুর সঙ্গেই বহুকাল নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন। ফিরে এসে ভক্তসমাজে তিনি তাঁর গুরুদেব সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তাঁর মাথাতে মস্ত জটা, পেট যথেষ্ট স্ফীত, নাভিদেশ গভীর, দীর্ঘ বাহু, প্রশস্ত কপাল। তিনি অনঙ্গদেব।’ অর্থাৎ তাঁকে স্থূলচক্ষে সাধারণ কেউই দেখতে পাবেন না।
রাম ঠাকুর তাঁর অন্তরঙ্গ পার্ষদ মনোরঞ্জন মুখোপাধ্যায়কে বলে গিয়েছিলেন স্বরোদয় সিদ্ধির একখানি সাধারণ ব্যবহারিক ক্রম। কোনও কাজে যাওয়ার আগে ওই নির্দিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো— সহস্রার চক্র, বিশুদ্ধ চক্র, মণিপুর চক্র ইত্যাদিতে হাত ছুঁইয়ে শ্বাস চালনা করে যদি বেরনো যায় তাহলে কার্যসিদ্ধি আসবেই।
নেপাল রাজপরিবারের গুরু ছিলেন বডঢে বাবা। বিহারের পাকুর রাজপরিবারের ছোট রাজকুমার ডক্টর রামনাথ অঘোরী বাবা তাঁর শিষ্যত্ব নিয়েছিলেন। তিনি ১৮৭৩ সালে তারাপীঠ মহাশ্মশানে এসেছিলেন বামদেব বাবার কাছে তন্ত্রমতে দীক্ষিত হতে। কিন্তু শেষকালে তাঁর দীক্ষাপ্রাপ্তি ঘটে বক্রেশ্বর মহাশ্মশানে এক ছিন্নমস্তার উপাসকের কাছে। তিনি পরিপূর্ণ মুক্ত পুরুষ ছিলেন।
বক্রেশ্বর মহাশ্মশানে যখন চক্র বসত, সেখানে উপস্থিত হতেন বামদেব বাবা। রামনাথ বাবা ব্যারিস্টার ছিলেন। তিনি দীর্ঘ আয়ুর সাধক ছিলেন। ১৯৮৫ সালে একশো বারো বছর বয়সে রামনাথ বাবা দেহ রাখেন।
একশো এক বছর বয়সে কল্যাণীতে একবার তিনি বিরাট সমারোহে মা ছিন্নমস্তার পুজো করেছিলেন। তাঁর শিষ্যা মা যোগমায়া আমাকে বলেছিলেন, ‘পুজোতে একটি পাঁঠা বলি দিয়ে বাবা নিজে হাতে রান্না করে হাজার তিনেক মানুষকে একা হাতে পরিবেশন করে খাইছেছিলেন। আমরা সব দেখলুম সকলের পাতে রাশি রাশি মাংস পড়ছে! কীভাবে কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারলুম না। বাবার কাছে তাঁর গুরুদেবের মাথার খুলিটি ছিল। দেহ গেলে তিনি বাবাকে খুলি শুকিয়ে নিজের কাছে রাখতে বলেছিলেন। বাবা ওই খুলি রূপোর পাতে বাঁধিয়ে রেখেছিলেন। খুলির মন্ত্রপূত জল ছিন্নমস্তার উদ্দেশে নিবেদনের পর ওই জল দিয়ে তিনি যে কত মানুষের কত রোগ, শোক, দূর্বিপাক দূর করেছিলেন তার ইয়ত্তা নেই।’
আশ্চর্যের ব্যাপার, খুলিটি আমার দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। রামনাথ বাবা দেহ যাওয়ার আগে সেই খুলি মা যোগমায়াকে দিয়ে গিয়েছিলেন সেবাপুজোর জন্য। ওই খুলির জলে অনেক মানুষের আজও আধ্যাত্মিক সিদ্ধি ঘটছে।
মা বলেন, ‘তন্ত্রের বিদ্যা পার্থিব সমাধানের জন্য নয় রে, বেটা। ওতে কারও বাড়ি, গাড়ি, টাকা হওয়ার নয়। গ্রহবৈগুণ্যও কাটাতে পারেন না সাধক।’
তিনি বলতেন, ‘প্রকৃত সাধন স্বীয় শক্তিকে পুটিত করতে পারেন অপর কোনও শরীরে। কিন্তু ওই শরীরের যদি গ্রহণশক্তি না থাকে, কাজ করবে না কিছু। গুরুদেবকে দেখেছি কতরকমভাবে দীক্ষা দিতে! আমাকেই বাবা কোনও মন্ত্রই দেননি। আসনে বসিয়ে তাঁর দিকে কেবল এক নিমেষে চেয়ে থাকতে বললেন। বাবার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই আমার হৃদয় চক্রে দেখি— অকস্মাৎ কৃপার তরঙ্গ উদ্বেল হয়ে অঢেল করুণায় আমাকে অভিষিক্ত করে দিল!’
দর্শন, স্পর্শন, সম্ভাষণ, প্রণামের মাধ্যমেও দীক্ষা হয় তন্ত্রে। সর্বক্ষেত্রে অভিষেক লাগে না। ও সমস্ত আচারি দীক্ষা– শাক্তাভিষেক, পূর্ণাভিষেক।
আধার উপযুক্ত থাকলে সিদ্ধ গুরু সেই শরীরে কামাল করেন। অনেকেই ছোটাছুটি করেন গুরু গুরু করে— এ-গুরু ও-গুরু, এই-মন্ত্র, ওই-মন্ত্র, আচার-পুজো করতে করতে জীবন অতিবাহিত হয়ে যায়, কিন্তু প্রথম পাওয়া দীক্ষা মন্ত্রেরই স্ফূরণ ঘটে না বলে সব আটকে যায়।
উতলা হওয়াটা একেবারেই ঠিক নয়। এটা জেনে রাখা ভালো, আধার অনুযায়ী গুরু মিলবে। গুরু যদি উচ্চ আধারযুক্ত হন, শিষ্যের আধার না থাকে তাহলে শক্তিকে চক্রে অনুপ্রবিষ্ট করিয়ে দেওয়াটা — কোনও ভাবেই সম্ভবপর নয়।
মূর্তিমান কি মূর্তিময়ী গুরুশক্তি কাকে কখন কীভাবে কৃপা করবেন তা তিনিই জানেন। রবীন্দ্রনাথ সাধে কী আর লিখেছেন, ‘দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে, নইলে কি আর পারব তোমার চরণ ছুঁতে।’
মূলাধারে সহস্রারে
শিবশক্তি বর্ণিত সাধন বিষয়ক শাস্ত্রই তন্ত্র। তন্ত্রের দুটি ভাগ। একভাগে রয়েছে সাত্ত্বিক সাধনপন্থা। যাকে বলা হচ্ছে ঊর্ধ্বাম্নায় বা সুতন্ত্র। মানুষের হিত বা ভালো হতে পারে তন্ত্রগুরুর সাত্ত্বিক সাধনপন্থা বা দীর্ঘদিনের তপস্যাজনিত সিদ্ধির কারণে। এখানকার প্রধান ও একমাত্র সিদ্ধি— চক্রসিদ্ধি।
চক্র নিয়ে আমরা সকলেই কম বেশি জানি। কিন্তু আমাদের জানার সমস্তটাই বই পড়ে। তন্ত্র কখনও বইপত্র পড়ার দ্বারা সাধনা নয়, তন্ত্র করণ— ক্রিয়ার সাধনা।
ক্রিয়া করলেই ফল মেলে তন্ত্রে। মানব শরীরের ছটি সন্ধিস্থলে রয়েছে ছটি চক্র। নানাভাবে প্রচারিত হতে হতে ছটি চক্রনাম আমাদের সকলেরই প্রায় ঠোঁটস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু নাম বা চক্রের অবস্থান জানলে তো হবে না। চক্রগুলোর প্রথম দ্বার মূলাধার যাতে খোলে, আগে তার ব্যবস্থা করতে হয়।
বিবিধ উপায়ে মূলাধার খোলে। প্রবল কামনায়, প্রেমে, উন্মাদবৎ অবস্থায়, হিংসা, রাগে, ক্রোধে পর্যন্ত মূলাধার চক্র খুলে যায়। বলা ভালো যে, সমস্ত মানুষের পাশবিক প্রবৃত্তির দাপটে মূলাধার খোলে আবার বন্ধ হয়ে যায়।
মূলাধার যখন জপশক্তিতে খোলা হয় তখন তার আর বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। শ্বাস-প্রশ্বাসে জপ করতে করতে মূলাধার খোলে। সৃষ্টিশীল মানুষের মূলাধার আপনিই খুলে যায়।
গুরুর কৃপায়, স্পর্শশক্তি, দৃষ্টিশক্তিতে সমস্ত চক্রের গিঁট আলগা হতে পারে। মূলাধার খুললেই স্বাধিষ্ঠান চক্রের দরজা খোলে। কিন্তু তন্ত্রের সাধন প্রণালী শুরুই হয় নাভিচক্র থেকে।
