


তন্ময় মল্লিক: ভোট রাজনীতিতে রিগিং নতুন কিছু নয়। নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরুর সময় থেকেই কারচুপি হয়ে আসছে। কংগ্রেস আমলেও জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ভোটবাক্সে পড়ত না। সবটাই ছিল খুল্লামখুল্লা। বুথ দখল ও ছাপ্পাভোট তখনও ছিল। অবশ্য রিগিংকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল বামেরা। জনপ্রিয়তা খুইয়েও কী করে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায়, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিল সিপিএম। ভোটার তালিকা তৈরি থেকে ভোট গণনা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে চলত কারচুপি, যা বাংলার মানুষের কাছে ‘সায়েন্টিফিক রিগিং’ নামে খ্যাত। তবে, এসআইআর পর্বে কোনো রাখঢাক নেই। টিম জ্ঞানেশ কুমার বাংলায় যা করছে তা এককথায় ‘প্রাতিষ্ঠানিক রিগিং’। এটা সায়েন্টিফিক রিগিংয়ের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
বাংলায় প্রায় ৬০ লক্ষ নাম ‘বিচারাধীন’। ছাব্বিশের নির্বাচনে তাঁদের ভোটদান অনিশ্চিত। এর দায় বিএলও এবং রাজ্য প্রশাসনের উপর চাপানোর
চেষ্টা করছে বিজেপি। অভিযোগের আঙুল উঠছে মাইক্রো অবর্জাভারদের দিকেও। কিন্তু মানুষ বুঝেছে, গলদটা কোথায়?
মোবাইল আর সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে মানুষকে বোকা বানানোটা এখন আর অত সহজ নয়। এসআইআর নিয়ে নানান তথ্য ও ভিডিয়ো মোবাইলের পর্দায় ভেসে উঠছে। তা থেকেই জন্ম নিচ্ছে উদ্বেগ আর আতঙ্ক। সম্প্রতি এক মাইক্রো অবর্জাভারের একটি ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে। জীবন বিমার ডেভেলপমেন্ট অফিসার মাইক্রো অবর্জাভার হিসেবে কাজ করেছেন। কিন্তু, চূড়ান্ত তালিকা থেকে তাঁর নামই ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে। ওই মাইক্রো অবর্জাভার এরজন্য সরাসরি কমিশনকে দায়ী করেছেন। নাম বাদ যাওয়ায় তাঁর স্ত্রী পর্যন্ত তাঁকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। তাঁর সংসার ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। কমিশনের নিত্যনতুন ফরমানের জন্যই এই বিপদ। এরজন্য সন্তানকেও পদে পদে খেসারত দিতে হবে বলে তাঁর আশঙ্কা।
বাংলায় আজ যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তার দায় সিপিএম অস্বীকার করতে পারে না। ২০০২ সালে এরাজ্যে সরকারে ছিল সিপিএম। তার আগের বছরই হয়েছিল বিধানসভা ভোট। ’৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস জন্ম নেওয়ার পর গোটা রাজ্যে আলোড়ন পড়ে গিয়েছিল। তখন থেকেই মানুষ বিশ্বাস করত, সিপিএমকে হটানোর ক্ষমতা একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরই আছে। কারণ তাঁর লড়াই আপসহীন। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে তৃণমূলনেত্রী স্লোগান দিয়েছিলেন, ‘হয় এবার, নয় নেভার’। কিন্তু, সেবার বিপুল আসন জিতে ষষ্ঠবার ক্ষমতা দখল করেছিল বামেরা। ফলে বিরোধী শিবিরে নেমে এসেছিল চরম হতাশা।
