রাজু চক্রবর্তী, কলকাতা: আগামী ২৯ মার্চ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বাংলায় আসছেন না। অথচ সেটাই চূড়ান্ত ছিল। বঙ্গ বিজেপির চুনোপুঁটি থেকে রাঘব বোয়াল, সকলেই ধরে নিয়েছিলেন, সরসঙ্ঘ চালক মোহন ভাগবত সবটাই ঠিক করে গিয়েছেন। এবার অমিত শাহ আসবেন, আর তারপরই ঘোষণা হয়ে যাবে রাজ্য সভাপতির নাম। সেই আশায় আপাতত জল পড়ে গেল। সরকারি সূত্রে জানা যাচ্ছে, ওইদিন লোকসভায় জবাবি ভাষণ রয়েছে তাঁর। তাই কর্মসূচিতে পরিবর্তন। সত্যিই কি তাই? নাকি নির্ধারিত সব অঙ্কই আচমকা নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে? বিজেপির অন্দরের যা খবর পাওয়া যাচ্ছে, তাতে রাজ্য সভাপতি ছাড়াও অন্য একটি উদ্বেগ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে। আর তা হল, তৃণমূলের খোলা দরজা। হলদিয়ার বিধায়ক তাপসী মণ্ডল ইতিমধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছত্রচ্ছায়ায় আসার পর কপালে ভাঁজ আরও বেড়েছে দিল্লির নেতাদের। তাহলে কি লাইনে আরও অনেকেই রয়েছেন? ২০২১ সালে বিধানসভা ভোটের পর হাতে আসা ৭৭টি আসন কমে এখন ঠেকেছে ৬৫তে। এই অঙ্কে ভাঙন ধরলে চাপ আরও বাড়বে। কেন্দ্রীয় স্তর, রাজ্য এবং বেসরকারি সমীক্ষক সংস্থা—তিনভাবেই রাজ্যে সমীক্ষা সেরে ফেলেছে বিজেপি। কাদের কাদের নিশ্চিতভাবে ছাব্বিশের ভোটে প্রার্থী করা হবে, তাও স্থির হয়ে গিয়েছে। তাই বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব চাইছে, সেই নামগুলো এখনই প্রকাশ্যে নিয়ে আসা হোক। তাহলে আসন্ন ধস থামানো যাবে। আর একটা সমীকরণ হল, যাঁদের নাম নিশ্চিত করা হবে, তাঁদের উপরই দায়িত্ব বর্তাবে—নিজের এলাকার সংগঠন এবার আপনারা দাঁড় করান। এই ইস্যুতে জোর চর্চা চলছে দলের অন্দরে। আর তাই প্রশ্ন উঠছে, এবার কি রাজ্য সভাপতি ঘোষণার আগেই নিশ্চিত প্রার্থীদের জানিয়ে দেওয়া হবে যে, ‘আপনি প্রার্থী হচ্ছেন দাদা’...?
সংগঠন দূরঅস্ত। এখন তো রাজ্য সভাপতি পদের জন্যই নতুন করে ঘুঁটি সাজানো শুরু হয়েছে। যে কয়েকটি নাম পাইপলাইনে ছিল, তাঁরা প্রত্যেকেই ফিরে গিয়েছেন স্টার্টিং লাইন আপে। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বুঝেছে, বাংলায় সংগঠনের হাল এখনও পাতে দেওয়ার মতো নয়। বঙ্গ বিজেপি মূলত তিনটি গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে রয়েছে। সেক্ষেত্রে এমন কোনও নাম তাদের সামনে আনতে হবে, যাঁকে দেখে অন্তত সব গোষ্ঠী যাবতীয় দ্বন্দ্ব ভুলে ভোটের লক্ষ্যে এক ছাতার তলায় এসে যায়। তাই কোনও দলবদলু নেতা নন, বরং আদি বিজেপির আর এক নেতার নাম চলে এসেছে আলোচনায়। বিজেপির হর্তাকর্তারা মনে করছেন, তাঁকে সুযোগ দিয়ে দেখলে দোষ কী? বাংলায় বিজেপির যা বাড়বাড়ন্ত, তা দিলীপ ঘোষের সময়ই। কিন্তু তারপর, অর্থাৎ সুকান্ত মজুমদার জমানায় গেরুয়া শিবিরের নম্বর ক্রমেই কমেছে। এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে এরপরও অবশ্য নিচুতলার কর্মীদের একাংশ মনে করছে, বেশি এক্সপেরিমেন্ট না করে সুকান্তবাবুকেই রেখে দেওয়া যেতে পারে। এক ব্যক্তি এক পদ ফর্মুলায় সেক্ষেত্রে সুকান্তবাবুকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হবে। আবার সম্প্রতি সংগঠনে দিলীপ ঘোষ অনুগামীদের ‘প্রত্যাবর্তন’ দেখে একটা ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, মেদিনীপুরের প্রাক্তন সাংসদের কপালেই শিকে ছিঁড়তে চলেছে। কিন্তু তাঁর সাম্প্রতিক অভব্য আচরণের ঠেলায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বেশ বিরক্ত। তাঁরা বেশ বুঝছেন, মহিলা ভোটব্যাঙ্ক দিলীপবাবুর উপর রীতিমতো ক্ষিপ্ত। তাঁকে সভাপতি করলে বিধানসভা নির্বাচনে উল্টো প্রভাব পড়তে পারে। বিরোধী দলনেতাকেও সভাপতি পদে দেখার সম্ভাবনা নেই। তাই তৃতীয় নামটি চর্চায়। এই ব্যক্তি সবার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রেখে চলারই পক্ষপাতী। উপরন্তু, বিরোধী দলনেতা যদি তাঁর সঙ্গে বোঝাপড়ায় যেতে পারেন যে, কেউ কারওর ‘জমিদারি’তে পা দেবে না, তাহলে দু’জনেরই মঙ্গল। কিন্তু নিচুতলা? আপাতত তাদের একটিই অজুহাত দিয়ে ঠান্ডা রাখা হয়েছে, ১৯টি রাজ্যে সভাপতির নাম একসঙ্গে ঘোষণা হতে পারে।