


পক্ষে
সুপ্রিয়া সেন
যৌথ পরিবার যখন ভেঙে যেতে লাগল তখনই এই সমস্যার শুরু। যে পরিবারে বয়স্কদের ভালোবাসা-স্নেহ-যত্নে ছোটরা বড় হয়েছে, মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হয়েছে, ভাগ করে চলতে শিখেছে, সেই পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে একক পরিবারে। এই পরিবারে বয়স্কদের স্থান সেভাবে নেই। তাই তাঁদের সুখ-দুঃখের কথা শোনার চেষ্টা বা সময়, কোনওটাই নেই ছোটদের হাতে। মূল্যবান সম্পদসম বয়স্করা এই প্রজন্মের জীবন থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছেন। এটাই বাস্তব।
শিক্ষিকা
সঙ্গীতা ঘোষ
বর্তমান প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর। এখন যুবসমাজ সামাজিক মাধ্যম, সিনেমা ও মিউজিক স্ট্রিমিং এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সময় কাটাতে আগ্রহী; বয়স্কদের সঙ্গ দিতে অনিচ্ছুক। প্রবীণরা দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে অসুবিধার সম্মুখীন হন এবং প্রায়শই একাকীত্বে ভোগেন। প্রাপ্তবয়স্কদের চিন্তা ও চেতনার সঙ্গে বর্তমান যুবসমাজের একটা তফাত রয়েছে। যা দুই প্রজন্মের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করেছে। প্রকৃতপক্ষে বর্তমান প্রজন্ম কর্মজীবনের ব্যস্ততা সামলে অবসর সময়ে বন্ধুবৃত্তে থাকতে চায়, বয়স্কদের মাঝে নয়। বয়স্কদের পরামর্শ নিয়ে চলতেও বর্তমান প্রজন্ম খুব একটা উৎসাহী নয়। এই প্রজন্মের একটি বিরাট অংশ বয়স্কদের প্রতি সংবেদনশীল নয়।
শিক্ষিকা
সঞ্জয় ঘোষ
বয়স্কদের সঙ্গ দিতে চায় না এই প্রজন্ম। তারা পড়াশোনা, চাকরিবাকরি ও ঘর সংসার নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। আগেকার শান্তিপূর্ণ জীবন ও যৌথ পরিবার আর নেই। তাই বয়স্করা, পরবর্তী প্রজন্মকে তাদের ইচ্ছেমতো জীবন কাটানোর সুযোগ দিন। এই যুগে বাণপ্রস্থ বা সন্ন্যাস গ্রহণের সাহস না থাকুক, বৃদ্ধরাও একা নিজের ইচ্ছেমতো জীবনযাপন করলে শেষ বয়সে সুখে ও শান্তিতে থাকবেন।
বাস্তুকার, সল্টলেক
রমেশ মহাপাত্র
সত্যিই বয়স্কদের সঙ্গ দিতে পারে না এই প্রজন্ম। তা না হলে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা এত বাড়ত না। মানুষ যখন ক্রমশ বৃদ্ধ হতে শুরু করে তার জগৎটা ছোট হয়ে আসে। কথায় জড়তা আসে, কখনওসখনও বুদ্ধি লোপ পায়। নতুন প্রজন্ম আধুনিকতার তালে চলে। বয়স্কদের কথা তাদের কাছে কোনও গুরুত্ব পায় না। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, আজ বয়স্কদের সঙ্গ দিতে নাই পারি। আমরাও একদিন বয়স্ক হব। পরের প্রজন্ম আমাকে দেখে শিখবে। তাই বয়স্কদের সঙ্গ দিন, পাশে থাকুন। বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা কমবে। বৃদ্ধরা বাঁচার রসদ খুঁজে পাবেন।
কলেজ ছাত্র
বিপক্ষে
প্রভুপদ চক্রবর্তী