তৃণমূল কংগ্রেস তৈরির পরই মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও হুগলির বিস্তীর্ণ এলাকায় কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল সিপিএম। সিপিএমের বহু নেতা ও ক্যাডার ভয়ে এলাকাছাড়া হয়ে গিয়েছিল। তাই ষষ্ঠবার সরকার গড়েই বিরোধীরা যাতে আর কোনোদিন মাথা তোলার সাহস না পায়, তার ব্যবস্থা করেছিল। বিরোধীদের রীতিমতো পিটিয়ে দুরমুশ করেছিল। তাতে অনেক লড়াকু নেতাই ‘আমি আর রাজনীতিতে নেই’ মন্তব্য করে ঘরে ঢুকে গিয়েছিলেন। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছিল সিপিএম। তারা বুথে বুথে স্ক্রুটিনি করে বিরোধী মনোভাবাপন্ন ও সন্দেহজনক ভোটারদের নাম কাটার জন্য ৭ নম্বর ফর্ম জমা দিয়েছিল। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাচ্ছে জেনেও অনেকে সিপিএমের ভয়ে শুনানিতে যাওয়ার সাহস পাননি। অনেকে শুনানিতে ডাক পর্যন্ত পাননি। ভোট দিতে গিয়ে জানতে পেরেছিলেন, ভোটার তালিকায় তাঁর নাম নেই।
২৩ বছর পর তার খেসারত দিতে হচ্ছে হাজার হাজার পরিবারকে। এরাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা হয়েও কমিশনের চোখে তাঁরা ‘আন ম্যাপড’ ভোটার। সিপিএম যেভাবে নিজেদের ক্ষতি করে বাংলায় বিজেপির পায়ের তলায় মাটি জুগিয়েছে, একইভাবে কমিশনের হাতেও তুলে দিয়েছে নাম বাদ দেওয়ার অস্ত্র।
সিপিএম বিরোধীদের নাম বাদ দেওয়ার পাশাপাশি তৈরি করত এলাকার মৃত ও বাইরে থাকা ভোটারদের তালিকা। সেই তালিকা মিলিয়ে প্রক্সিভোট দিত। এছাড়াও বিশেষ নজর থাকত বিরোধী শিবিরের
ভোট কম পোল করানোর দিকে। বিরোধী দলের ডাকাবুকো নেতাদের খুনের হুমকিও দেওয়া হত কৌশলে। বাড়িতে পাঠিয়ে দিত সাদা থান। উদ্দেশ্য, আতঙ্কটা হেঁশেলে পৌঁছে দেওয়া। রাজ্যের ক্ষমতা বদলের পরেও কোনো কোনো এলাকায় সিপিএমের দেখানো পথেই বিরোধীদের ধমকি দিতে সাদা থান পাঠায় তৃণমূলও।
সায়েন্টিফিক রিগিং করতে গেলে দরকার হয় সংগঠনের। সিপিএমের সংগঠন ছিল। কিন্তু বিজেপির নেই। তাই নির্বাচন কমিশনকে সামনে রেখেই বঙ্গের সাংগঠনিক ঘাটতি পূরণের আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দিল্লি বিজেপি।
এর আগে তৃণমূল কংগ্রেসকে শায়েস্তা করতে বিজেপি নানান কৌশল নিয়েছে। কখনও কেন্দ্রীয় এজেন্সিকে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করেছে। কখনও রাজ্যের প্রাপ্য আটকে দিয়েছে। ১০০ দিনের
কাজের, আবাস যোজনার টাকা বন্ধ করে দিয়ে বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ভেবেছিল, হাতে টাকা না পেলে গ্রামের গরিব মানুষ তৃণমূল কংগ্রেসের উপর ক্ষেপে গিয়ে বিজেপির দিকে ঝুঁকবে। কিন্তু ফল হয়েছে উলটো। চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে গ্রামবাংলার মানুষ তৃণমূলকে দু’হাত তুলে সমর্থন জানিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলা দখলের জন্য জ্ঞানেশ কুমারকেই ‘ট্রাম্প কার্ড’ মনে করছে বিজেপি।
রাজনীতির কারবারিদের সৌজন্যে ‘নির্বাচন’ আর ‘প্রহসন’ শব্দ দু’টি সমার্থক হয়ে গিয়েছে। এতদিন নির্বাচনে প্রহসন বলতে মানুষ বুঝত বোমাবাজি, ছাপ্পা, প্রক্সি ভোট। কিন্তু, জ্ঞানেশ কুমার বাংলার মানুষকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন নির্বাচনি প্রহসন আসলে কী!
