


পরামর্শে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রাক্তন প্রধান অধ্যাপক
ডাঃ অপূর্ব মুখোপাধ্যায়
কথায় আছে যার খাই নুন তার গাই গুণ! সে ঠিক আছে। যিনি খাওয়াচ্ছেন তাঁর প্রশংসা করুন, তাই বলে নুনের গুণ গাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানাচ্ছে, প্রতিদিন একজন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য গড়ে ৫ গ্রামেরও কম পরিমাণে নুন বরাদ্দ করা যেতে পারে। এই মাত্রার বেশি নুন খেলে দেখা দিতে পারে প্রেশারের সমস্যা, স্থূলত্ব, হার্টের রোগ, কিডনির অসুখ ইত্যাদি! তবে চাইলেও আজকাল নুন কম খেয়ে থাকতে পারছে না আধুনিক যুগের মানুষ। কারণ নানা ধরনের রেডিমেড খাবার এখন বাজারে মিলছে আর সেই খাবারে এত বেশি নুন মেশানো হচ্ছে যে অজান্তেই আমাদের শরীরে ঢুকে যাচ্ছে লবণ।
আসুন জেনে নিই বাড়তি নুন শরীরের কী কী ক্ষতি করছে?
• আগে ৪০ বছর বয়সের পরে উচ্চ রক্তচাপের রোগীর দেখা মিলত। এখন ঘরে ঘরে অল্প বয়স্কদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তার জন্য পরিশ্রমবিমুখতা যেমন দায়ী, তেমনভাবেই দায়ী খাদ্যাভ্যাস। জাঙ্কফুড, ফাস্টফুডে থাকে বিপুল পরিমাণে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ট্রান্স ফ্যাট। আর সঙ্গে স্বাদ বাড়াতে ব্যবহার হয় প্রচুর পরিমাণে নুন। উদাহরণ হিসেবে যে কোনও প্যাকেটজাত রেডি টু ইট ফুড, বিরিয়ানি, চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিজ, বার্গারের কথা বলা যায়। নিয়মিত এই ধরনের খাদ্য খাওয়ার অভ্যেস দেখা যায় কম বয়সি ছেলে মেয়েদের মধ্যে। তাই তার কুফলও প্রকাশ পাচ্ছে।
• বয়স্কদের মধ্যেও মুখরোচক রেস্তরাঁর খাদ্য খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে শরীরে নুনও ঢুকছে বেশি। এছাড়া অনেকে খাবার সময় পাতে কাঁচা নুনও নেন। ফলে প্রেশারের ওষুধ খাওয়ার পরেও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আসে না।
• নুন-এর রাসায়নিক নাম সোডিয়াম ক্লোরাইড। নুন বেশি খেলে শরীরে সোডিয়ামের মাত্রাও বাড়ে। শরীরে সোডিয়াম বৃদ্ধি পেলে দেখা যেতে পারে নানা ধরনের জটিলতা। অতিরিক্ত সোডিয়াম উচ্চ রক্তচাপের কারণ। এছাড়া হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং কিডনির সমস্যার ঝুঁকিও বাড়ায়।
শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা বেশি থাকলে মস্তিষ্কের কার্যকলাপে প্রভাব পড়ে। ফলে রোগী বিভ্রান্ত বা অস্থির অনুভব করতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে পেশির সংকোচন বা খিঁচুনি হতে পারে। রোগী ক্লান্ত এবং দুর্বল অনুভব করতে পারেন। দেখা দিতে পারে বমি বমি ভাব। খিদেও কমে যায় কারও কারও।
সাবধান: যাঁরা ব্লাড প্রেশারে বা ডায়াবেটিসের ওষুধ খান, তাঁদের মাঝেমধ্যে রক্তে সোডিয়ামে মাত্রা পরিমাপ করে দেখা উচিত। কারণ এই ধরনের ওষুধের প্রভাবে শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বয়স্কদের মাঝেমধ্যেই রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা পরীক্ষা করে দেখা দরকার।
বাড়তি নুন: আমরা বাস করি উষ্ণমণ্ডলীয় জলবায়ুতে। ফলে ঘাম বেশি হয়। ঘামের সঙ্গে সো়ডিয়াম বেরিয়ে যাতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা মাঠঘাটে বা দিনমজুরের কাজ করেন তাঁদের কায়িক শ্রম বেশি হয়। ঘাম হয় বেশি। ফলে তাঁদের শরীর থেকে বেশি ঘাম বেরিয়ে যেতে পারে। এমন মানুষের নুন বেশি মাত্রায় লাগতে পারে।
লিখেছেন সুপ্রিয় নায়েক
পরামর্শে আর এন টেগোর হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ অরিন্দম বিশ্বাস।
কেন আপত্তি ময়দায়?
