সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর: ঢাকের বাদ্যি আর ধুনোর গন্ধে শহর মাতোয়ারা হওয়ার আগেই কৃষ্ণনগরের পুজোর বাজারে লেগেছে উৎসবের নতুন রঙ। আসন্ন দুর্গাপুজোকে ঘিরে একদিকে যেমন নতুন পোশাকের সম্ভারে সেজে উঠছে শহরের বাজার ও শপিং মল, তেমনই বদলে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্মের পছন্দের ফ্যাশনও। পুজোর চারদিনে সাবেকি শাড়ি, পাঞ্জাবি কিংবা কুর্তার পাশাপাশি এবার বাজার দখল করছে ইন্দো-ওয়েস্টার্ন ও ফিউশন পোশাক। বিশেষ করে জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে ধুতি, প্যান্ট, এথনিক জাম্পস্যুট, অ্যাসিমেট্রিক কুর্তা, ক্রপ টপ, কেপ জ্যাকেট ও ওয়াইড-লেগ পালাজ়োর চাহিদা নজর কাড়ছে।
ষষ্ঠী থেকে নবমী—চারদিনের সাজে বৈচিত্র্য আনতেই তরুণ-তরুণীদের ভিড় বাড়ছে কৃষ্ণনগরের হাইস্ট্রিটের দোকান থেকে শুরু করে বিভিন্ন শপিং মলে। স্থানীয় বাজার হোক কিংবা চোখধাঁধানো বিপণি—সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে নতুন প্রজন্মের ক্রেতাদের আনাগোনা। বিক্রেতাদের দাবি, সাবেকি পোশাকের পাশাপাশি দেশীয় বুনন ও নকশার সঙ্গে আধুনিক কাটিং এবং আরামদায়ক ডিজাইনের পোশাকের বিক্রি এবার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
কৃষ্ণনগরের একটি শপিং মলের বিপণি ব্যবস্থাপক প্রদীপ সেনগুপ্ত বলেন, “গত বছরের তুলনায় এবার জেন-জি ফ্যাশনের পোশাকের চাহিদা অনেকটাই বেশি। বিশেষ করে ধুতি প্যান্ট, বেনারসি জাম্পস্যুট, ক্রপ টপের সঙ্গে ট্র্যাডিশনাল জ্যাকেট—এই ধরনের পোশাকের নতুন স্টক আসার পর দ্রুতই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। সাবেকি বুননের সঙ্গে আধুনিক কাটিংয়ের এই মেলবন্ধন তরুণদের বেশ পছন্দ হয়েছে।”
তরুণ প্রজন্মের পোশাক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু নকশা নয়, গুরুত্ব পাচ্ছে স্বাচ্ছন্দ্যও। পুজোর সময় রাত পর্যন্ত মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরা, ভিড়ের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ হাঁটা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা—সবকিছুর কথা মাথায় রেখেই পোশাক বেছে নিচ্ছেন অনেকে।
কৃষ্ণনগরের কলেজছাত্রী অনন্যা রায় বলেন, “পুজোয় সারারাত মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরতে হয়। তাই পোশাক দেখতে সুন্দর হওয়ার পাশাপাশি আরামদায়ক হওয়াটাও খুব জরুরি। সপ্তমী ও অষ্টমীর দিনের জন্য ধুতি প্যান্ট ও শর্ট কুর্তা নিয়েছি। নবমীর রাতের জন্য নিয়েছি ব্রোকেডের এথনিক জাম্পস্যুট। এতে বাঙালিয়ানার ছোঁয়াও থাকছে, আবার দীর্ঘক্ষণ হাঁটাচলাতেও সমস্যা হচ্ছে না।”
