অভিজিৎ চৌধুরী, চুঁচুড়া: সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর বিখ্যাত ‘শাশ্বতী’ কবিতায় ধরেছিলেন আগমনীর আবহ। সেখানে শরতের শেফালি সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘মিলনোৎসবে সেও তো পড়েনি বাকি।’ তেমনই পুজো, বিশেষত থিম পুজোর কালে বোধহয় কারও বাদ পড়ার সুযোগ নেই। থিম শিল্পী বা ভাবুকের কল্পনাতে অপেক্ষনীয় এবং উপেক্ষনীয়, সকলই কবির কথার অনুরণন করে। বাঙালির বহমান সংস্কৃতির বর্ণময় ধারায় যতই বদল আসুক, মিলনের দ্বার সবকিছুর জন্যই অবারিত। তাই চুঁচুড়া থেকে শ্রীরামপুর, মূর্ত-অমূর্ত নানা ভাবনার থিমের জয়জয়কার।
মিলনোৎসবে মরশুমে তাই ‘ভাবনা’ নিজেই হয়ে উঠছে থিম। আবার কেউ পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন। তৈরি হচ্ছে ‘জীবন জানে গাছের মানে’। কোথাও পৌরাণিকভাব আধারিত অমূর্ত থিম, ‘মায়ের অন্দরমহল’। সে সবেরই এমন বিচিত্র গতিপথ যে, রঙের পৌরাণিক বা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পথ হারাতে বাধ্য। শ্রীরামপুরের মাহেশে মানুষ ও গাছের সনাতন সম্পর্ক নিয়ে থিম তৈরি করেছে শিবতলা সর্বজনীন। শিবতলায় স্থায়ী মণ্ডপে সাবেক ধাঁচের প্রতিমা বিরাজ করবে। কিন্তু সামনের অংশে থাকছে থিমের বাহার। ‘জীবন জানে গাছের মানে’-মানবজীবনের প্রাণবায়ু অক্সিজেন নির্ভর। আর তার একমাত্র প্রাকৃতিক নির্মাণ হয় গাছে। নানা কারণে সেই গাছের প্রাণ বিপন্ন। ফলে ভবিষ্যতে স্কুলের ব্যাগ নয়, শিশুর পিঠে থাকবে অক্সিজেন সিলিন্ডার। মৃত গাছ, সবুজ বন, প্রাণচঞ্চল ও অক্সিজেনের অভাবে ধুঁকতে থাকা শিশু সহ নানা মডেলে থিমকে প্রাণবন্ত করে তোলা হচ্ছে। পুজো উদ্যোক্তা শম্ভু জানা বলেন, ‘থিমের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেই আলোকসজ্জা করা হবে। সাবেক প্রতিমা ও আধুনিক ভাবনার মেলবন্ধনে দর্শকদের কাছে আকর্ষনীয় আয়োজন পেশ করা হচ্ছে।’
শ্রীরামপুরের রাজ্যধরপুরের দুর্গোৎসব ক্রীড়া পরিচালন সমিতির এবারের আয়োজন ‘ভাবনা’। একটি বিরাট রাজবাড়ির আদলে মণ্ডপসজ্জা হচ্ছে। থাকবে রাজবাড়ির যাবতীয় আদল। ঝাড়বাতি থেকে খিলান, সিংহদুয়ার থেকে জানলার বর্ণময় সজ্জা। কিন্তু ভাবনা এখানে রাজবাড়িতেই সীমাবদ্ধ নয়। দেবী শক্তিস্বরূপা। নানা সময় নানা রূপে তিনি পুরাণে বর্ণিত হয়েছেন। সে সবেরই একটি ধারাকথন ‘ভাবনা’ থিমের আশ্রয়। উদ্যোক্তা তপন ভট্টাচার্য বলেন, ‘দেবীর রূপ এখানে সনাতন। কিন্তু বড় আকারের দেবীপ্রতিমায় থাকবে আধুনিকতার ছোঁয়া। আলোকসজ্জাতেও থাকবে থিমের প্রভাব।’ রাজবাড়ির আদলে থিম ভাবনা পেশ করছে চুঁচুড়ার বড়বাগান সর্বজনীনও। সেখানেও সনাতন ধারা ও আধুনিক ধারার মহামিলন যোগ। ‘মায়ের অন্দরমহল’ থিমে মায়ের রাজরাজেশ্বরী রূপ। ডাকের সাজে যা আরও মোহন করে তোলা হবে। পুজো উদ্যোক্তা সঞ্জীব দাস বলেন, ‘ভিন্নরকমের আয়োজন করা হয়েছে। দর্শকদের ভালো লাগবেই।’ দেবীর আগমনের অনেক আগে থেকেই সেজে ওঠে প্রকৃতি, সাজে নাগরিক মহল্লা। আনন্দের পরিসরে বর্ণময় পুজোর আয়োজন আনে বাড়তি মাত্রা। এখন প্রকৃতি, নগরসভ্যতা, থিমের হরেক রঙে স্বপ্নের দেশ হয়ে উঠছে গঙ্গাপাড়ের সাবেক জনপদ।