আটার মতোই ময়দা মূলত তৈরি হয় গম থেকে। তবে গমকে একেবারে মিহি করে পিষে (রিফাইন করে) ময়দা তৈরি করা হয়। এই রিফাইন প্রক্রিয়ার সময় প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান যেমন ভিটামিন, ফাইবার, খনিজ মৌল ইত্যাদি বেরিয়ে যায়। এর ফলে ময়দা কেবল শরীরে কার্বোহাইড্রেটের জোগান দেয়।
কী ক্ষতি হয়?
ময়দায় গ্লাইসেমিক ইনডেক্স বেশি থাকে। ময়দা শরীরে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই কারণে সুগারের রোগীদের ময়দা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। মনে রাখতে হবে, ডায়াবেটিস হল সাইলেন্ট কিলার। এর থেকে হৃদযন্ত্রে সমস্যা, কিডনির ক্ষতি হতে পারে। ওজন বেড়ে যায়। এছাড়াও ময়দা অনেক সময় হজম হয় না। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস-অম্বলও হতে পারে।
একেবারেই খাবেন না?
তা নয়। মাসে একবার বা দু’বার ময়দা দিয়ে বানানো জিনিস খেতেই পারেন। সেটা শরীর মেনে নেবে। তবে প্রতিদিন সকালে লুচি বা টিফিনে কেক খেলে বিপদ বাড়বেই। অনেকেই ভাবেন, ময়দার মোমো সেদ্ধ জিনিস, খাওয়া যেতেই পারে। এটাও ভুল ধারণা। ময়দা দিয়ে তৈরি যে কোনও খাবারই ক্ষতিকারক।
ময়দার বিকল্প কী হতে পারে?
আটা দিয়ে তৈরি খাবার খেতে পারেন। রাগি, বাজরা, জোয়ার— এগুলি খাওয়া যেতে পারে। এগুলিতে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম। এছাড়াও ময়দার পরিবর্তে ওটস, ভুট্টা খেতে পারেন।
লিখেছেন শান্তনু দত্ত
গৃহস্থঘরের চিনিকে শত্রুরূপেই দেখছে অনেকে। চিনি সত্যিই এত খারাপ? পরামর্শে মণিপাল হাসপাতালের বিশিষ্ট এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডাঃ শুভঙ্কর চৌধুরী।
চিনি গৃহস্থবাড়িতে নিত্যব্যবহৃত উপাদানের একটি। তবে এই চিনিকেই ‘দুর্ধর্ষ দুশমন’ ঠাউরে, গৃহস্থ তার দিকে সন্দেহের চোখে তাকায়! চিনি নিয়ে ইদানীং বিভিন্ন মাধ্যমে শিউরে ওঠার মতো প্রচুর নেতিবাচক কথাও শোনা যায়। চিনি যেন ‘ভিলেন’। সুগার থেকে ক্যান্সার সবেতেই দোষের পাল্লা ঝুঁকে চিনির দিকে। চিনি ঠিক কতটা দোষী? কী বলছে চিকিৎসাবিজ্ঞান?
চিনির প্রকৃতি
চিনিকে বলে ‘এম্পটি ক্যালোরি’। অর্থাৎ ক্যালোরি ভিন্ন অন্য কোনও পুষ্টিগুণ এর নেই। এটি মূলত কার্বোহাইড্রেট। শরীরে খুব দ্রুত শোষিত হয় ও গ্লুকোজের মাত্রা শরীরে বাড়িয়ে তোলে। তাই ডায়াবেটিসের রোগী চিনি খেলে তাঁর সুগারের মাত্রা বাড়বে। কিন্তু যাঁর ডায়াবেটিস নেই, চিনি খেলে কি তাঁরও ডায়াবেটিস হতে পারে?