নাভিতে থাকে কুণ্ডলিনীর আগুন। জপের সময়ে ওই আগুনকে তাতিয়ে তুলে কুণ্ডলিনীকে সক্রিয় করে হৃদয়চক্র বা অনাহত দশাতে আনা হয়।
যখন শরীরে আপনিই জপ স্পন্দিত হয় দীর্ঘক্ষণ ধরে, বুঝতে হবে বিশুদ্ধচক্র বা কণ্ঠের ক্রিয়া সজীব হয়েছে।
যে সমস্ত সঙ্গীত সাধকেরা নজর কেড়েছেন —বুঝতে হবে, কণ্ঠচক্র তাঁদের শক্তিশালী হয়েছে। কণ্ঠের ক্রিয়াতেই সৃজনশীলতা তৈরি হয়। তার জন্য সমস্ত সময় তন্ত্রের সাধনা করতে হবে— এরও অবশ্য কোনও মানে নেই।
যাঁদের শরীরে পূর্বজন্মগত কারণে সাত্ত্বিক ভাবটা বেশি থাকে তাঁদের কণ্ঠের ক্রিয়া আপনিই সজীব থাকে। যাঁদের শরীরে তামসিক ও রাজসিক বৃত্তির মাত্রা বেশি থাকে তাঁদেরই তন্ত্রের অধোন্মায় বা আসুরিক বাহ্য-বিভূতি, সিদ্ধিপ্রদ কুতন্ত্রের দিকে বাড়তি আকর্ষণ থাকে। যার মধ্যে রয়েছে অভিচার ক্রিয়াগুলো।
আমরা অনেকেই কুতন্ত্রের প্রভাবে ও প্রচারে মারণক্রিয়ার নাম জানি। তন্ত্রের ছায়াচ্ছন্ন যে সমস্ত পুঁথি —ডামর, ভূতডামর এ সবে মারণ, উচাটন, মোহন, স্তম্ভন, বশীকরণ, বাণবিদ্ধর নামধাম ও প্রয়োগ পাওয়া যায়। কিন্তু পুঁথির গায়ে অক্ষর প্রক্রিয়ার ভেতর যা সমস্ত লুকিয়ে রয়েছে— তা সিদ্ধমন্ত্র থেকে শুরু করে অভিচার বা মানুষের খারাপ করবার প্রক্রিয়াদি কিংবা ভালো করার ব্রত— সমস্তগুলোই রয়েছে নিষ্ক্রিয় করা।
এর চাবিকাঠি থাকে গুরুর হাতে। পুঁথি পড়ে মন্ত্রের প্রয়োগ করলে ফলাফল শূন্য। শুধুমাত্র মন্ত্র পড়ে গেলে হবে না, মন্ত্রযোগকে চক্রে জাগ্রত করে উচ্চারণ করলে তা অলৌকিক হয়ে উঠবে। ব্রাহ্মণের হাতে পৈতেতে জট পাকিয়ে গেল। বচসা বাঁধল জট ছাড়ানো নিয়ে দুই পুরোহিতে। বাবা লোকনাথ বললেন, ‘সোজা করে ধরে থাক দেখি। আমি গায়ত্রী পড়ে জট ছাড়িয়ে দিচ্ছি।’ মন্ত্রে চৈতন্য এলে এমনই কাজ করে। নচেৎ সমস্ত মন্ত্র বা ক্রিয়াদি শিববৎ শব হয়ে যায়।
মরা মন্ত্রে ভালো বা খারাপ কিচ্ছু হয় না। যে সমস্ত ভেলকিবাজেরা অভিচারের নামে অর্থদণ্ড করান সাধারণ মানুষের, দিশাহীন ব্যক্তিরা ছুটে মরেন এঁদের কাছে — তাঁদের অর্থক্ষয় ও ভেলকিবাজের সুযোগ মতো অর্থপ্রাপ্তি ছাড়া অতিরিক্ত কিছুই হওয়ার নয়, এটা জেনে রাখা ভালো।
তন্ত্রে ভালো বা মন্দ যা কিছুই করা হোক না কেন সাধকের মণিপুরচক্রকে অতি সক্রিয় রাখতে হবে। মণিপুর অবধি না গেলে কোনও ক্রিয়াই সফল হওয়ার নয়। যে সাধকের মণিপুর জেগে যায় তাঁরা খামোখা অভিচার বা খারাপ করতে চাইবেন না। জাগা চক্রের শক্তিতে তাঁরা অনেক কিছুই সহজেই পেয়ে যাবেন — যাকে বলা হয় যোগক্ষেম।
মারণ অর্থ বধ করে ফেলা। ক্ষুদ্র আমিত্বকে মেরে ফেলার নামই হল তন্ত্রের মারণক্রিয়া। এটা অন্নময় কোষের কাজ। মূলাধারচক্রে স্থিত কামনাদিই তন্ত্রের মারণক্রিয়া।
উচাটন হল ঊর্ধ্বে টেনে তোলা। প্রাণময় কোষকে সচল করা। ক্ষুদ্র আমি সত্তাটি মরলেই উচাটন — ঊর্ধ্বগতি। এই সত্তাতে স্থিত রয়েছে স্বাধিষ্ঠান চক্র।
মোহন অর্থাৎ মুগ্ধতা। জপধ্যানে চিত্তের বিমোহন ঘটে। এটি মনোময় কোষের কাজ। এখানেই থাকে মণিপুরচক্র। নাভি থেকেই তাই সাধনা শুরু। নাভি থেকেই ঊর্ধ্বগতি প্রাপ্ত হওয়া। চক্রের ধাপ পেরনো। মানুষ যখন চলে যান তখন নাভিপথ দিয়েই বাতাসটা বেরিয়ে যায়। যাকে বলা হয় নাভিশ্বাস। নাভিশ্বাস উঠলেই মানুষ মারা যান।
অচল করে দেওয়া হল স্তম্ভন। বাইরের সমস্ত ইন্দ্রিয় একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় তন্ত্রের স্তম্ভনক্রিয়াতে। বিজ্ঞানময় কোষের ক্রিয়া এটি। এই স্থানেই অনাহতচক্রের অবস্থান।
বশীকরণ হল হীনভূমিকে বশ করে ফেলা। আনন্দময় কোষের ক্রিয়া এখানে ঘটে। এখানেই আজ্ঞা চক্রের অবস্থান। এর আগে রয়েছে বাণবিদ্ধ। সেটি কণ্ঠক্রিয়া বা বিশুদ্ধচক্রের ক্রিয়া। প্রাণময় কোষেরই কাজ এটি। এখানকার চক্রস্থ সাধনে বাকসিদ্ধি আসে। সম্মোহিত হয়ে পড়েন মানুষ।
তন্ত্র এই অসাধারণ সাধনার সোপান। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে তন্ত্র বলতে এমন একটা ছবি ফুটে ওঠে যা কি না প্রকৃতই তন্ত্রের পরিপন্থী।
তান্ত্রিক একজন সাংঘাতিক জীব, তিনি পারেন না হেন কাজ নেই, এঁদের থেকে দূরে থাকা ভালো। ইন্দ্রিয়জ ভোগ লালসায় লাল বস্ত্র পরিহিত কিছু মানুষ তন্ত্র সম্পর্কে সাধারণের মধ্যে এই ধরনের মানসিকতা তৈরি করেছেন।
লাল কাপড়— রক্তাম্বর পরিধানের বিধান কিন্তু কোনও তন্ত্রশাস্ত্রের আদি গ্রন্থাদিতে নেই। প্রাচীন সাধকেরা আগে পুজোর সময় লালপাড়ের শ্বেতবস্ত্র ব্যবহার করতেন। বিশেষ কিছু গুহ্য তান্ত্রিক ক্রিয়ার সময় নীল, হলুদ ইত্যাদি রঞ্জিত বস্ত্র পরিধানের বিধি রয়েছে। তান্ত্রিকের রক্তবর্ণ বস্ত্র অনেক পরের দিকে কোনও কৌল তান্ত্রিকের সংযোজনই বলা চলে। যা পরে জনপ্রিয় হয়ে গুরু পরম্পরায় প্রবাহিত হয়ে গেছে।
ছ’টি চক্রের পর মস্তিষ্কের ব্রহ্মরন্ধ্রে রয়েছে সহস্রার। ব্যবহারিক প্রয়োগ না জানলেও এই চক্রের কথা প্রায় সকলেই জানেন। কিছু কিছু অনুসন্ধিৎসু মানুষ আবার ন’টি চক্রের কথাগুলোও জানেন।
অনেক সাধক নর ও খর এই দু’ভাগে মানুষের প্রভেদ করেন। কাশীর অঘোরী সাধকেরা বলেন, ‘নয়টি চক্র ভেদ না হলে নরদশা সরে না। খর যাঁরা, দেহের তিনটি চক্রকে তাঁরা কাজে লাগিয়ে কিছু বিভূতিবিদ্যা দেখাতে পারেন। খর দেহটা নর হয় আরও ছ’টি চক্রের ব্যবহার জানলে।’
বামদেব বাবার সাক্ষাৎ শিষ্য নিগমানন্দদেব যোগিগুরু নামে একটি বই লিখেছিলেন। তাতে তিনি ন’টি চক্রের কথা উল্লেখ করেছেন। বাহ্য এই ন’টি চক্র সম্পর্কে অনেকেই অবগত আছেন। কিন্তু আরও ন’টি আন্তর চক্র রয়েছে আমাদের দেহে। এর উপস্থিতি বোঝা যায় একমাত্র সাধনার দ্বারাই।