আমি মনে করি না এই পর্যবেক্ষণ সঠিক। বিশেষ বিশেষ কারণে অনেকেই অনেক সময় সঙ্গে দিতে পারে না। বর্তমানে সকলেই দৌড়ের ওপর আছে। অতিরিক্ত ভাবার সময় নেই। কিন্তু বয়স্কদের সঙ্গ দিতে চায় না বললে মনে হবে উপেক্ষা করছে। মনটাই আসল। সময় হয়তো দিতে পারছে না, কিন্তু বাবা কেমন আছো, কী খেলে বা কী খেতে চাও, ওষুধগুলো ঠিকঠাক মতো খাচ্ছ তো? এই প্রশ্নগুলো করে খোঁজ রাখে। অফিস ফেরত বাবা-মা বা বাড়ির অন্য বয়স্কদের জন্য পছন্দের ফল, মিষ্টি নিয়ে ঢোকে। এগুলো সঙ্গ দেওয়ারই প্রকারান্ত। পাড়াতেও যাতায়াতের পথে বয়স্কদের খোঁজখবর নেয় এই প্রজন্ম। আমরা তো মানুষ। দু’-চার জন ব্যতিক্রম সব কিছুতেই ছিল, আছে এবং থাকবে। তাই বলে পুরো সমাজকে এক তুলি দিয়ে এক রঙে রাঙানো যায় না।
অবসরপ্রাপ্ত
রাজশ্রী চক্রবর্তী
সোশ্যাল মাধ্যমে কম-বেশি সময় আজকাল ১৮ থেকে ৮০ সবাই কাটাচ্ছে। তবে সঙ্গ হিসেবে আজকাল মানুষ মানুষের সঙ্গে পারস্পরিক ও মৌখিক আলাপ কম রাখে বলেই মনে করি। বয়স্ক মানুষ বেশিরভাগ বাড়িতেই এখন বাড়তি বোঝা। কিন্তু, নতুন প্রজন্মের কাছে বয়স্ক মানুকে সঙ্গ দেওয়ার বিষয়টা সেক্ষেত্রে আবার নেই বললে বলা ভুল হবে কারণ এখনকার দিনে অনেক ক্ষেত্রেই নতুন প্রজন্মের মানুষ তাঁদের এগিয়ে দিচ্ছে সোশ্যাল মাধ্যমের দ্বারা। যেমন, তাঁদের রান্নার শিল্পকলা থেকে সেলাই ইত্যাদির চ্যানেল করে দেওয়া এবং সেগুলো শেখাতে যে সময়টা ব্যয় করছে হয়তো তাদের কাজে ব্যস্ত রাখতে বা রোজগারের জন্য কিন্তু সময় তো দিচ্ছে, আবার ধরুন, এখন বয়স্ক মানুষদের জন্য নানা পাঠাগার কিংবা শিক্ষার স্থানে বয়সের হিসাব না রেখেই একসঙ্গে সুযোগ দেওয়া এই গুলো তো আছেই। সবশেষে বলতে পারি নতুন প্রজন্ম পুরোনোকে নতুনত্বে সাজিয়ে তুলে, এগিয়ে চলার সাহস রাখে বয়স্ক মানুষদের সঙ্গে নিয়ে।
বাচিক শিল্পী
কঙ্কনা বোস
বয়স্কদের সঙ্গ দিতে চায় না এই প্রজন্ম — এই অভিযোগটি কিন্তু যথেষ্ট একপেশে। আজকের প্রজন্মের তরুণেরা মেধাবী, আত্মসচেতন ও সৃজনশীল। তারা যে কোনও সম্পর্কের মান বজায় রাখতে জানে। সম্পর্কের যত্ন করতেও পারে। কর্মব্যস্ত জীবন ঘিরে থাকলেও তারা ভার্চুয়াল মাধ্যমে বয়স্কদের সঙ্গে যুক্ত থাকে। দায়িত্বজ্ঞানহীন নয়, বরং বহু ক্ষেত্রেই তারা বাস্তববাদী। তাদের কাজের পদ্ধতি প্রচলিত ধারা থেকে আলাদা হতেই পারে। প্রথাবিরুদ্ধ হওয়া মানেই তা অবজ্ঞা নয়। প্রজন্মের ব্যবধানকে বিচ্ছিন্নতা নয়, ভিন্নতা হিসেবে দেখা উচিত। কলেজ ছাত্রী
দিব্যেন্দু ভড়
সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য সমাজের বয়স্ক মানুষদের প্রতি মুহূর্তে ‘আপডেট’ করছে এই প্রজন্ম। নিত্যযাত্রী হওয়ার সুবাদে প্রতিদিন চোখে পড়ে কোনও বয়স্ক মানুষের স্মার্টফোনের ‘ক্লাস’ নিচ্ছে কোনও যুবা। তাঁদের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে সাহায্যের হাত। সময়ের দাবি মেনে এই প্রজন্মকে কেরিয়ারের পিছনে দৌড়তেই হবে। কিন্তু দিনের শেষে জীবনের অভিজ্ঞতা বড়ই দুর্লভ। এই প্রজন্ম তাদের সঙ্গলাভে সমৃদ্ধ হয়। আজও বৃদ্ধাশ্রমের তুলনায় সংসারে থাকা বয়স্ক মানুষের সংখ্যাই বেশি। অফিস টাইমে লোকাল ট্রেনে বাবার বয়সি ভদ্রলোক এই প্রজন্মের কাছে ‘স্নেহশীল দাদা’ হয়ে ওঠেন। দুই প্রজন্মের সঙ্গলাভে এই ডাক যেন কখন সেতুবন্ধন করে দিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়াতেও বয়স্কদের ফলোয়ারদের বেশিরভাগই নব প্রজন্ম। তাই নতুন প্রজন্ম বয়স্কদের সঙ্গ দিতে পারে না বা চায় না, একথা ঠিক নয়। বরং অনেকেই বয়স্কদের সঙ্গ উপভোগ করে।
স্কুলশিক্ষক