চিনি থেকে সুগার?
এর কোনও প্রমাণযোগ্য গবেষণা এখনও হয়নি। চিনি ও মিষ্টি খেলেই ডায়াবেটিস হতে পারে— এই ধারণা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুল ও মিথ বলে নানা গবেষণায় দেখা গিয়েছে। আবার দীর্ঘদিন ধরে অপরিমিতভাবে মুঠো মুঠো চিনি খেয়েছেন, এমন মানুষদের ডায়াবেটিস হয়েছে, এমন দু’-একটি স্টাডিও রয়েছে। তবে চিনি সরাসরি ডায়াবেটিস ডেকে আনে না।
চিনি থেকে পাওয়া কার্বোহাইড্রেটেরকিছুটা শরীরের কাজে লাগে। অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট এরপর ফ্যাটি অ্যাসিডে পরিণত হয়ে শরীরে ফ্যাট হিসেবে জমা হয়। তাই বলা যায়, চিনি থেকে আসে ওবেসিটি। এই ওবেসিটি ইনসুলিন প্রতিরোধ করে ডায়াবেটিস ডেকে আনে। তবে চিনি সরাসরি সুগার ডেকে আনে না। তাই অল্পবিস্তর চিনিতে কোনও ক্ষতি নেই।
চিনি থেকে হার্টের রোগ?
অতিরিক্ত চিনি খেলে শরীরে কার্বোহাইড্রেট বাড়বে। চিনিতে থাকা গ্লুকোজ ও ফ্রুকটোজ ভেঙে শরীরের ভিতর শোষিত হয়। উচ্চ শর্করা জাতীয় খাবার শরীরের ভালো কোলেস্টেরল এইচডিএল-এর মাত্রা কমায় ও খারাপ কোলেস্টেরল এলডিএল-এর মাত্রা বাড়িয়ে তোলে। তাই হার্টের জন্য অত্যধিক চিনি ক্ষতিকর।
চিনি থেকে ক্যান্সার?
এই বিষয়ে নানা গবেষণা বিশ্বজুড়ে চলছে। এখনও ক্যান্সারের সঙ্গে চিনির সরাসরি কোনও যোগ মেলেনি।
চিনির বিকল্প কী?
সুগার থাকলেও অল্পবিস্তর চিনি খাওয়া চলে। এর খুব বিকল্প খোঁজের প্রয়োজনীয়তা নেই। অনেকে ভাবেন, গুড় ভালো। তবে চিনি ও গুড়ে খুব ফারাক নেই। গুড়ে একটু আয়রন মেলে ঠিকই, তবে তা বিরাট ফারাক করে না। অনেকে আবার কৃত্রিম চিনি ব্যবহার করেন। অ্যাসপার্টম, স্যাকারিন, সুক্রালোজ দিয়ে এই কৃত্রিম চিনি তৈরি। অ্যাসপার্টম কিন্তু উচ্চতাপের রান্নায় যোগ করা ক্ষতিকর। সুক্রালোজ যদিও বেকারিশিল্পে ব্যবহৃত হয়,তবে নানা গবেষণায় দেখা গিয়েছে এই কৃত্রিম চিনিগুলি ডায়াবেটিস রোগীরা দিনের পর দিন খেলে তাঁদের সুগার বাড়ে। চিনির তুলনামূলক ভালো বিকল্প খাঁটি মধু। বাজারচলতি মধু নয়, পারলে চাকভাঙা খাঁটি মধু অল্প পরিমাণে খাবারে বা চায়ে যোগ করে খেতে পারেন। এতে চিনির চেয়ে উপকার বেশি। নয়তো অল্প পরিমাণে চিনিই খান। গৃহস্থঘরের চিনি মোটেই অতটাও ভিলেন নয়! তবে সুগার থাক বা না থাক, ওবেসিটি ও হার্টের রোগ এড়াতে এর পরিমাণ অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
লিখেছেন মনীষা মুখোপাধ্যায়