জপ সাধনায় যখন বৈখরী বা মন্ত্রবীজ বাঙ্ময় হয়ে ফুটে ওঠে তখন এই নব চক্রগুলোর অস্তিত্ব ধরা পড়ে। শরীরের ভেতর দিক থেকে বাইরের দিকে এই চক্রগুলো প্রকাশিত হতে থাকে। গোপন এই চক্র বৃত্তান্ত কেবল গুরু পরম্পরার মধ্যে সীমাবদ্ধ বলেই এগুলো সম্পর্কে কিছু বলা গেল না। তবে এর বাইরেও আরও কিছু সাধারণ অগোচর চক্র রয়েছে, যেমন — সোমচক্র, বৈন্দবচক্র, জ্ঞানচক্র ইত্যাদি।
সবগুলোর অস্তিত্ব গভীর ধ্যানসাধনার ভেতর ধরা পড়ে। এইসব চক্র ক্রম সাধারণ বৃত্তে আলোচনার বিষয়বস্তু নয়। তন্ত্রের শক্তিশালী ও নিগূঢ়ী পর্যায় হল চক্র চালনা। উপযুক্ত অধিকারী না হলে এসব বোঝা চলে না।
আমি কিছু সময়ের জন্য শ্রীবিদ্যা ক্রমের মহাসাধিকা শ্রীজির সংস্পর্শে আসতে পেরেছিলাম। একদিন কথা প্রসঙ্গে শ্রীজি মধ্যপ্রদেশের সাতনার জঙ্গলে মটরি বাবার কাছে তাঁর শ্রীবিদ্যার পাঠ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বললেন, ‘দেহের নিম্নস্থ পুচ্ছাস্থিতে রয়েছে সর্বানন্দময় চক্র। সেখান থেকেই মানুষের ভোগকলার বিকাশ। কলার নীচস্থ বিকাশে ভোগ। কলা ওপরে তুলতে জানলে তার অমৃতময় প্রকাশ। সেখানেই শ্রীবিদ্যার বীজকে প্রথমে জাগ্রত করতে হয়। বীজ জাগলে ত্রিকাস্থি অঞ্চলে সর্বসিদ্ধিপদ চক্রে শক্তির প্রকাশ ঘটে। নাভি অঞ্চলে বীজধ্বনি ত্রিপুরসিদ্ধা দেবীর রূপ নেওয়ার পরে সেখানে জাগে সর্বরোগহর চক্র। এরপর সর্বরক্ষাকর চক্রে শ্রীবিদ্যার দেবী শক্তি ত্রিপুরমালিনী আবির্ভূতা হন।’
শ্রীজির কথাতেই ধরলাম শ্রীকুলের সাধন ধারার চক্র পর্যায় এগুলো। বুঝলাম তখনই — শুধু চক্র চক্র করে লাফিয়ে কোনও লাভ নেই। যদি না গুরু এগুলোকে সাধন তত্ত্ব ব্যক্ত করতে গিয়ে শিষ্যের কাছে বোধগম্য না করে তোলেন।
তন্ত্রের সাধনের আবার দুটি পর্যায় ক্রম রয়েছে। আগম ও নিগম। যেখানে শিব বলছেন, পার্বতী শুনছেন সেগুলো আগমশাস্ত্র — পার্বতী যেগুলো বলছেন, শিব শুনছেন সেগুলো নিগমশাস্ত্র। সাধন শাস্ত্রের এই ভাগ থেকেই তন্ত্রবিদ্যাতে ভৈরব ভৈরবীর আলাদা সন্মানশিখাটি উস্কে উঠেছে।
তন্ত্রে নারী
নারীগুরুরাও যথেষ্ট সম্মাননীয়া, মর্যাদাপূর্ণা ও অলৌকিক কার্যবিধিতেও সাধনা করেই শক্তিশালিনী হয়ে উঠেছেন ক্রমে ক্রমেই।
মাতৃসাধক রামপ্রসাদ অনুভব করেছেন, ‘কে জানে রে কালী কেমন, ষড়দর্শনে পায় না দর্শন, ...তাঁকে মূলাধারে সহস্রারে, সদা যোগি করে মনন।’
সাধনরহস্য ও মানবকল্যাণ
কলকাতা বৈঠকখানা বাজারের অধিবাসী সুপণ্ডিত এবং প্রবীণ তন্ত্রসাধক কেনারাম ভট্টাচার্যের কাছে শ্রীরামকৃষ্ণের মন্ত্রদীক্ষা হয়েছিল ১৮৫৬ সালে।
রানি রাসমনির শরীরত্যাগের পর ভৈরবী মাতা যোগেশ্বরী এলেন কাশী থেকে শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনকালের গুরু হয়ে।
যোগেশ্বরী মা চৌষট্টি তন্ত্রে সিদ্ধা ছিলেন। সিদ্ধ তান্ত্রিক সাধকেরা বলেন, ‘চৌষট্টি তন্ত্র দিয়ে সংসারকে বঞ্চনা করা হয়েছে, প্রলোভিত করা হয়েছে মানুষকে, যাতে লোভে পড়ে সকলে তন্ত্রের চর্চার দিকে ঝুঁকে পড়েন। সবটাই মহামায়ার কারসাজি। তিনিই জগতকে ভোলানোর জন্য শিবকে দিয়ে এই সমস্ত বিদ্যা উপদেশ দিতে প্রলুব্ধ করেছিলেন।’
তন্ত্রের যাবতীয় মায়াবিদ্যাকে বলা হচ্ছে, শম্বরবিদ্যা। এগুলো সম্মোহন বা মোহিনীমায়ার নামান্তর। কামাখ্যার তান্ত্রিকেরা একটা সময় পর্যন্ত মোহিনীবিদ্যাতে বেশ পারদর্শী ছিলেন।
সুরসুন্দরী, মনোহরা, কনকবতী, কামেশ্বরী, রতিসুন্দরী, পদ্মিনী, নটিনী ও মধুমতী — ভগবতী মায়ের এই আট জন প্রধানা যোগিনীর সাধনা করতে হয় মাসাধিক কাল ধরে মহাশ্মশানে। গুহ্য জপ, পুজো ও করণ দিয়ে গুরুর সহায়তায় এ পুজো নিষ্ঠাভরে করলে যোগিনীদের দেখা মেলে। তাঁরা তখন সাধকদের নানান সমস্যার সমাধান করে দেন। জাগতিক চাহিদা মেটাতে যোগিনীদের সহায়তা নেন সাধকেরা। এঁরাই আবার সাধকদের পরীক্ষা করবার জন্য মাঝে মাঝে বিপাকে ফেলে দেন।
যোগিনীজাল শম্বর বলে দুর্লভ এক তন্ত্রের পুঁথি আছে। এই পুঁথিটি নকল করবার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। কামাখ্যার মোহিনী তান্ত্রিক জটাধারী বাবার শিষ্যা রাজরাপ্পার যোগিনী মাঈ নানান শম্বরবিদ্যাতে পারদর্শী ছিলেন। শরীর হালকা করে জলের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে তাঁকে আমি স্বচক্ষে দেখেছি। তাঁর মুখেই শুনি তন্ত্রের নানান নিধিবিদ্যার কথা।
কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে যেসব বিদ্যা প্রয়োগ করা হয়, তাই নিধিবিদ্যা। সিদ্ধিভৈরব, বটুকভৈরব, কঙ্কালভৈরব, কালাগ্নিভৈরব, যোগিনীভৈরব, মহাভৈরব, শক্তিভৈরব এসব সাধনার পেছনে মূল যে বিষয় — উদ্দেশ্য সাধন।
সমুদ্রবিদ্যা বলে একধরনের বিদ্যা রয়েছে যার প্রয়োগে জাগ্রত মানুষকে অচেতন করে ফেলা যায়। একেই বলে মহাসম্মোহন। কামিকবিদ্যাও তন্ত্রের একটি শাখা। যে কোনও কামনা পূরণের জন্য এর প্রয়োগ ঘটানো হয়।
তন্ত্রের প্রচার ও সমাদর ক্ষেত্রকে তিনটি ক্রান্তা বা শাখাতে ভাগ করেছিলেন তন্ত্রাচার্যরাই। বিন্ধ্যাপর্বতমালার পাদদেশ থেকে চট্টল বা চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিষ্ণুক্রান্তার সীমা। অশ্বক্রান্তার সীমা বিন্ধ্যপর্বত থেকে মহাচীন পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এই সীমানার মধ্যে নেপাল সহ পার্বত্য দেশগুলোও পড়ে। রথক্রান্তার বিস্তৃতি আরও ব্যাপক — বিন্ধ্যগিরি দিয়ে সাগরপারের কাম্বোজ, জাভা পর্যন্ত।
দক্ষিণাত্যের বীজাপুর নগরে আঠারো শতকের প্রথম ভাগে জন্মেছিলেন ভাস্কর রায়। তাঁর তন্ত্রগুরু ছিলেন সুরাটের শিবদত্ত শুল্ক। তিনিই তাঁকে পূর্ণাভিষেক দেন। তাঁর তান্ত্রিক সন্ন্যাসনাম হয় ভাস্করানন্দ। তন্ত্র সাধনায় সিদ্ধির পর তিনি তন্ত্রশাস্ত্রের ওপর লেখালেখি শুরু করেন। চণ্ডীর টীকা, তান্ত্রিক উপনিষদগুল?