নির্বাচন কমিশন বরাবর কেন্দ্রের শাসক দলকে সুবিধে পাইয়ে দেয়। এর আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনি প্রচারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, অনুব্রত মণ্ডলকে ‘নজরবন্দি’ করেছে। কিন্তু লাভ হয়নি। তাই এবার সরাসরি আঘাত হানছে তৃণমূলের ভোট ব্যাংকে। কমিশনকে সামনে রেখে সংখ্যালঘু ও মহিলা ভোটারদের বাদ দিচ্ছে। উঠছে ‘প্রাতিষ্ঠানিক রিগিং’-এর অভিযোগ। তবে, তা নিয়ে কমিশন বা বিজেপির মাথাব্যথা নেই। কারণ ক্ষমতা দখলই বিজেপির লক্ষ্য। তারজন্য বিজেপি কোথাও বিরোধী দল ভাঙায়, কোথাও মুখ্যমন্ত্রীকে জেলে পাঠায়।
আবগারি দুর্নীতি মামলায় অভিযুক্ত দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে বেকুসর খালাস ঘোষণা করেছে আদালত। মানুষ এখন বুঝতে পারছে, কেজরিওয়ালকে কেসে ফাঁসানোটা ছিল বিজেপির দিল্লি দখলের গেমপ্ল্যান। সোজাপথে কেজরিওয়ালকে হারাতে পারছিল না বিজেপি। প্রমাণ করা যাবে না জেনেও তাঁর গায়ে লাগিয়েছিল দুর্নীতির কালি। তাতেই পূরণ হয়েছে বিজেপির লক্ষ্য। তাই আদালত কেজরিওয়ালকে ‘ক্লিন চিট’ দিলেও বিজেপির কিচ্ছু যায় আসে না। কারণ বিজেপি দিল্লির দখল নিতে চেয়েছিল। সেটা তারা পেয়েও গিয়েছে।
একুশের নির্বাচনে লড়তে এসে নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ বুঝেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানোর মতো কোমরের জোর বিজেপির নেই। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজ্য দখলের বাসনা দীর্ঘদিনের। তারজন্য গত পাঁচ বছর ধরে নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু বিজেপি যত লাফালাফি করেছে ততই বিপাকে পড়েছে। কারণ বাংলার মাটি বিজেপির জন্য ‘চোরাবালি’।
এসআইআর নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে গোটা রাজ্য। বিজেপির নেতা-কর্মীরা প্রশ্নবাণে জর্জরিত হচ্ছেন। প্রথম দফার তালিকা থেকে বাদ পড়া হাজার হাজার মানুষ মানুষ নতুন করে নাম তোলার জন্য লাইন দিচ্ছেন। কিন্তু, ভোটার তালিকায় তাঁদের জায়গা পাওয়ার আশা খুবই ক্ষীণ। ভুলবশত নাম বাদ গেলে সংশোধনের একটা সুযোগ থাকত। কিন্তু নাম বাদ দেওয়া হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। এই অবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী শুনানি ১০ মার্চের দিকে তাকিয়ে আছে গোটা বাংলা।
৬০ লক্ষ মানুষের নাম ‘বিচারাধীন’। তৃণমূলের অভিযোগ, বেশকিছু রোল অবজার্ভার তথ্য বিচার না করে যাচাই করছেন ভোটারের ধর্ম। মুসলিম নাম দেখলেই বাতিল করে দিচ্ছেন। এমন মারাত্মক অভিযোগ যখন উঠছে তখন তা খতিয়ে দেখা দরকার। আর সেটা করতে পারে একমাত্র দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, অনিয়ম হচ্ছে দেখলেই বাতিল হবে এসআইআর প্রক্রিয়া। এসআইআর নিয়ে কমিশন যে ছেলেখেলা করছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই বাংলার মানুষ চাইছে, কথা রাখুক সুপ্রিম কোর্ট। নির্বাচন পর্যন্ত স্থগিত থাকুক এসআইআর। ভোট হোক নরেন্দ্র মোদি যে ভোটার লিস্টের উপর ভিত্তি করে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, সেই তালিকা ধরেই।