নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: পুজো মরশুম মানেই থিমের বর্ণপরিচয়। আর থিম মানেই এক অদ্ভুত বহতা স্রোত, যেখানে মিশে যায় নানা প্রবাহ। ভৌগোলিক সূত্রকে গুলিয়ে দিয়ে উত্তর মিলে যায় দক্ষিণে, পশ্চিমে ঢলে পড়ে পুবে। বহতা স্রোতের টানেই ভক্তি আন্দোলনের আবহে জুড়ে যায় দেবীবন্দনার বিচিত্র ধারা। আবার চলচ্চিত্রের কল্পনাকে বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে এনে মনোরঞ্জনে মাতেন উদ্যোক্তারা। পুজোর ঢাকে কাঠি পড়তেই হুগলিতে বইতে শুরু করে দিয়েছে সেই সমুদ্রপ্রমাণ ধারা। গঙ্গাপাড়ের নগরীগুলির কোণায় কোণায় থিমের ঢানে তৈরি হচ্ছে নানা বিচিত্র মণ্ডপসজ্জা, প্রতিমা শৈলীর অদ্ভুত ধারা।
হুগলির ডানকুনির নবজাগরণ সংঘের থিম কীর্তন। আসলে, ভক্তিবাদী আন্দোলনের চৈতন্য মহাপ্রভু সৃষ্ট ধারাকে ধরেই মণ্ডপ ও প্রতিমাসজ্জার বিভিন্ন অঙ্গিক আনছেন উদ্যোক্তারা। নানা মডেল, রট আয়রনের বিমূর্ত অবয়বে চৈতন্য মহাপ্রভুর নগর কীর্তন থেকে মানুষকে প্রেমের বাঁধনে বাঁধার বার্তায় সাজছে মণ্ডপ। থাকবে গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের মূলগত নানা মোটিফ। রাধাচক্র থেকে তিলক, কণ্ঠী, পাদুকা– কিছুই বাদ যাবে না। খোল, করতাল, খঞ্জনীও থাকবে। এসবেই মোহন হবে মণ্ডপ, অন্দরসজ্জা। থিমকে সাজিয়ে তুলতে আলোকসজ্জাতেও বিশেষ কায়দা পেশ করতে ছাড়ছেন না উদ্যোক্তারা। সেই সঙ্গে থাকবে অদ্ভুত শৈলীর প্রতিমা। মাটির প্রতিমা হলেও দেবী এখানে মহিষাসুর হন্তারক নন। তার অস্ত্রকেও আয়তনে ছোট করে রাখা হবে। দেবী ও তার পরিবার মণ্ডপে থাকবে নগর সংকীর্তনের ভঙ্গিমায়। এমনকী সিংহের হিংস্র আদলকেও কমনীয়, ‘মানবিক’ করে গড়া হচ্ছে। ক্লাবকর্তা তথা ডানকুনি পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যান প্রকাশ রাহা বলেন, মাটি ও সুরের টানে কীর্তন এবার নবজাগরণে, এটাই আমাদের থিম। মানুষের মহামিলনের কথা আমরা বলব।
ইতিহাসের পাতা ছেড়ে চলচ্চিত্রের আঙিনা থেকে থিম খুঁজে এনেছে বলাগড়ের গুপ্তিপাড়ার ইউনাইটেড ক্লাব। বহুল চর্চিত বাহুবলী সিনেমার মাহিষমতী প্রাসাদের আদলে তৈরি হচ্ছে তাদের মণ্ডপ। জল-জঙ্গলের কাল্পনিক মাহিষ্মতী সাম্রাজ্যের মতোই গঙ্গাবহুল গুপ্তিপাড়ার মাটিতে মাথা তুলছে নয়নাভিরাম বিরাট সেই প্রাসাদ। ক্লাবের এবার পুজোর ৭৫ বছর পূর্তি। তাই প্রায় ৯০ ফুট উচ্চতা আর ৬০ ফুট চওড়া প্রাসাদের বৈভবেই ধরা হচ্ছে ক্লাবের প্লাটিনাম জুবিলি মণ্ডপকে। আলোকসজ্জাতেও থাকবে নানা বাহার। বিরাট মণ্ডপসজ্জা থেকে রাজকীয় দ্যুতি বিচ্ছুরণে কোনও ফাঁক কর্তারা রাখতে চাইছেন না। দেবী প্রতিমাতেও থাকবে চমক। দেবী প্রতিমা মাটির, কিন্তু তিনি সপরিবারে রোমান সৈন্য ও সেনাপতিদের আদল নিয়ে হাজির হবেন। পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা সুব্রত মালো বলেন, বাহুবলী সিনেমার যুদ্ধ-আবহকেও আমরা সর্বত্র ধরে রাখতে চাইছি।
বাতাসে ইতিমধ্যেই শিউলির মৌতাত ছড়াতে শুরু করেছে। সেই আবহেই বিষ্ময়কর সব থিম গঙ্গাপাড়ের নগরীকে স্বপ্নের দেশের আদল দিচ্ছে।
আগমনীর আগমনের ইঙ্গিতে বদলাতে শুরু করেছে সুপ্রাচীন জনপদ।