তন্ত্র এক অসাধারণ সাধনা। অথচ সাধারণের কাছে তন্ত্র মানে বেশ একটা ভয়ের ব্যাপার। যা কি না প্রকৃতই তন্ত্রের পরিপন্থী। তান্ত্রিক মানে সাংঘাতিক জীব, তিনি পারেন না হেন কাজ নেই, এঁদের থেকে দূরে থাকা ভালো। সত্য হল, তন্ত্রের মাধ্যমে সংসারী মানুষের প্রভূত উপকার করা সম্ভব। মন্ত্রের সাহায্যে নিমেষের মধ্যে রাগ কমিয়ে প্রসন্নতা বৃদ্ধি করা, উদ্বেগ থেকে রেহাই পাওয়া, শরীরের পরিপাক ক্ষমতা বাড়ানো যায়। সৃজন শক্তিতে প্রাণ সঞ্চার করে এর দ্বারা গীত-বাদ্য-বাচিক-পাঠ্যজ্ঞান ইত্যাদি বহুল পরিমাণে বিকশিত করা। ব্যাধি ও দৈহিক প্রকৃতির বদল ঘটানো। যে কোনও ভয় থেকে মুক্তি। এমনকী মৃত্যু ভয় পর্যন্ত জয় করা যায়। কীভাবে? লিখেছেন সোমব্রত সরকার।
তন্ত্র মন্ত্র যন্ত্র
যা বর্ধনশীল, ক্রমশই বেড়ে চলেছে তাই হল তনু। মানুষের শরীর রোজ একটু একটু করে বেড়ে চলেছে। চল্লিশ বছর পর্যন্ত শরীরের বাড়বৃদ্ধি ঘটে — এই সময়সীমায় মানুষের বর্ধনশীল দশা প্রাপ্তিটাই হল তনু। চল্লিশ পেরিয়ে যাওয়ার পর মানুষের শরীর অল্প অল্প করে অগোচরে শীর্ণ ও জীর্ণ হতে থাকে।
মানুষের শরীরের মধ্যে রয়েছে জড়তার বীজ। এই বীজকে মুক্ত করতে হয় নানান আধ্যাত্মিক ক্রিয়াচারে। শরীরকে জড়তা থেকে ত্রাণ করার, মুক্ত করার সাধন পদ্ধতিটিরই নাম হল তন্ত্র।
জড়তা কথার অর্থ স্থূলতা। তিন ধরনের আবরণ থাকে আমাদের শরীরে— স্থূল, সূক্ষ্ম ও কারণ। স্থূলশরীরে থাকে মোহ-মায়া, সূক্ষ্মশরীরে থাকে চেতনা — যা আমাদের বলে দেয়, আমরা কেউই আদতে শরীর নই, আমরাই পরমাত্মার স্বরূপ— জন্ম-মৃত্যুর সংসারবন্ধনে আটকে আছি বলেই আমাদের রয়েছে অনাত্মবন্ধন। অর্থাৎ আমরা কেবল রক্ত-মাংসের একটি শরীর— এ ভাবনাটাই জড়তা। মানুষের স্থূলশরীরের লক্ষণ এটাই। যখন এই জড়তা কাটতে থাকে গুরুর দেওয়া মন্ত্র সাধনায় তখনই একটু একটু করে প্রকাশ পায় আমাদের হৃদয়ে জ্যোতিস্বরূপ ব্রহ্মশক্তি।
শরীরে সূক্ষ্মতেজাত্মক অনুভূতিগুলো আসতে থাকে মন্ত্রে। তন্ত্র তাই মন্ত্রস্বরূপ। মন্ত্রের মধ্যে যখন কোনও দেবী-দেবতাকে প্রতিষ্ঠা করা হয় তখন তার মধ্যে দুটি শক্তি কার্যকরী হয়। একটা শক্তি বাচকশক্তি। মন্ত্র জপ করতে করতে যখন বাচকশক্তির বাইরে চলে যাওয়া যায় তখনই মানুষের মধ্যে জেগে ওঠে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কারণশরীর। এখানে পৌঁছলেই মন্ত্রের স্বরূপে প্রকট হন বাচ্যশক্তি। তন্ত্রশাস্ত্রে একেই বলা হয় কুলকুণ্ডলিনী। শরীরের জড়তা কাটলেই বাচ্যশক্তির স্বরূপটা প্রকাশ পায়।
শরীরের জড়তা নাশ করার একমাত্র উপায় মনন করা, চিন্তা করা। গাড়ি-বাড়ি, টাকা-পয়সার চিন্তা নয়, চিন্তা রাখতে হবে আমাদের অস্থি-মাংস ভরা লাবণ্যময় শরীরটার মধ্যে রয়েছেন শিবস্বরূপ পরমসত্তা। ওই সত্তাটিকেই কেবলমাত্র সংসারবন্ধন, ইন্দ্রিয়বন্ধন থেকে মুক্ত করতে হবে। যার মননমাত্র, চিন্তামাত্র সংসারবন্ধন, ইন্দ্রিয়বন্ধন আলগা হচ্ছে সেটিই হল মন্ত্র। তন্ত্রের সঙ্গে এই কারণেই মন্ত্র কথাটিও জড়িত।
মানুষের শরীর একটি যন্ত্রও বটে। যন্ত্রকেই মানা হচ্ছে দেবী-দেবতার প্রতীক। শাস্ত্রকারেরা বলছেন, ‘যন্ত্রে পুজো মূর্তির থেকেও বেশি প্রশস্ত। শুধু তা-ই নয়, যন্ত্র ছাড়া পুজো করলে সেখান থেকে প্রাপ্ত ফলাফল কিছু আসে না।’ তান্ত্রিকেরা এ কারণেই বললেন, ‘শরীরটাই যন্ত্রম্। গোটা বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড একটা মহাযন্ত্র। মহাযন্ত্রের রূপভেদ মানুষের শরীর। মরমিয়া সাধুগুরুরা বলে থাকেন, ‘যা নেই ব্রহ্মাণ্ডে, তা নেই (দেহ)ভাণ্ডে।’
ফুলকেও সাধকেরা বলেন, ‘যন্ত্রপুষ্প।’ তৈত্তিয়ারণ্যের খিলকাণ্ডে বলা হয়েছে, মায়ের গায়ের রং আগুনের মতো। অতসী ফুলকে সাধকেরা বলেন, ‘মায়ের ফুল। ফুলের মধ্যে শিবশক্তির একত্রবাস।’ নীলবর্ণা ফুলকেও অনেক সাধক বলে থাকেন, ‘দেবীর যন্ত্রপুষ্প।’ ফুলেও দেবীর পুজো করা চলে। ফুলের মধ্যে দিয়ে বিশেষ রকমের কিছু চেতনা দ্রুত প্রেরণ করা যায় বলেই উচ্চকোটির তান্ত্রিকগুরুরা অনেককেই সমস্যার সমাধানে মায়ের নির্মাল্যদি প্রদান করে থাকেন।
ফুলের সঙ্গে দেওয়া হয় বেলপাতা। বিল্বপত্র মানুষের তৃতীয় নয়নের প্রতীক। যাকে বলা হয়, জ্ঞানচক্ষু। জ্ঞানচক্ষুর উন্মোচন করে দেন গুরু, মন্ত্রের মধ্যেই থাকে উন্মোচনের বীজ। তন্ত্র সাধনায় বীজমন্ত্র এই কারণেই এতখানি গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের পুজোর যে ফুল— প্রতিটি ফুলের রং, গন্ধ ও রূপের মধ্যে তার অভিব্যক্তি ফুটে আছে। তন্ত্রের এ অতি গুহ্যসাধনা— ফুলের মাধ্যমে শক্তিপ্রেরণ। ফুল এ কারণেই যন্ত্রম্। ফুলের মধ্যে রয়েছে শক্তিলেখা। যন্ত্রে যখন পুজো করা হয়— এই তামার টাটে, ভূর্জপত্রে, প্রস্তর ইত্যাদিতে, সেই রেখাচিত্রের মধ্যে শক্তিকে পুটিত করেই যন্ত্রম্ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ অতি শক্তিশালী একটি মাধ্যম— যার সাহায্যে মন্ত্রময়ী দেবীর শরীরকে সাধকের আত্মার সঙ্গে এক করে দেওয়া চলে। তবে এসব ক্ষেত্রে যন্ত্রম্ কোনও বিশেষ মহাত্মার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এমনই এক ত্রিপুরসুন্দরী দেবীর যন্ত্রম্ নিত্যানন্দ প্রভু নিজের সঙ্গে কিন্তু সব সময়ের জন্য রাখতেন। যন্ত্রকে এসব কারণেই তন্ত্রশাস্ত্রে দেবতার দেহ বলা হয়েছে।
যার সাহায্যে কার্য সাধন হচ্ছে সেটি যন্ত্র। ব্যবহারিক নানান কাজে আমরা অনেক রকমের যন্ত্রাদির প্রয়োগ করে থাকি। শরীরের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ যে চালনা হয় সেগুলোও ঠিকঠাক ঘটে সেখানকার নাড়ি ও বায়ুর প্রবাহ স্বাভাবিক থাকলে। যে ব্যক্তি তাঁর শরীরের সমস্ত বৃত্তান্ত সম্পর্কে অবগত আছেন তিনিই যোগী, সাধক, তপস্বী ও তান্ত্রিক। শরীরকে ত্রাণ করা, রক্ষা করাটাই তন্ত্রের প্রধান কাজ।
তন্ত্রের সাধনা বায়ুঘটিত। বাতাস ছাড়া কিছুই করা যাবে না। প্রাণায়াম না করে কেউ যদি তীব্রভাবে ধ্যান করেন সেখানেও বায়ুর ক্রিয়াটা দরকারি।
৪৯টি বায়ু ৪৯ প্রকার গতিবিশিষ্ট। এদের পরস্পর মিশ্রণ ও মাখামাখিতে অসংখ্য প্রকার গতি বায়ুমণ্ডলে বয়ে চলেছে। তান্ত্রিক সাধুগুরুরা বাতাসের এই শব্দতরঙ্গকেই বলছেন, ‘মাতৃকার লহর।’