পুজোর দিনভিত্তিক সাজেও দেখা যাচ্ছে নতুন এই ফ্যাশন ট্রেন্ডের ছাপ। ষষ্ঠীর সকালে লাল-সাদা শাড়ির চিরাচরিত জনপ্রিয়তা থাকলেও তার পাশাপাশি জায়গা করে নিচ্ছে পদ্মফুলের এমব্রয়ডারি করা সাদা লং ড্রেস, লাল কলারের ফিউশন পোশাক কিংবা স্কার্ট ও ক্রপ টপের সঙ্গে কাঁথা স্টিচ ও জামদানি কাজের ছোট কেপ। অর্থাৎ পোশাকে আধুনিকতার ছোঁয়া থাকলেও বাঙালিয়ানাকে পুরোপুরি সরিয়ে দিচ্ছেন না তরুণীরা।
সপ্তমী ও অষ্টমীর দিনের সাজে আবার গুরুত্ব পাচ্ছে হালকা ও আরামদায়ক পোশাক। কড়া রোদে ভিড় ঠেলে মণ্ডপ ঘোরার জন্য ধুতি প্যান্টের সঙ্গে শর্ট কুর্তা, ভারতীয় নকশার লং স্কার্টের সঙ্গে ওয়েস্টার্ন ক্রপ টপ কিংবা হালকা ফ্যাব্রিকের ফিউশন পোশাক বেছে নিচ্ছেন অনেকেই। সঙ্গে অক্সিডাইজড গয়না, ঝুমকা কিংবা ছোট কেপ—সাজে যোগ করছে আলাদা মাত্রা। অষ্টমীর সন্ধ্যায় অঞ্জলি থেকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা—সবেতেই অ্যাসিমেট্রিক কুর্তা ও ওয়াইড-লেগ পালাজ়োর মতো পোশাক নজর কাড়ছে।
নবমীর রাতের সাজে অবশ্য আরও জমকালো আয়োজন। আলো ঝলমলে রাতে বেনারসি, ব্রোকেড, সিল্ক কিংবা অরগানজ়ার কাপড়ে তৈরি এথনিক জাম্পস্যুট, প্যান্টস্যুট ও ফিউশন পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের সঙ্গে পাশ্চাত্য ধাঁচের কাটিং—এই মিশ্রণই হয়ে উঠছে তরুণ প্রজন্মের পুজোর রাতের অন্যতম পছন্দ।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সুমিত সাহার কথায়, “তরুণরা এখন আর ছকে বাঁধা সাজে আটকে থাকতে চাইছেন না। তাই দোকানেও দেশীয় বুনন ও কাজের সঙ্গে ওয়েস্টার্ন কাটের পোশাক বেশি রাখা হচ্ছে। ক্রেতাদের চাহিদা বুঝেই স্টক সাজাতে হচ্ছে।”
তরুণ ক্রেতা দেবমাল্য চক্রবর্তী বলেন, “পোশাকের ধরন বদলালেও সাজ থেকে বাঙালিয়ানা হারিয়ে যাচ্ছে না। জাম্পস্যুট বা কেপের মধ্যেও কাঁথা স্টিচ, জামদানি বা অন্য কোনো ভারতীয় নকশা থাকছে। ফলে আধুনিক লুকের সঙ্গে ঐতিহ্যটাও বজায় থাকছে।”
ফলে কৃষ্ণনগরের পুজোর বাজারে এবার ফ্যাশনের সংজ্ঞাও যেন বদলাচ্ছে। সাবেকি পোশাককে পুরোপুরি সরিয়ে না দিয়ে তার সঙ্গে আধুনিক কাটিং, নতুন ডিজাইন ও স্বাচ্ছন্দ্যকে মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন ধারার সাজ। একদিকে বাঙালির ঐতিহ্য, অন্যদিকে জেন-জি-র নিজস্ব ফ্যাশন ভাবনা—এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই এবার জমে উঠছে কৃষ্ণনগরের পুজোর বাজার। আর সেই বাজারে চাহিদার নিরিখে ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে ইন্দো-ওয়েস্টার্ন ও ফিউশন ফ্যাশনের দাপট।
কৃষ্ণনগরের একটি দোকানে পুজোর কেনাকাটা। -নিজস্ব চিত্র