এক-একটি ফুলের উচ্চতা প্রায় দশ ফুট পর্যন্ত হতে পারে! ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম সুমিত্রা দ্বীপে এই ফুলের আদি নিবাস। প্রকৃতির বিস্ময় টাইটান অ্যারাম সম্বন্ধে জানালেন রমলা মুখোপাধ্যায়।
এক-একটি ফুলের উচ্চতা প্রায় দশ ফুট পর্যন্ত হতে পারে! ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম সুমিত্রা দ্বীপে এই ফুলের আদি নিবাস। প্রকৃতির বিস্ময় টাইটান অ্যারাম সম্বন্ধে জানালেন রমলা মুখোপাধ্যায়।
এক-একটি ফুলের উচ্চতা ৮ থেকে ১০ ফুট! মানে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের থেকেও লম্বা। সত্যিই পৃথিবীতে এমন ফুলের অস্তিত্ব আছে? টাইটান অ্যারাম এমনই একটি ফুল। এটি সুবিশাল উচ্চতার বাজে গন্ধওয়ালা ফুল। তবে কিছু কিছু ফুলে বাজে গন্ধ থাকে না। এটি বিশ্বের প্রাচীনতম ও বড়ো প্রজাতির ফুলগুলির মধ্যে একটি। একসময় এই ফুল বনবাদাড়ে, পাহাড়ের পাদদেশে ফুটে থাকত। তবে এই ফুল আজ
বিলুপ্তির পথে।
জাপানের টোকিও শহরের জিনদাই বোটানিক্যাল গার্ডেন সহ বিশ্বের বিভিন্ন বোটানিক্যাল গার্ডেনে এখনও দেখা যায় এই অদ্ভুত ফুলটি। এর বিজ্ঞানসম্মত নাম অ্যামোরফোফ্যালাস টাইটানাম। এই ফুল প্রকৃতির এক বিস্ময়। কারণ একটি গাছে প্রায় পাঁচ-ছ’বছর অন্তর একবার এই ফুল ফোটে।
ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম সুমাত্রা দ্বীপে এই ফুলের আদি নিবাস। এই ফুলটির গড় উচ্চতা ৬-১০ ফুট। তবে এর উচ্চতা ১০ ফুট ২ ইঞ্চি পর্যন্ত রেকর্ড আছে। অবশ্য, উদ্ভিদবিজ্ঞান অনুসারে এটা ফুল নয়, পুষ্পমঞ্জরী। মানে হাজার হাজার ফুলের বিশালাকার তোড়া। এই ফুলটির ঘায়ে সত্যি করেই মানুষ মূর্ছা যাবে। কারণ এই ফুলটির ওজন ৫০ থেকে ১১০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। যেটাকে আমরা ফুল ভাবি সেটি আসলে পুষ্পদণ্ড ও পুষ্পমঞ্জরীর যৌথ সংকলন। পুষ্পদণ্ডটি হল মাঝখানের ৮-১০ ফুট হলুদ স্তম্ভ। এটাই আসল ফুলের ডাঁটি। আর পুষ্পমঞ্জরী হল বাইরের লালচে-খয়েরি ঘাগরার মতো ৩-৪ ফুট চওড়া পাপড়ির মতো অংশ। স্তম্ভ বা ডাঁটির গোড়ায় হাজার হাজার ছোটো ছোটো ফুল লুকানো থাকে। ফুলটির মানে পুষ্পমঞ্জরী অর্থাৎ ফুলের তোড়া মতো অংশটির আয়ু কিন্তু খুবই কম। দু’দিনেই ফুলটি নেতিয়ে পড়ে। তবে টাইটান অ্যারাম গাছটির আয়ু ৩০-৪০ বছর। কিন্তু একটি গাছের গোটা জীবনে ফুল ফোটে মাত্র ৫ থেকে ৬ বার। ফুলটি ফোটার সময় পরাগায়নের জন্য পচা মাছ-মাংসের মতো দুর্গন্ধ ছাড়ে। যা প্রায় ৮০০ মিটার দূর থেকেও পাওয়া যায় এবং সেই গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে কীট-পতঙ্গরা ছুটে আসে। আশ্চর্যের ব্যাপার ফুল ফোটার প্রথম রাতে পুষ্পদণ্ড নিজের তাপমাত্রা বাড়িয়ে ৩২-৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে ফেলে। রেইনফরেস্টের আর্দ্রতায় এই গন্ধ বাষ্প হয়ে দূরে ছড়িয়ে পড়ে। পতঙ্গরা ভাবে হয়তো মরা জীবজন্তু পড়ে আছে, তাই দলে দলে ছুটে আসে।
টাইটান অ্যারাম ৭-১০ বছর ধরে শুধু একটি বিশাল পাতা হয়ে খাবার জমায়। পাতাটি ২০ ফুট চওড়া গাছের মতো দেখতে। কন্দে যথেষ্ট পরিমাণ খাবার জমলে হঠাৎ ডাঁটি গজায়। ২-৩ সপ্তাহে ৮-১০ ফুট বাড়ে। এই গাছের ফুল মাত্র ২৪-৪৮ ঘণ্টা উন্মোচিত থাকে। ফুলের পরাগায়নের পর
ফুল থেকে লাল-কমলা জামের মতো ফল হয়। পাখিরা ফল খেয়ে বীজ ছড়ায়। সেখান থেকে আবার গাছ জন্মায়।
কিন্তু এত সুন্দর এবং অদ্ভুত ফুলের আশ্চর্য গাছটি প্রায় বিলুপ্তির পথে। কারণ সুমাত্রার জঙ্গল কেটে পাম-তেলের জন্য পাম গাছের বাগান হচ্ছে। তাছাড়া এই গাছের কন্দ চোরাই বাজারে বিক্রি হয়। আরও একটি অবলুপ্তির কারণ হল পাঁচ-সাত বছর অন্তর একবার মাত্র ফুল ফোটায় বংশবৃদ্ধির ধীর-গতি।
তবে আশার কথা বিপন্ন তালিকায় টাইটান অ্যারাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে এই ফুলের প্রজাতিকে রক্ষা করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি ও বেসরকারি বাগানগুলোয় টাইটান অ্যারামের চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই আশ্চর্য ফুল দেখতে পৃথিবীর বিখ্যাত বোটানিক্যাল গার্ডেনে মানুষজন ভিড় জমান। তাঁরা চান, প্রকৃতির বিস্ময় টাইটান অ্যারাম বেঁচে থাকুক।