যখন কারও মন সাধনায় বসে এই লহরে আক্রান্ত হয়ে পড়ে তখনই তরঙ্গ তুলতে থাকে। আমাদের মনে নানান ধরনের তরঙ্গ ওঠে তখনই যখন আমরা স্থির হয়ে বসতে চেষ্টা করি — জপধ্যানে ডুবতে সচেষ্ট হই। সমস্ত বায়ুর তরঙ্গের সঙ্গে আমাদের জাগতিক জীবনের নানান ওঠা-পড়া সজাগ হয়ে ওঠে বলে সুখ, দুঃখ, চিন্তা, অশ্রুর অজস্র বিকারে একটু চুপ করে দু’দণ্ড আসনেও বসতে পারি না।
মন স্থির করতে গেলেই বায়ুমণ্ডলের কম্পন সাংসারিক অনুভূতিগুলোকে আরও বেশি বেশি করে প্রকট করে দেয়। এগুলোকে তান্ত্রিক সাধক বললেন, বর্ণমালা। জপধ্যান করতে বসলেই এইসব বর্ণ সব সময়ের জন্যে মনের মধ্যে উঠে বৃত্তিরূপে আমাদের সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়া ইত্যাদি হরেক রকমের অনুভূতি দান করছে।
জপ করার মূল উদ্দেশ্য কিন্তু এটাই। বাতাসের মধ্যে যে এত বক্রগতি, বিপরীত স্রোত বইছে সেগুলোকে দূর করার জন্যেই জপ। এই জপ করতে করতেই মন্ত্র একটা সময় নিজের মধ্যে আপনিই ধ্বনিত হতে থাকে। তখন আর জপ করতে হয় না। আসনে বসলে ভেতরে নিজে থেকে জপের তরঙ্গ ওঠে। ধ্বনিটা বোঝা যায়।
অনেকদিনের অনুশীলনের ফলে এটা হয়। তান্ত্রিকেরা একেই বলছেন, ‘গুরুর দেওয়া মন্ত্র এতদিন পর এসে নাদে পরিণত হল।’ জপ করার মূল উদ্দেশ্য দেবতাকে আমন্ত্রণপূর্বক ডেকে নিয়ে আসা। জপমন্ত্রের মধ্যে নাম বা বীজ যাই থাক না কেন সেটা একটি সিদ্ধ শব্দের অন্তর্গত। গুরু এই মন্ত্র পেয়েছেন তাঁর গুরুর কাছ থেকে — গুরুর গুরু আবার পেয়েছেন তাঁর গুরুর কাছ থেকে। এভাবেই তন্ত্রের মন্ত্র প্রাচীন পরম্পরার মধ্যে দিয়ে বাচক ও বাচ্য বলে গণ্য হয়ে আসছে।
স্বভাবতই ওই মন্ত্রে যদি বিশ্বাস থাকে আর জপ করবার সঠিক পদ্ধতি যদি জানা থাকে তাহলে শব্দাত্মক ওই নাম বা বীজ কুণ্ডলিনী শক্তি থেকে উত্থিত হবেই। কুণ্ডলিনী শক্তিকেই তান্ত্রিকগুরুরা দেখছেন, মহামায়ার নামান্তর হিসেবে। কুণ্ডলিনী যখন গুরুর শেখানো পদ্ধতিতে স্পন্দিত হচ্ছে, ক্ষুব্ধ হচ্ছে, রেগে উঠছে তখনই নাদের আবির্ভাব ঘটছে।
আমাদের শরীরে মূলাধার থেকে আজ্ঞাচক্র পর্যন্ত যে ছ’টি চক্র আছে সবকটিই হল তন্ত্রের যন্ত্রম্। এই যন্ত্রগুলোকে যদি বহির্মুখ গতি দেওয়া হয় তাহলে সেগুলোই কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ-অহংকার স্বরূপ পাঁচটি বৃত্তি সৃষ্টি করবে মানুষের মধ্যে।
প্রাচীন তান্ত্রিকেরা ষড়রিপুর কথা না বলে বলতেন, ‘পঞ্চরিপু।’ কেননা ক্রোধ ও দ্বেষ বা হিংসাকে তাঁরা সমার্থক মনে করতেন। প্রাচীন তান্ত্রিকেরা বলতেন, ‘মানুষের পাঁচটি রিপু আছে যন্ত্রস্বরূপ পাঁচটি চক্রে।’ যখন এই চক্রের গতিকে আমরা অন্তর্মুখ করে নিতে পারব তখনই এগুলো তাদের সৃষ্টি ক্ষমতা হারিয়ে বসবে।
কামের জায়গায় জেগে উঠবে প্রেম, ক্রোধ সরে মাথা তুলবে স্নেহ, লোভ সরে গিয়ে সেখানে জাগবে সংযত প্রয়োজনটুকুর প্রতি লক্ষ্য, মোহ কেটে পাপড়ি মেলবে ত্যাগ, অহংকাররূপ সূর্যের অস্ত গিয়ে সেখানে জাগবে নমনীয়তার আলো। এই সমস্ত অভিপ্রায় তখনই সিদ্ধ হবে যখন আমরা জপমন্ত্রের চালনাটি ঠিকমতো শিখতে পারব।
আমাদের মেরুদণ্ডের ভেতর দু’ধারে দুটি নাড়ি আছে। বাঁ ধারের নাড়িটি স্নিগ্ধ ও শীতল বলে একে বলা হয় চন্দ্র নাড়ি, ডান ধারের নাড়িটি তপ্ত এবং উত্তেজক বলে ওটি সূর্য নাড়ি।
আমরা যখন খুব রেগেটেগে যাই তখন কিন্তু ওই ডান দিকের নাড়িতে শ্বাস চলে যায়। আমাদের নরম ও কোমল স্বভাব থাকে — যতক্ষণ পর্যন্ত শ্বাস চন্দ্র নাড়িতে বইতে থাকে।
শরীরের মধ্যে মানুষের বৃত্তির প্রবাহ এভাবেই ঘটে। এগুলো আমরা খেয়াল করি না। যোগী, তান্ত্রিকেরা দিনের বেলায় প্রখর সূর্যের তেজ যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত চন্দ্র নাড়িকে ব্যবহার করেন বলে তাঁরা অত শান্ত, সমাহিত, নির্মোহ থাকতে পারেন। সূর্যের তাপ কমে গেলে সন্ধ্যার পর থেকে তাঁরা সূর্য নাড়ির ব্যবহার করেন। জপধ্যানের প্রক্রিয়াতেও দিনে ও রাতে এই বিপরীত ধারা বজায় থাকে।
বীজমন্ত্র জপ করতে করতে যখন চন্দ্র নাড়ি ও সূর্য নাড়ির বাযু অর্থাৎ বাঁ নাক ও ডান নাক থেকে বেরনো বাতাসে একটা সমতা চলে আসে তখনই মেরুদণ্ডের মাঝখানে সুষুম্না নামে যে নাড়িটি থাকে তার মুখে একটু হলেও ধাক্কা লাগে। এই ঘটনা ঘটা মানেই শরীরে কুণ্ডলিনী চক্রের জাগরণ ঘটল। যন্ত্রম্-এ মায়ের পুজো সম্পন্ন হয়ে গেল।
এ হল তন্ত্রের একেবারে গুহ্য গোপন বিষয়। এই সাধনায় সিদ্ধ সাধকেরাই একমাত্র মানুষের হিত করতে পারেন। তাঁরা ভালো করার ক্ষমতাধারী হন। তাঁদের কথা ও সান্নিধ্যে এলেই আমাদের শরীরে শুভবোধের চিহ্নাদি ফুটে ওঠে। এজন্যই তো মরমিয়ারা বলছেন, ‘সাধু সঙ্গ বড় সঙ্গ, সঙ্গ আমার হল কই!’
গুরু ও সিদ্ধি
তন্ত্রের অতি পুরনো এক বিদ্যা স্বরোদয় শিক্ষা। এখনও অনেক পরম্পরার সাধনায় শিক্ষাক্রমটি চালু রয়েছে। নর্মদার সিদ্ধ সাধক বালানন্দ ব্রহ্মচারীজির স্বরোদয় শিক্ষাটি সম্পন্ন হয়েছিল প্রয়াগে থাকার সময়ে গৌরীশঙ্কর মহারাজের কাছে। তাঁর দীক্ষা হয়েছিল গঙ্গোনাথ পাহাড়ে স্বামী ব্রহ্মানন্দজির কাছে। বালানন্দজি দেওঘরের তপোবন পাহাড়ে যাঁদের স্বরোদয় শিক্ষা ক্রমে সাধনা শিখিয়েছিলেন তাঁদের অন্যতম হলেন পার্ষদ পূর্ণানন্দ মহারাজ। পূর্ণানন্দজিকে নেপালের রাজা একখানি অষ্টধাতুর বালা ত্রিপুরসুন্দরী মূর্তি দান করেছিলেন। ওই মূর্তিই পরবর্তী সময়ে বালানন্দ আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানকার প্রধান বিগ্রহ হয়ে ওঠে।
আশ্রমে ত্রিপুরসুন্দরী মায়ের মন্ত্রে সাধনরত ছিলেন বালানন্দজির আরেক সাক্ষাৎ শিষ্য তারানন্দ ব্রহ্মচারী। তিনি পরে রিষড়াতে প্রেম মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তারানন্দজি স্বরোদয় শাস্ত্র প্রয়োগ করে চলতেন তাঁর সাধনার ক্ষেত্রে ও দৈনন্দিন জীবনে।
শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর লক্ষ্য ও সংযম রেখে জীবন অতিবাহিত করাটাই হল স্বরোদয়ের শিক্ষা। কোথাও যাওয়ার সময়ে, শুভকাজ শুরুর আগে যদি ডান নাকে শ্বাসকে প্রবাহিত রাখা যায় তাহলে যাত্রা ও কর্ম দুটোই শুভ হবে।
যোগীরা শ্বাসের গতি অনুসারে অর্থাৎ বাম দিক না দক্ষিণ দিকে শ্বাস প্রভাবিত হচ্ছে দেখে নিয়ে সেইমতো দক্ষিণ চরণ— ডান পা বা বাঁ পা আগে রেখে চলাফেরা করেন।
স্বরোদয় সিদ্ধ তান্ত্রিকেরা সর্বসিদ্ধিদায়ক ত্রাতার ভূমিকা নিতে পারেন। এঁরা সাধারণত অল্পনিদ্রা বা নিদ্রাহীন ও অল্পাহারী বা একাহারী হয়ে থাকেন।
বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর নিদ্রা চলে গিয়েছিল ১৮৯৪ সালের কুম্ভমেলার সময় থেকে। এর পর থেকে তিনি কোনওদিন রাত্তিরে ঘুমোতেন না। প্রয়োজনও পড়ত না।
পণ্ডিচেরীর শ্রীমা গোটা রাতটা কাটিয়ে দিতেন সোফাতে বসে। এ সময়ে তিনি সাধনরত যোগীদের সাহায্য ও সহযোগিতা করতেন। অনেক সাধকই সে সময়টায় সূক্ষ্মদেহী মায়ের অস্তিত্ব টের পেতেন।
মহাত্মা রাম ঠাকুরের দীক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল কামাখ্যা মন্দিরে। তাঁর বাবা রাধামাধব বিদ্যালঙ্কার ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ তান্ত্রিক। তাঁর সাধনক্ষেত্র ফরিদপুরের ডিঙ্গামানিক গ্রামে আজও বিদ্যমান রয়েছে।
রাধামাধব বিদ্যালঙ্কারের আশ্চর্য তন্ত্রসিদ্ধি ছিল। তিনি মাঘ মাসের ভয়ানক শীতের রাত্তিরে একগলা জলে দাঁড়িয়ে বীজমন্ত্র জপ করতেন। রাধামাধব বিদ্যালঙ্কারের গুরুদেব ছিলেন কায়াকল্পী সাধু মৃত্যুঞ্জয় ন্যায়পঞ্চানন। তিনি জপসা গ্রামে দেহ রাখার সময় বালক রামকে বলে গিয়েছিলেন, ‘আমিই তোমাকে দীক্ষা দেব।’
একজন মৃত ব্যক্তি কী করে দীক্ষা দিতে পারেন — এই ভেবে ভেবেই প্রবল বৈরাগ্যে কিশোর রাম যখন ঘর ছাড়লেন তখন কামাখ্যা মায়ের মন্দিরে একদিন হঠাৎ শুনলেন সেই চেনা কণ্ঠ, ‘রাম... রাম।’
এ যে বাবার গুরুদেবের গলা! মন্দির থেকে বেরিয়ে এসে রাম দেখলেন তাঁর চেনা মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন— মৃত্যুঞ্জয় ন্যায়পঞ্চানন।
রাম ঠাকুর তাঁর কাছেই দীক্ষিত হয়ে গুরুর সঙ্গেই বহুকাল নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন। ফিরে এসে ভক্তসমাজে তিনি তাঁর গুরুদেব সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তাঁর মাথাতে মস্ত জটা, পেট যথেষ্ট স্ফীত, নাভিদেশ গভীর, দীর্ঘ বাহু, প্রশস্ত কপাল। তিনি অনঙ্গদেব।’ অর্থাৎ তাঁকে স্থূলচক্ষে সাধারণ কেউই দেখতে পাবেন না।
রাম ঠাকুর তাঁর অন্তরঙ্গ পার্ষদ মনোরঞ্জন মুখোপাধ্যায়কে বলে গিয়েছিলেন স্বরোদয় সিদ্ধির একখানি সাধারণ ব্যবহারিক ক্রম। কোনও কাজে যাওয়ার আগে ওই নির্দিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো— সহস্রার চক্র, বিশুদ্ধ চক্র, মণিপুর চক্র ইত্যাদিতে হাত ছুঁইয়ে শ্বাস চালনা করে যদি বেরনো যায় তাহলে কার্যসিদ্ধি আসবেই।
নেপাল রাজপরিবারের গুরু ছিলেন বডঢে বাবা। বিহারের পাকুর রাজপরিবারের ছোট রাজকুমার ডক্টর রামনাথ অঘোরী বাবা তাঁর শিষ্যত্ব নিয়েছিলেন। তিনি ১৮৭৩ সালে তারাপীঠ মহাশ্মশানে এসেছিলেন বামদেব বাবার কাছে তন্ত্রমতে দীক্ষিত হতে। কিন্তু শেষকালে তাঁর দীক্ষাপ্রাপ্তি ঘটে বক্রেশ্বর মহাশ্মশানে এক ছিন্নমস্তার উপাসকের কাছে। তিনি পরিপূর্ণ মুক্ত পুরুষ ছিলেন।
বক্রেশ্বর মহাশ্মশানে যখন চক্র বসত, সেখানে উপস্থিত হতেন বামদেব বাবা। রামনাথ বাবা ব্যারিস্টার ছিলেন। তিনি দীর্ঘ আয়ুর সাধক ছিলেন। ১৯৮৫ সালে একশো বারো বছর বয়সে রামনাথ বাবা দেহ রাখেন।
একশো এক বছর বয়সে কল্যাণীতে একবার তিনি বিরাট সমারোহে মা ছিন্নমস্তার পুজো করেছিলেন। তাঁর শিষ্যা মা যোগমায়া আমাকে বলেছিলেন, ‘পুজোতে একটি পাঁঠা বলি দিয়ে বাবা নিজে হাতে রান্না করে হাজার তিনেক মানুষকে একা হাতে পরিবেশন করে খাইছেছিলেন। আমরা সব দেখলুম সকলের পাতে রাশি রাশি মাংস পড়ছে! কীভাবে কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারলুম না। বাবার কাছে তাঁর গুরুদেবের মাথার খুলিটি ছিল। দেহ গেলে তিনি বাবাকে খুলি শুকিয়ে নিজের কাছে রাখতে বলেছিলেন। বাবা ওই খুলি রূপোর পাতে বাঁধিয়ে রেখেছিলেন। খুলির মন্ত্রপূত জল ছিন্নমস্তার উদ্দেশে নিবেদনের পর ওই জল দিয়ে তিনি যে কত মানুষের কত রোগ, শোক, দূর্বিপাক দূর করেছিলেন তার ইয়ত্তা নেই।’
আশ্চর্যের ব্যাপার, খুলিটি আমার দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। রামনাথ বাবা দেহ যাওয়ার আগে সেই খুলি মা যোগমায়াকে দিয়ে গিয়েছিলেন সেবাপুজোর জন্য। ওই খুলির জলে অনেক মানুষের আজও আধ্যাত্মিক সিদ্ধি ঘটছে।
মা বলেন, ‘তন্ত্রের বিদ্যা পার্থিব সমাধানের জন্য নয় রে, বেটা। ওতে কারও বাড়ি, গাড়ি, টাকা হওয়ার নয়। গ্রহবৈগুণ্যও কাটাতে পারেন না সাধক।’
তিনি বলতেন, ‘প্রকৃত সাধন স্বীয় শক্তিকে পুটিত করতে পারেন অপর কোনও শরীরে। কিন্তু ওই শরীরের যদি গ্রহণশক্তি না থাকে, কাজ করবে না কিছু। গুরুদেবকে দেখেছি কতরকমভাবে দীক্ষা দিতে! আমাকেই বাবা কোনও মন্ত্রই দেননি। আসনে বসিয়ে তাঁর দিকে কেবল এক নিমেষে চেয়ে থাকতে বললেন। বাবার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই আমার হৃদয় চক্রে দেখি— অকস্মাৎ কৃপার তরঙ্গ উদ্বেল হয়ে অঢেল করুণায় আমাকে অভিষিক্ত করে দিল!’
দর্শন, স্পর্শন, সম্ভাষণ, প্রণামের মাধ্যমেও দীক্ষা হয় তন্ত্রে। সর্বক্ষেত্রে অভিষেক লাগে না। ও সমস্ত আচারি দীক্ষা– শাক্তাভিষেক, পূর্ণাভিষেক।
আধার উপযুক্ত থাকলে সিদ্ধ গুরু সেই শরীরে কামাল করেন। অনেকেই ছোটাছুটি করেন গুরু গুরু করে— এ-গুরু ও-গুরু, এই-মন্ত্র, ওই-মন্ত্র, আচার-পুজো করতে করতে জীবন অতিবাহিত হয়ে যায়, কিন্তু প্রথম পাওয়া দীক্ষা মন্ত্রেরই স্ফূরণ ঘটে না বলে সব আটকে যায়।
উতলা হওয়াটা একেবারেই ঠিক নয়। এটা জেনে রাখা ভালো, আধার অনুযায়ী গুরু মিলবে। গুরু যদি উচ্চ আধারযুক্ত হন, শিষ্যের আধার না থাকে তাহলে শক্তিকে চক্রে অনুপ্রবিষ্ট করিয়ে দেওয়াটা — কোনও ভাবেই সম্ভবপর নয়।
মূর্তিমান কি মূর্তিময়ী গুরুশক্তি কাকে কখন কীভাবে কৃপা করবেন তা তিনিই জানেন। রবীন্দ্রনাথ সাধে কী আর লিখেছেন, ‘দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে, নইলে কি আর পারব তোমার চরণ ছুঁতে।’
মূলাধারে সহস্রারে
শিবশক্তি বর্ণিত সাধন বিষয়ক শাস্ত্রই তন্ত্র। তন্ত্রের দুটি ভাগ। একভাগে রয়েছে সাত্ত্বিক সাধনপন্থা। যাকে বলা হচ্ছে ঊর্ধ্বাম্নায় বা সুতন্ত্র। মানুষের হিত বা ভালো হতে পারে তন্ত্রগুরুর সাত্ত্বিক সাধনপন্থা বা দীর্ঘদিনের তপস্যাজনিত সিদ্ধির কারণে। এখানকার প্রধান ও একমাত্র সিদ্ধি— চক্রসিদ্ধি।
চক্র নিয়ে আমরা সকলেই কম বেশি জানি। কিন্তু আমাদের জানার সমস্তটাই বই পড়ে। তন্ত্র কখনও বইপত্র পড়ার দ্বারা সাধনা নয়, তন্ত্র করণ— ক্রিয়ার সাধনা।
ক্রিয়া করলেই ফল মেলে তন্ত্রে। মানব শরীরের ছটি সন্ধিস্থলে রয়েছে ছটি চক্র। নানাভাবে প্রচারিত হতে হতে ছটি চক্রনাম আমাদের সকলেরই প্রায় ঠোঁটস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু নাম বা চক্রের অবস্থান জানলে তো হবে না। চক্রগুলোর প্রথম দ্বার মূলাধার যাতে খোলে, আগে তার ব্যবস্থা করতে হয়।
বিবিধ উপায়ে মূলাধার খোলে। প্রবল কামনায়, প্রেমে, উন্মাদবৎ অবস্থায়, হিংসা, রাগে, ক্রোধে পর্যন্ত মূলাধার চক্র খুলে যায়। বলা ভালো যে, সমস্ত মানুষের পাশবিক প্রবৃত্তির দাপটে মূলাধার খোলে আবার বন্ধ হয়ে যায়।
মূলাধার যখন জপশক্তিতে খোলা হয় তখন তার আর বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। শ্বাস-প্রশ্বাসে জপ করতে করতে মূলাধার খোলে। সৃষ্টিশীল মানুষের মূলাধার আপনিই খুলে যায়।
গুরুর কৃপায়, স্পর্শশক্তি, দৃষ্টিশক্তিতে সমস্ত চক্রের গিঁট আলগা হতে পারে। মূলাধার খুললেই স্বাধিষ্ঠান চক্রের দরজা খোলে। কিন্তু তন্ত্রের সাধন প্রণালী শুরুই হয় নাভিচক্র থেকে।
নাভিতে থাকে কুণ্ডলিনীর আগুন। জপের সময়ে ওই আগুনকে তাতিয়ে তুলে কুণ্ডলিনীকে সক্রিয় করে হৃদয়চক্র বা অনাহত দশাতে আনা হয়।
যখন শরীরে আপনিই জপ স্পন্দিত হয় দীর্ঘক্ষণ ধরে, বুঝতে হবে বিশুদ্ধচক্র বা কণ্ঠের ক্রিয়া সজীব হয়েছে।
যে সমস্ত সঙ্গীত সাধকেরা নজর কেড়েছেন —বুঝতে হবে, কণ্ঠচক্র তাঁদের শক্তিশালী হয়েছে। কণ্ঠের ক্রিয়াতেই সৃজনশীলতা তৈরি হয়। তার জন্য সমস্ত সময় তন্ত্রের সাধনা করতে হবে— এরও অবশ্য কোনও মানে নেই।
যাঁদের শরীরে পূর্বজন্মগত কারণে সাত্ত্বিক ভাবটা বেশি থাকে তাঁদের কণ্ঠের ক্রিয়া আপনিই সজীব থাকে। যাঁদের শরীরে তামসিক ও রাজসিক বৃত্তির মাত্রা বেশি থাকে তাঁদেরই তন্ত্রের অধোন্মায় বা আসুরিক বাহ্য-বিভূতি, সিদ্ধিপ্রদ কুতন্ত্রের দিকে বাড়তি আকর্ষণ থাকে। যার মধ্যে রয়েছে অভিচার ক্রিয়াগুলো।
আমরা অনেকেই কুতন্ত্রের প্রভাবে ও প্রচারে মারণক্রিয়ার নাম জানি। তন্ত্রের ছায়াচ্ছন্ন যে সমস্ত পুঁথি —ডামর, ভূতডামর এ সবে মারণ, উচাটন, মোহন, স্তম্ভন, বশীকরণ, বাণবিদ্ধর নামধাম ও প্রয়োগ পাওয়া যায়। কিন্তু পুঁথির গায়ে অক্ষর প্রক্রিয়ার ভেতর যা সমস্ত লুকিয়ে রয়েছে— তা সিদ্ধমন্ত্র থেকে শুরু করে অভিচার বা মানুষের খারাপ করবার প্রক্রিয়াদি কিংবা ভালো করার ব্রত— সমস্তগুলোই রয়েছে নিষ্ক্রিয় করা।
এর চাবিকাঠি থাকে গুরুর হাতে। পুঁথি পড়ে মন্ত্রের প্রয়োগ করলে ফলাফল শূন্য। শুধুমাত্র মন্ত্র পড়ে গেলে হবে না, মন্ত্রযোগকে চক্রে জাগ্রত করে উচ্চারণ করলে তা অলৌকিক হয়ে উঠবে। ব্রাহ্মণের হাতে পৈতেতে জট পাকিয়ে গেল। বচসা বাঁধল জট ছাড়ানো নিয়ে দুই পুরোহিতে। বাবা লোকনাথ বললেন, ‘সোজা করে ধরে থাক দেখি। আমি গায়ত্রী পড়ে জট ছাড়িয়ে দিচ্ছি।’ মন্ত্রে চৈতন্য এলে এমনই কাজ করে। নচেৎ সমস্ত মন্ত্র বা ক্রিয়াদি শিববৎ শব হয়ে যায়।
মরা মন্ত্রে ভালো বা খারাপ কিচ্ছু হয় না। যে সমস্ত ভেলকিবাজেরা অভিচারের নামে অর্থদণ্ড করান সাধারণ মানুষের, দিশাহীন ব্যক্তিরা ছুটে মরেন এঁদের কাছে — তাঁদের অর্থক্ষয় ও ভেলকিবাজের সুযোগ মতো অর্থপ্রাপ্তি ছাড়া অতিরিক্ত কিছুই হওয়ার নয়, এটা জেনে রাখা ভালো।
তন্ত্রে ভালো বা মন্দ যা কিছুই করা হোক না কেন সাধকের মণিপুরচক্রকে অতি সক্রিয় রাখতে হবে। মণিপুর অবধি না গেলে কোনও ক্রিয়াই সফল হওয়ার নয়। যে সাধকের মণিপুর জেগে যায় তাঁরা খামোখা অভিচার বা খারাপ করতে চাইবেন না। জাগা চক্রের শক্তিতে তাঁরা অনেক কিছুই সহজেই পেয়ে যাবেন — যাকে বলা হয় যোগক্ষেম।
মারণ অর্থ বধ করে ফেলা। ক্ষুদ্র আমিত্বকে মেরে ফেলার নামই হল তন্ত্রের মারণক্রিয়া। এটা অন্নময় কোষের কাজ। মূলাধারচক্রে স্থিত কামনাদিই তন্ত্রের মারণক্রিয়া।
উচাটন হল ঊর্ধ্বে টেনে তোলা। প্রাণময় কোষকে সচল করা। ক্ষুদ্র আমি সত্তাটি মরলেই উচাটন — ঊর্ধ্বগতি। এই সত্তাতে স্থিত রয়েছে স্বাধিষ্ঠান চক্র।
মোহন অর্থাৎ মুগ্ধতা। জপধ্যানে চিত্তের বিমোহন ঘটে। এটি মনোময় কোষের কাজ। এখানেই থাকে মণিপুরচক্র। নাভি থেকেই তাই সাধনা শুরু। নাভি থেকেই ঊর্ধ্বগতি প্রাপ্ত হওয়া। চক্রের ধাপ পেরনো। মানুষ যখন চলে যান তখন নাভিপথ দিয়েই বাতাসটা বেরিয়ে যায়। যাকে বলা হয় নাভিশ্বাস। নাভিশ্বাস উঠলেই মানুষ মারা যান।
অচল করে দেওয়া হল স্তম্ভন। বাইরের সমস্ত ইন্দ্রিয় একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় তন্ত্রের স্তম্ভনক্রিয়াতে। বিজ্ঞানময় কোষের ক্রিয়া এটি। এই স্থানেই অনাহতচক্রের অবস্থান।
বশীকরণ হল হীনভূমিকে বশ করে ফেলা। আনন্দময় কোষের ক্রিয়া এখানে ঘটে। এখানেই আজ্ঞা চক্রের অবস্থান। এর আগে রয়েছে বাণবিদ্ধ। সেটি কণ্ঠক্রিয়া বা বিশুদ্ধচক্রের ক্রিয়া। প্রাণময় কোষেরই কাজ এটি। এখানকার চক্রস্থ সাধনে বাকসিদ্ধি আসে। সম্মোহিত হয়ে পড়েন মানুষ।
তন্ত্র এই অসাধারণ সাধনার সোপান। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে তন্ত্র বলতে এমন একটা ছবি ফুটে ওঠে যা কি না প্রকৃতই তন্ত্রের পরিপন্থী।
তান্ত্রিক একজন সাংঘাতিক জীব, তিনি পারেন না হেন কাজ নেই, এঁদের থেকে দূরে থাকা ভালো। ইন্দ্রিয়জ ভোগ লালসায় লাল বস্ত্র পরিহিত কিছু মানুষ তন্ত্র সম্পর্কে সাধারণের মধ্যে এই ধরনের মানসিকতা তৈরি করেছেন।
লাল কাপড়— রক্তাম্বর পরিধানের বিধান কিন্তু কোনও তন্ত্রশাস্ত্রের আদি গ্রন্থাদিতে নেই। প্রাচীন সাধকেরা আগে পুজোর সময় লালপাড়ের শ্বেতবস্ত্র ব্যবহার করতেন। বিশেষ কিছু গুহ্য তান্ত্রিক ক্রিয়ার সময় নীল, হলুদ ইত্যাদি রঞ্জিত বস্ত্র পরিধানের বিধি রয়েছে। তান্ত্রিকের রক্তবর্ণ বস্ত্র অনেক পরের দিকে কোনও কৌল তান্ত্রিকের সংযোজনই বলা চলে। যা পরে জনপ্রিয় হয়ে গুরু পরম্পরায় প্রবাহিত হয়ে গেছে।
ছ’টি চক্রের পর মস্তিষ্কের ব্রহ্মরন্ধ্রে রয়েছে সহস্রার। ব্যবহারিক প্রয়োগ না জানলেও এই চক্রের কথা প্রায় সকলেই জানেন। কিছু কিছু অনুসন্ধিৎসু মানুষ আবার ন’টি চক্রের কথাগুলোও জানেন।
অনেক সাধক নর ও খর এই দু’ভাগে মানুষের প্রভেদ করেন। কাশীর অঘোরী সাধকেরা বলেন, ‘নয়টি চক্র ভেদ না হলে নরদশা সরে না। খর যাঁরা, দেহের তিনটি চক্রকে তাঁরা কাজে লাগিয়ে কিছু বিভূতিবিদ্যা দেখাতে পারেন। খর দেহটা নর হয় আরও ছ’টি চক্রের ব্যবহার জানলে।’
বামদেব বাবার সাক্ষাৎ শিষ্য নিগমানন্দদেব যোগিগুরু নামে একটি বই লিখেছিলেন। তাতে তিনি ন’টি চক্রের কথা উল্লেখ করেছেন। বাহ্য এই ন’টি চক্র সম্পর্কে অনেকেই অবগত আছেন। কিন্তু আরও ন’টি আন্তর চক্র রয়েছে আমাদের দেহে। এর উপস্থিতি বোঝা যায় একমাত্র সাধনার দ্বারাই।
জপ সাধনায় যখন বৈখরী বা মন্ত্রবীজ বাঙ্ময় হয়ে ফুটে ওঠে তখন এই নব চক্রগুলোর অস্তিত্ব ধরা পড়ে। শরীরের ভেতর দিক থেকে বাইরের দিকে এই চক্রগুলো প্রকাশিত হতে থাকে। গোপন এই চক্র বৃত্তান্ত কেবল গুরু পরম্পরার মধ্যে সীমাবদ্ধ বলেই এগুলো সম্পর্কে কিছু বলা গেল না। তবে এর বাইরেও আরও কিছু সাধারণ অগোচর চক্র রয়েছে, যেমন — সোমচক্র, বৈন্দবচক্র, জ্ঞানচক্র ইত্যাদি।
সবগুলোর অস্তিত্ব গভীর ধ্যানসাধনার ভেতর ধরা পড়ে। এইসব চক্র ক্রম সাধারণ বৃত্তে আলোচনার বিষয়বস্তু নয়। তন্ত্রের শক্তিশালী ও নিগূঢ়ী পর্যায় হল চক্র চালনা। উপযুক্ত অধিকারী না হলে এসব বোঝা চলে না।
আমি কিছু সময়ের জন্য শ্রীবিদ্যা ক্রমের মহাসাধিকা শ্রীজির সংস্পর্শে আসতে পেরেছিলাম। একদিন কথা প্রসঙ্গে শ্রীজি মধ্যপ্রদেশের সাতনার জঙ্গলে মটরি বাবার কাছে তাঁর শ্রীবিদ্যার পাঠ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বললেন, ‘দেহের নিম্নস্থ পুচ্ছাস্থিতে রয়েছে সর্বানন্দময় চক্র। সেখান থেকেই মানুষের ভোগকলার বিকাশ। কলার নীচস্থ বিকাশে ভোগ। কলা ওপরে তুলতে জানলে তার অমৃতময় প্রকাশ। সেখানেই শ্রীবিদ্যার বীজকে প্রথমে জাগ্রত করতে হয়। বীজ জাগলে ত্রিকাস্থি অঞ্চলে সর্বসিদ্ধিপদ চক্রে শক্তির প্রকাশ ঘটে। নাভি অঞ্চলে বীজধ্বনি ত্রিপুরসিদ্ধা দেবীর রূপ নেওয়ার পরে সেখানে জাগে সর্বরোগহর চক্র। এরপর সর্বরক্ষাকর চক্রে শ্রীবিদ্যার দেবী শক্তি ত্রিপুরমালিনী আবির্ভূতা হন।’
শ্রীজির কথাতেই ধরলাম শ্রীকুলের সাধন ধারার চক্র পর্যায় এগুলো। বুঝলাম তখনই — শুধু চক্র চক্র করে লাফিয়ে কোনও লাভ নেই। যদি না গুরু এগুলোকে সাধন তত্ত্ব ব্যক্ত করতে গিয়ে শিষ্যের কাছে বোধগম্য না করে তোলেন।
তন্ত্রের সাধনের আবার দুটি পর্যায় ক্রম রয়েছে। আগম ও নিগম। যেখানে শিব বলছেন, পার্বতী শুনছেন সেগুলো আগমশাস্ত্র — পার্বতী যেগুলো বলছেন, শিব শুনছেন সেগুলো নিগমশাস্ত্র। সাধন শাস্ত্রের এই ভাগ থেকেই তন্ত্রবিদ্যাতে ভৈরব ভৈরবীর আলাদা সন্মানশিখাটি উস্কে উঠেছে।
তন্ত্রে নারী
নারীগুরুরাও যথেষ্ট সম্মাননীয়া, মর্যাদাপূর্ণা ও অলৌকিক কার্যবিধিতেও সাধনা করেই শক্তিশালিনী হয়ে উঠেছেন ক্রমে ক্রমেই।
মাতৃসাধক রামপ্রসাদ অনুভব করেছেন, ‘কে জানে রে কালী কেমন, ষড়দর্শনে পায় না দর্শন, ...তাঁকে মূলাধারে সহস্রারে, সদা যোগি করে মনন।’
সাধনরহস্য ও মানবকল্যাণ
কলকাতা বৈঠকখানা বাজারের অধিবাসী সুপণ্ডিত এবং প্রবীণ তন্ত্রসাধক কেনারাম ভট্টাচার্যের কাছে শ্রীরামকৃষ্ণের মন্ত্রদীক্ষা হয়েছিল ১৮৫৬ সালে।
রানি রাসমনির শরীরত্যাগের পর ভৈরবী মাতা যোগেশ্বরী এলেন কাশী থেকে শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনকালের গুরু হয়ে।
যোগেশ্বরী মা চৌষট্টি তন্ত্রে সিদ্ধা ছিলেন। সিদ্ধ তান্ত্রিক সাধকেরা বলেন, ‘চৌষট্টি তন্ত্র দিয়ে সংসারকে বঞ্চনা করা হয়েছে, প্রলোভিত করা হয়েছে মানুষকে, যাতে লোভে পড়ে সকলে তন্ত্রের চর্চার দিকে ঝুঁকে পড়েন। সবটাই মহামায়ার কারসাজি। তিনিই জগতকে ভোলানোর জন্য শিবকে দিয়ে এই সমস্ত বিদ্যা উপদেশ দিতে প্রলুব্ধ করেছিলেন।’
তন্ত্রের যাবতীয় মায়াবিদ্যাকে বলা হচ্ছে, শম্বরবিদ্যা। এগুলো সম্মোহন বা মোহিনীমায়ার নামান্তর। কামাখ্যার তান্ত্রিকেরা একটা সময় পর্যন্ত মোহিনীবিদ্যাতে বেশ পারদর্শী ছিলেন।
সুরসুন্দরী, মনোহরা, কনকবতী, কামেশ্বরী, রতিসুন্দরী, পদ্মিনী, নটিনী ও মধুমতী — ভগবতী মায়ের এই আট জন প্রধানা যোগিনীর সাধনা করতে হয় মাসাধিক কাল ধরে মহাশ্মশানে। গুহ্য জপ, পুজো ও করণ দিয়ে গুরুর সহায়তায় এ পুজো নিষ্ঠাভরে করলে যোগিনীদের দেখা মেলে। তাঁরা তখন সাধকদের নানান সমস্যার সমাধান করে দেন। জাগতিক চাহিদা মেটাতে যোগিনীদের সহায়তা নেন সাধকেরা। এঁরাই আবার সাধকদের পরীক্ষা করবার জন্য মাঝে মাঝে বিপাকে ফেলে দেন।
যোগিনীজাল শম্বর বলে দুর্লভ এক তন্ত্রের পুঁথি আছে। এই পুঁথিটি নকল করবার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। কামাখ্যার মোহিনী তান্ত্রিক জটাধারী বাবার শিষ্যা রাজরাপ্পার যোগিনী মাঈ নানান শম্বরবিদ্যাতে পারদর্শী ছিলেন। শরীর হালকা করে জলের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে তাঁকে আমি স্বচক্ষে দেখেছি। তাঁর মুখেই শুনি তন্ত্রের নানান নিধিবিদ্যার কথা।
কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে যেসব বিদ্যা প্রয়োগ করা হয়, তাই নিধিবিদ্যা। সিদ্ধিভৈরব, বটুকভৈরব, কঙ্কালভৈরব, কালাগ্নিভৈরব, যোগিনীভৈরব, মহাভৈরব, শক্তিভৈরব এসব সাধনার পেছনে মূল যে বিষয় — উদ্দেশ্য সাধন।
সমুদ্রবিদ্যা বলে একধরনের বিদ্যা রয়েছে যার প্রয়োগে জাগ্রত মানুষকে অচেতন করে ফেলা যায়। একেই বলে মহাসম্মোহন। কামিকবিদ্যাও তন্ত্রের একটি শাখা। যে কোনও কামনা পূরণের জন্য এর প্রয়োগ ঘটানো হয়।
তন্ত্রের প্রচার ও সমাদর ক্ষেত্রকে তিনটি ক্রান্তা বা শাখাতে ভাগ করেছিলেন তন্ত্রাচার্যরাই। বিন্ধ্যাপর্বতমালার পাদদেশ থেকে চট্টল বা চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিষ্ণুক্রান্তার সীমা। অশ্বক্রান্তার সীমা বিন্ধ্যপর্বত থেকে মহাচীন পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এই সীমানার মধ্যে নেপাল সহ পার্বত্য দেশগুলোও পড়ে। রথক্রান্তার বিস্তৃতি আরও ব্যাপক — বিন্ধ্যগিরি দিয়ে সাগরপারের কাম্বোজ, জাভা পর্যন্ত।
দক্ষিণাত্যের বীজাপুর নগরে আঠারো শতকের প্রথম ভাগে জন্মেছিলেন ভাস্কর রায়। তাঁর তন্ত্রগুরু ছিলেন সুরাটের শিবদত্ত শুল্ক। তিনিই তাঁকে পূর্ণাভিষেক দেন। তাঁর তান্ত্রিক সন্ন্যাসনাম হয় ভাস্করানন্দ। তন্ত্র সাধনায় সিদ্ধির পর তিনি তন্ত্রশাস্ত্রের ওপর লেখালেখি শুরু করেন। চণ্ডীর টীকা, তান্ত্রিক উপনিষদগুল?